ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম শর্ত হচ্ছে অনানুষ্ঠানিক খাতকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় রূপান্তর করা। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমেই অনানুষ্ঠানিক খাতকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোতে আনা সম্ভব। এক্ষেত্রে ডিজিটাইজেশন, আর্থিক প্রযুক্তির প্রয়োগ ও উদ্ভাবনের মধ্যে দিয়েই এ আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণ আরো সহজতর হবে। তাই ২০২১ সালের আগস্ট মাসে ‘ডিজিটাইজেশন এবং উদ্ভাবনের মাধ্যমে টেকসই ও ফলপ্রসূ আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পথে অভিযাত্রা’ প্রতিপাদ্য নিয়ে জাতীয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কৌশলপত্র প্রণয়ন করা হয়। 

১২টি অভীষ্টের অধীনে ৬৯ টি লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে প্রণীত এ কৌশলত্রের সময়সীমা জুলাই ২০২১ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে । শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশেও জাতীয় পর্যায়ে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সংক্রান্ত নীতি প্রণয়ন করেছে। বিশ্বব্যাংকের জাতীয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি রিসোর্সে সেন্টারে ঘুরে এলে দেখা যায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তিন ধরণের বিকল্প পদ্ধতি অনুসরণ করে জাতীয় পর্যায়ে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সংক্রান্ত নীতি প্রণয়ন করেছে। 

প্রথমত এ পর্যন্ত ৫১টি দেশ জাতীয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কৌশলপত্র প্রণয়ন করেছে। দ্বিতীয়ত ২৩টি দেশ জাতীয় আর্থিক খাতের কৌশলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে অঙ্গীভূত করার মাধ্যমে নীতি নির্ধারণ করেছে। পরিশেষে ২টি দেশ এরইমধ্যে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি আইন প্রণয়ন করেছে। বাংলাদেশ কৌশলপত্র প্রণয়নের পাশাপাশি জাতীয় আর্থিক খাতের কৌশলগত পরিকল্পনা ২০২০ থেকে ২০২৪ কে অঙ্গীভূত করেছে। ১১ টি লক্ষ্য নিয়ে পাঁচ বছর মেয়াদি এ পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তি মূলত কি? বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য অনেকেই আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তবে বাংলাদেশ আর্থিক অন্তর্ভুক্তির জাতীয় সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছেন। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির জাতীয় এ সংজ্ঞাটি অনুধাবন করলেই বোঝা যাবে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির উদ্দেশ্য। ‘আর্থিক পরিষেবা থেকে বঞ্চিত ও সীমিত পরিষেবাপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীসহ সকল ব্যক্তি ও ব্যবসায়িক উদ্যোগসমূহের জন্য একটি সুনিয়ন্ত্রিত, স্বচ্ছ, দক্ষ এবং প্রতিযোগিতামূলক আর্থিক বাজারের মাধ্যমে সাধ্যের মধ্যে সাশ্রয়ী মূল্যে, মানসম্মত, সহজপ্রাপ্য ও ঝুঁকি নিরসনের সুযোগ সম্বলিত প্রযুক্তিভিত্তিক আর্থিক পরিষেবা প্রাপ্তির অভিগম্যতা ও ব্যবহারের সক্ষমতা’। 

কৈশলপত্রে আরো বলা হয়েছে, নিম্নোক্ত তিনটি বিষয়ের সমন্বয়ের মাধ্যমে ডিজিটাল আর্থিক পরিষেবার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বিষয়গুলো হচ্ছে, ডিজিটাল অবকাঠামো যেমন: ইউটিলিটি সেবা (পানি,বিদ্যুৎ ও গ্যাস ইত্যাদি ),মোবাইল ও ইন্টারনেট সুবিধা, ডিজিটাল পরিচয়পত্র সর্বসাধারণের সমান অভিগম্যতা থাকতে হবে। অধিকতর আর্থিক ও ডিজিটাল শিক্ষা আবশ্যক। তথ্যের অসামঞ্জস্য দূরীকরণ।

