নতুন বছরের শুরুতে দেশে করোনা সংক্রমণ আবার বাড়ছে। তথ্য বলছে, পরীক্ষার বিপরীতে সংক্রমণের হার ডিসেম্বরের প্রথমদিকে দেড় শতাংশের নিচে নেমে এসেছিল। সেটি এখন প্রায় ৩ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে করোনা সংক্রমণ ৬০ শতাংশ বেড়েছে। আরো উদ্বেগের বিষয় হলো বিশ্বজুড়ে নতুন করে আতঙ্ক ছড়ানো নতুন ধরন ওমিক্রনে আক্রান্ত রোগীও এরই মধ্যে দেশে শনাক্ত হয়েছে। সরকারি হিসাবে ওমিক্রনে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এখন ১১। সংক্রমণ যেভাবে বাড়ছে তাতে সরকার আবারো লকডাউন দিতে পারে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। কোনো কঠোর সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন নিশ্চিত করাটাই এখন জরুরি। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আরো সক্রিয়তা কাম্য।
দেশে গত মার্চ থেকে শুরু হয় সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ। করোনার ডেল্টা ধরনের দাপটে জুন-জুলাই মাসে সংক্রমণ পরিস্থিতি ভয়ংকর রূপ নেয়। এর পর থেকে সংক্রমণ কমতে থাকে। এই নিম্নমুখী প্রবণতা চলে ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত। কিছুদিন ধরে দেশে করোনা রোগী আবার বাড়ছে। হঠাৎ করে করোনা রোগী বাড়ার বেশকিছু কারণ বিদ্যমান। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল হওয়ায় পুরোদমে কাজে ফিরেছে সবাই। গণপরিবহনে গাদাগাদি করে চড়ে আবারো মানুষ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাচ্ছে। অফিস-শিল্পকারখানা-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-স্বাস্থ্যকেন্দ্র সবখানে যাচ্ছে। ভিড় ঠেলে বাজারসদাই করছে। যাচ্ছে জনসমাগমে, অংশ নিচ্ছে সমাবেশে-সেমিনারে। বিয়েসহ সামাজিক অনুষ্ঠানে পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হচ্ছে। সবকিছু অনেকটা স্বাভাবিক ধরে নিয়েই আগের মতো আচরণ করছে। ন্যূনতম শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখছে না। সাবান পানি দিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাসে এসেছে শিথিলতা। অনেকেই মাস্ক পরছে না। যারা পরছে তাদের মধ্যেও এক ধরনের দায়সারা প্রবণতা দৃশ্যমান। মোদ্দা কথা হলো স্বাস্থ্যবিধি পরিপালনে বর্তমানে আমাদের মধ্যে চরম শিথিলতা লক্ষ করা যাচ্ছে। তার সঙ্গে আবার ওমিক্রনও বাড়তি অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে। সব মিলিয়ে ফের বাড়ছে সংক্রমণ।
শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের আরো অনেক দেশে আবারো বাড়তে শুরু করেছে সংক্রমণ। করোনার অতিসংক্রামক ধরন ওমিক্রন ছড়িয়ে পড়ায় সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় বিশেষ করে ইউরোপে উদ্বেগজনকভাবে করোনা সংক্রমণ বাড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে দেশগুলোর স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ তত্পর হয়ে উঠেছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করছে। জনসমাবেশ সীমিত করছে। সংক্রমণ পরিস্থিতি বিবেচনায় ক্ষেত্রবিশেষে এলাকাভিত্তিক লকডাউন আরোপ করছে। এমনকি উৎসব উদযাপন বাতিল বা সীমিত করার খবরও মিলছে। করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার মধ্যে অনেক দেশই বড়দিনে সমবেত প্রার্থনা বাতিল করেছে, ঘরোয়াভাবে পালন করেছে। বড় জনসমাগম আয়োজনে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বিশেষ করে প্যারিস, লন্ডন, বার্লিনসহ ইউরোপের বিভিন্ন শহর নববর্ষ উদযাপন সরকারিভাবে বাতিল করেছে। এ ধরনের নিবৃত্তিমূলক পদক্ষেপের পাশাপাশি দেশগুলো বিশেষ করে বয়োবৃদ্ধ জনগোষ্ঠীকে বুস্টার ডোজ দিচ্ছে। টিকাদান কার্যক্রম আরো বেগবান করেছে। দেশগুলোর গৃহীত পদক্ষেপ-অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য অনুসরণীয়।
