সম্প্রতি মার্কিন রাষ্ট্রপতি জো বাইডেন ক্ষমতা গ্রহণের পর তার প্রথম এশিয়া সফর শেষ করেছেন। এ সফরে গৃহীত উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ ছিল টোকিওতে ইন্দো-প্যাসিফিক ইকোনমিক ফ্রেমওয়ার্ক (আইপিইএফ) চালুর ঘোষণা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতি অনুসারে, আইপিইএফ বাণিজ্য, সাপ্লাই চেইন, ক্লিন এনার্জি, ডিকার্বনাইজেশন, অবকাঠামো, ট্যাক্স এবং দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেবে। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী এ কাঠামোর উদ্দেশ্য যদি আসলেই আঞ্চলিক সহযোগিতা ও সমৃদ্ধি অর্জনে কাজ করা এবং উন্নয়ন ও শান্তিতে অবদান রাখার মতো ইতিবাচক বিষয় হয়ে থাকে, তবে চীনসহ এ অঞ্চলের সব দেশ একে আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করবে। তবে আমরা আইপিইএফের এ বাহ্যিক চাকচিক্য ভুলে ভেতরে দৃষ্টি দিলে এর ভিন্ন এক রূপ দেখতে পাব।

আইপিইএফ বর্তমান এশিয়া-প্যাসিফিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা কাঠামোর ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ। এদিকে বিদ্যমান কাঠামো বেশ চমৎকারভাবে কাজ করছে। বিগত বছরগুলোয় এটি সুস্পষ্ট হয়েছে যে, ডব্লিউটিও, জি২০, এপেক, আসিয়ান+ ও আরসিইপির মতো বহুপক্ষীয় জোটগুলো এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলসহ সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ব্যাপকভাবে ত্বরান্বিত করেছে। এর ফলে সমগ্র এশিয়ায় বিশ্বায়ন ও মুক্ত বাণিজ্যের বিপুল সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে অসামান্য সফলতা অর্জন সম্ভব হয়েছে। অথচ এর বিপরীতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মুক্ত বাণিজ্য নীতি অনুসরণ না করে সুরক্ষাবাদ চর্চা করে। এটি এশিয়া-প্যাসিফিক অর্থনৈতিক সহযোগিতায় (যেমন সিপিটিপিপি এবং আরসিইপি) অংশগ্রহণ করে না, এমনকি টিপিপি (ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ) থেকেও নিজেদের সরিয়ে নিয়েছে।

ওয়াশিংটন এখন তাদের নিজস্ব পথ বেছে নিয়েছে। এর মূল লক্ষ্য নিজেদের বাজার উন্মুক্ত না করে বা শুল্ক না কমিয়ে আমেরিকান নিয়মনীতির আধিপত্য বিস্তার করা এবং পরিশেষে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’-এর আপডেটেড সংস্করণ বাস্তবায়ন করা। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশই অর্থনৈতিক বিনিময়ে উভয় পক্ষের সমান লাভ নিশ্চিত করতে চায় এবং এক্ষেত্রে দেয়া-নেয়ার বিষয়টিও সমান থাকে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কম দিতে চায় আর বেশি সুবিধা নিতে চায়।

আইপিইএফকে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ এবং ‘উন্মুক্ত’ বলে মনে হলেও এটি এ অঞ্চলের দেশগুলোকে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার প্ররোচনা দেয়। আইপিইএফ চালুর আগে গুঞ্জন ছিল যে, ওয়াশিংটন একে কৌশলগত প্রতিযোগিতা ত্বরান্বিতকরণে ব্যবহার করবে এবং চীনকে বাদ দিয়ে একটি নতুন অর্থনৈতিক জোট তৈরির লক্ষ্যে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোকে পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য করবে। সম্ভবত এ-সংক্রান্ত সংশয় দূর করার জন্যই মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেক সুলিভান ‘প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের সম্মতিতে চীন এতে যোগদানের জন্য আবেদন করতে পারবে’—এমনটি বলেছেন। হংকংভিত্তিক মিডিয়া আউটলেট তা কুং পাও অনুসারে, এর উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বের সামনে আইপিইএফের উদার দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা। সুলিভানের বিবৃতি দেখে চীনকে বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে না এমনটি মনে হলেও বাস্তবে বাইডেন প্রশাসনের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অবস্থান ঠিক চীনের পক্ষে নয়।