বর্তমানে ডিজিটাল আর্থিক পরিষেবার পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর সেবার মানও ধীরে ধীরে ভালো হচ্ছে। ইউটিলিটি সেবার লেনদেনের দিকে একটু তাকালে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হয়ে যাবে। ইউটিলিটি সেবার লেনদেনের সংখ্যা বিগত তিন বছরে ১ কোটির চেয়েও বেশি বেড়ে গিয়ে গত এপ্রিল ২০২২ এ ১ দশমিক ৩৩ কোটি ছাড়িয়ে গিয়েছে এবং লেনদেনের পরিমাণ এক হাজার কোটি টাকার চেয়েও বেশি বেড়ে গিয়ে হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা (সূত্র : বাংলাদেশ ব্যাংক)। তাই কৌশলপত্রের ৬ নং অভীষ্টের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে ডিজিটাল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা ডিএফএস কৌশলপত্র প্রণয়নের কথা বলা আছে। এছাড়াও কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা, ফিনটেক, রেগটেক, ইন্সুউরটেক, সুপটেক, ডিএলটি, মেশিন লার্নিং, অগমেন্টেড রিয়েলিটি, সাইবার সিকিউরিটি ইত্যাদি উদ্ভাবনী ও বিকাশমান প্রযুক্তি প্রয়োগের সম্ভাব্যতা মূল্যায়ন ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে এরইমধ্যেই আর্থিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে।

শুধু তাই নয়, ই- কমার্সের মাধ্যমে ব্যবসাও প্রসারিত হয়েছে এবং ডিজিটাল ক্রেডিট এর ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। ব্লকচেইন, কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং, ইন্টারনেট অব থিংস, বিগ ডাটা এনালিটিক্স ইত্যাদি বিকাশমান এ প্রযুক্তি আর্থিক খাতে বড় ভূমিকা রাখছে। এরইমধ্যে সরকার জাতীয় ব্লকচেইন কৌশল -বাংলাদেশ ২০২০, জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কৌশল - বাংলাদেশ ২০২০, জাতীয় ইন্টারনেট অব থিংস কৌশল -বাংলাদেশ ২০২০ প্রণয়ন করেছে এবং এ কৌশলগুলোতে আর্থিক খাত সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলী প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে। সেক্ষেত্রে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে এ সব বিকাশমান প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

এখন পর্যন্ত বিকাশমান প্রযুক্তি সংক্রান্ত যতটি কৌশলপত্র প্রণয়ন করা হয়েছে প্রত্যেকটিতেই ডিজিটাল শিক্ষা, নতুন উদ্ভাবন ,গবেষণা ও উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। ডিজিটাল শিক্ষার মাধ্যমেই বিকাশমান প্রযুক্তির গবেষণা বাড়বে আর নতুন নতুন উদ্ভাবন বেরিয়ে আসবে। তাই বিকাশমান প্রযুক্তির উন্নয়নে ও দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে সরকার এরইমধ্যেই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

তাই এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে, বাংলাদেশ সরকার ২০২৬ সালের মধ্যে দেশের প্রথম বিকাশমান প্রযুক্তি-ভিত্তিক বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট স্থাপনের জন্য ১৫দশমিক ০৩ বিলিয়ন টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করে (দ্য ফিনান্সিয়্যাল এক্সপ্রেস, ফেব্রুয়ারি ০৮, ২০২২)। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) এই প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়।

প্রতিষ্ঠানটির নাম হবে শেখ হাসিনা ইন্সটিটিউট অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি (শিফট) এবং এই ইন্সটিটিউটটি মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলায় প্রতিষ্ঠিত হবে। এ প্রতিষ্ঠানটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ব্লকচেইন, ইন্টারনেট অব থিংস, রোবোটিক্স, ডেটা সায়েন্স, বায়োটেকনোলজি, ন্যানোটেকনোলজি, নিউরো-টেকনোলজি, সাইবার সিকিউরিটি, হাইপার-অটোমেশন, প্রযুক্তিগত নীতিশাস্ত্র, আচরণ এবং অভিজ্ঞতা প্রকৌশল, উদ্ভাবন এবং উদ্যোক্তা সহ আরো বেশ কিছু বিষয় অগ্রাধিকার পাবে। জাতীয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কৌশলপত্রে বর্ণিত কৌশলগুলো প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষায়িত এই ইন্সটিটিউটটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাই জাতীয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কৌশল প্রয়োগের ক্ষেত্রে ও বিকাশমান প্রযুক্তির উন্নয়নে এই দক্ষ জনশক্তিই পরবর্তীতে আর্থিক প্রযুক্তি ও অর্থনীতিতে বিশেষ অবদান রাখবে।

লেখক:

রফিকুল ইসলাম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব), সীমান্ত ব্যাংক

এ, এস, এম, আহসান হাবীব, প্রিন্সিপাল অফিসার, উত্তরা ব্যাংক লি.