দৈনিক ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে রেকর্ড সংক্রমণের প্রেক্ষাপটে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ওমিক্রনের দাপটকে ‘সুনামি’ আখ্যা দিয়েছে। প্রতিবেশী ভারতেও করোনা সংক্রমণ দ্রুতগতিতে বাড়তে শুরু করেছে। বাংলাদেশেও ওমিক্রনের উপস্থিতি মিলেছে। এখন নতুন ধরনটি দেশে জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়াতে শুরু করেছে কিনা, সেটি নিশ্চিত হওয়াটা জরুরি। এজন্য জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের বিকল্প নেই। আক্রান্ত ব্যক্তিদের জিনোম সিকোয়েন্স পরীক্ষার পরই জানা সম্ভব কার দেহে কোন ধরনের করোনার সংক্রমণ ঘটেছে। ওমিক্রনের বিস্তৃতি কেমন, সেটিও বোঝা যাবে। দুর্ভাগ্যক্রমে এ পরীক্ষা বাংলাদেশে এখনো খুব কম হচ্ছে।
চলমান মহামারী সম্পর্কে আগের চেয়ে আমাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বেড়েছে। কী করলে সংক্রমণ কমানো যায়, সেটি এখন আমরা জানি। এক্ষেত্রে বড় রক্ষাকবচ হলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, যতটা সম্ভব জনসমাগম ও ভিড় এড়িয়ে চলা। দৈনন্দিন কাজে যেসব স্থানে মানুষকে যেতেই হয়, সেখানে স্বাস্থ্যবিধি মানতে সবাইকে বাধ্য করা। এক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব আছে। কেবল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে এটি সম্ভব নয়। এজন্য জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে; বিশেষ করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, নাগরিক সমাজ ও তরুণদের। বিশেষ করে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, এনজিওগুলোকে এক্ষেত্রে কাজে লাগাতে হবে। অতীতে দেখা গেছে, যেসব কর্মসূচিতে জনগণকে সম্পৃক্ত করা যায়, সেখানে সাফল্য আসে। কাজেই এটা মাথায় রাখা চাই।
ইতিবাচক দিক হলো, সরকার টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করেছে। নিয়মিত টিকা কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বিত টিকা কর্মসূচিও শুরু হয়েছে। ইপিআই কেন্দ্রে অন্য টিকার সঙ্গে করোনার টিকাও দেয়া হচ্ছে এখন। তার সঙ্গে বুস্টার ডোজ দেয়াও চলছে। তথ্য বলছে, দেশের মোট জনসংখ্যার ৪৩ শতাংশ করোনা টিকার প্রথম ডোজ পেয়েছে। দ্বিতীয় ডোজ হিসাব করলে এ শতাংশ মাত্র ৩০ শতাংশের ঘরে, যা মোটেই সন্তোষজনক নয়। আরো দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, সব এলাকায় সমানভাবে টিকা পায়নি মানুষ। ১৬টি জেলা পিছিয়ে আছে। এ অবস্থায় সরকারের প্রাধিকার হবে পিছিয়ে পড়া জেলাগুলোতে টিকা কর্মসূচি জোরদার করা। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দাবি, যথেষ্টসংখ্যক টিকা সরকারের হাতে মজুদ আছে। কোভ্যাক্সের প্রতিশ্রুত টিকাগুলো নিয়মিত আসছে। সেক্ষেত্রে টিকাদানে সমতা আনা বা দেশের অধিকাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনা কঠিন নয়। একই সঙ্গে নতুন ধরনের বিস্তার ঠেকাতে পদক্ষেপ নিতে হবে। তার জন্য স্থল, বিমান ও বন্দরগুলোতে নজরদারি বাড়াতে হবে। যারা বাইরে থেকে আসবেন, বাধ্যতামূলকভাবে তাদের করোনা পরীক্ষা ও কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করতে হবে। ডেল্টা ধরন প্রবেশের সময় নজরদারি ও পরীক্ষায় যে শিথিলতা ছিল, তার পুনরাবৃত্তি আর কাম্য নয়। সর্বোপরি ওমিক্রনের বিস্তারের ব্যাপকতা বুঝতে জিনোম সিকোয়েন্সিং বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
মানুষের জীবন-জীবিকা ও অর্থনীতিতে লকডাউনের গভীরতর নেতিবাচক প্রভাব আমরা দেখেছি। কাজেই সংক্রমণ পরিস্থিতির যাতে বেশি অবনতি না ঘটে, লকডাউন দেয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, সেজন্য সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। আমাদের সবাইকে বুঝতে হবে যে কারো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা যেমন অন্যদের করোনার সংক্রমণ থেকে রক্ষা করবে, আবার কেউ এ বিধি লঙ্ঘন করলে সমূহ সর্বনাশ হতে পারে। এ তো গেল প্রতিরোধের বিষয়। এর সঙ্গে প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপও নিতে হবে। কোনোভাবে যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, সেজন্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যাতে অল্প সময়ে ভেঙে না পড়ে সেজন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। নিকট অতীতে আমরা যে ভুলগুলো করেছিলাম তার যেন পুনরাবৃত্তি না হয়, সর্বতোভাবে সেটি অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।