আইপিইএফের আসল উদ্দেশ্য এরই মধ্যে সবার সামনে এসেছে। বাণিজ্যমন্ত্রী জিনা রাইমন্ডো বলেন, আইপিইএফ এ অঞ্চলের দেশগুলোকে চীন বাদে বিভিন্ন বিকল্প প্রদান করেছে। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি ক্যাথরিন টাই বলেন, চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিস্তারকে সফলভাবে মোকাবেলা করবে আইপিইএফ।

টিপিপি-বিষয়ক আলোচনা চলাকালে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা একবার বলেছিলেন, চীনকে নিয়ম-কানুন তৈরি করতে দেয়া যাবে না। এর ফলে পুরো আলোচনা থেকে চীনকে বাদ দেয়া হয়। আইপিইএফ এই একই নীতি অনুসরণ করছে। এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হিসেবে, আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে চীন সবসময়ই প্রবর্তক, প্রচারক এবং রক্ষকের ভূমিকা পালন করে আসছে। চীন ১২০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চলের বৃহত্তম ব্যবসায়িক অংশীদার। বর্তমানে সারা বিশ্ব যখন অর্থনৈতিক সংকট এবং নানা সমস্যা মোকাবেলা করছে, তখন আইপিইএফ এ অঞ্চলের দেশগুলোকে উসকে দেয়ার চেষ্টা করছে এবং চীনা অর্থনীতি থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করতে তত্পর হয়ে উঠেছে।

মোট কথা, আইপিইএফ হচ্ছে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল’-এর অর্থনৈতিক স্তম্ভ এবং চীনকে কোণঠাসা করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক হাতিয়ার। যদিও এ কৌশল ট্রাম্প এবং বাইডেন প্রশাসন সামঞ্জস্য ও সংশোধন করেছে, কিন্তু চীনকে সব সময়ই প্রাথমিক টার্গেট হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে আসছে। কোয়াডের শক্তিশালী আদর্শ হোক কিংবা অকাসের নিরাপত্তার ওপর গুরুত্বারোপ—উভয়ই বর্তমান কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে, আইপিইএফ চালু এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দুর্বলতা হ্রাস করে একে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখবে এবং ট্রাম্প প্রশাসনের টিপিপি থেকে বেরিয়ে আসার ফলে সৃষ্ট ঘাটতি পূরণ করবে।

গত ২৬ মে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন দ্য জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বক্তব্য রাখেন। এ বক্তব্যে তিনি চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি এটাও স্বীকার করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের চীনকে সরাসরি প্রভাবিত করার ক্ষমতা সীমিত ছিল, তাই চীনকে ঘিরে কৌশলগত পরিবেশ গঠনের ওপর গুরুত্ব দেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। যত অভিনব বা উন্নত কৌশলই অবলম্বন করা হোক না কেন, এর মূল নীতি হচ্ছে এ অঞ্চলের দেশগুলোকে পক্ষ বেছে নেয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করা এবং চীন যাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিশ্ব নেতৃত্ব ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতে না পারে এজন্য চীনের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান তৈরি করা। এটি বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অনুকূল অবস্থা তৈরি করবে এবং এমন বিশ্ব গড়ে তুলবে, যার নিয়ন্ত্রণ থাকবে কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে।

বর্তমান বিশ্বের নানা সংকট আর বিশৃঙ্খলার মাঝেও এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল বিগত বছরগুলোয় সমৃদ্ধি ও স্থিতি বজায় রেখে এগিয়ে গেছে। এর পেছনে রয়েছে এ অঞ্চলের দেশগুলোর লাভ-লোকসানের জিরো-সাম গেমে না মেতে সব পক্ষের সমান সহযোগিতামূলক মানসিকতা। এ আঞ্চলিক সহযোগিতায় হস্তক্ষেপ করার মার্কিন প্রচেষ্টা দেশগুলোর মধ্যে বিচ্ছিন্নতাকে উসকে দিচ্ছে এবং প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যকার দ্বন্দ্বে অংশগ্রহণের জন্য চাপে ফেলছে। এতে ওয়াশিংটনের মনমানসিকতা প্রকাশ পাচ্ছে; যাদের শরীর একবিংশ শতকে প্রবেশ করলেও মাথা এখনো সেই স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে আটকে আছে।

 

ছিয়ান ফাং: গবেষণা বিভাগের পরিচালক

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ

সিনহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়