সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনির্ধারিত আলোচনায় জনশক্তি রফতানিতে প্রতারণা বন্ধের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, ব্যাংকঋণ প্রদান ও প্রচার বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। দালাল ও প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়ে কেবল বিদেশ গমনেচ্ছু কর্মীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না, পাশাপাশি অনেক প্রবাসী শ্রমিকও সর্বস্বান্ত হয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন। উদ্বেগজনক হলো, দালাল চক্র ও প্রতারকরা অভিবাসন প্রত্যাশী জনগোষ্ঠীর ক্ষতি তো করছেই, উপরন্তু দেশেরও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে; যা রোধ করা জরুরি। এদিকে প্রচারণার অভাবে সরকারি সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন প্রবাসে গমনেচ্ছুরা। এছাড়া প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকেও যে ঋণ মিলতে পারে, তাও জানেন না অনেকে। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী জনশক্তি রফতানিতে প্রতারণা ঠেকাতে যেসব নির্দেশ দিয়েছেন, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সেটি বাস্তবায়নে সক্রিয়তা প্রয়োজন।

বস্তুত প্রতারণার ঘটনা অব্যাহত থাকায় বহির্বিশ্বের সম্ভাবনাময় অনেক শ্রমবাজার এদেশীয় শ্রমিকদের জন্য নিষিদ্ধ জোনে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থায় কর্মপ্রত্যাশী অনেক তরুণ নানা মাধ্যমে অবৈধ উপায়ে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টাকালে বিপদের সম্মুখীন হচ্ছেন। ভূমধ্যসাগর ও লিবিয়া উপকূলে নৌকাডুবিতে অভিবাসন প্রত্যাশী বাংলাদেশীদের মৃত্যুর ঘটনা ছাড়াও এর আগে থাইল্যান্ডের গহিন অরণ্যে অবৈধ অভিবাসন প্রত্যাশীর গণকবরের সন্ধানও পাওয়া গেছে। সে সময় থাইল্যান্ডসহ মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকেও এদেশীয় অবৈধ অভিবাসীদের উদ্ধার করা হয়েছিল। বলার অপেক্ষা রাখে না, বৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার পথ রুদ্ধ বা বৈধ পথে জটিলতার কারণেই মানুষ অবৈধ উপায়ে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করে। এটি করতে গিয়ে প্রতারক ও দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে তারা কেবল সর্বস্বান্তই হচ্ছে না, মৃত্যুমুখে পড়ছে; যা মোটেই কাম্য নয়।

জাতিসংঘের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) বাংলাদেশ কার্যালয়ের এক গবেষণার তথ্যমতে, বেসরকারি খাতে বিদেশে বাংলাদেশের গড় অভিবাসন ব্যয় ৩ লাখ টাকার ওপরে। এ খরচ ভারত, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়ার চেয়ে চার-পাঁচ গুণ এবং পূর্ব ও পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোর তুলনায় সাত গুণ বেশি। তথ্যমতে, কুয়েত যেতে শ্রীলংকায় একজন অভিবাসীর গড়ে ২৭ হাজার টাকার মতো লাগে, ভারতে লাগে লাখ খানেক টাকা। আর বাংলাদেশে লাগে আড়াই লাখ টাকার বেশি। যদিও সরকার নির্ধারিত খরচ ১ লাখ টাকার সামান্য কিছু বেশি। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুসারে, কর্মীর অভিবাসন ব্যয় তার বার্ষিক মোট আয়ের ১০ শতাংশের বেশি হবে না। অর্থাৎ কেউ যদি মাসে ২৫ হাজার টাকা হিসেবে বছরে ৩ লাখ টাকা আয় করেন, তার অভিবাসন ব্যয় ৩০ হাজার টাকার মধ্যে থাকতে হবে। কুয়েতে যেতে সরকার নির্ধারিত খরচই এর পাঁচ গুণ। প্রকৃতপক্ষে খরচ হয় ১০ গুণের বেশি। মালয়েশিয়া যেতে সরকার নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয় সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। অথচ বেসরকারি খাতে একজন অভিবাসীর ব্যয় হয়েছে সাড়ে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা। মাত্র ১০টি এজেন্সির মাধ্যমে কর্মীরা মালয়েশিয়া গিয়েছেন। এত অল্প এজেন্সি থাকার পরও ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কোনো ব্যবস্থা নেয়া যায়নি। কাউকে শাস্তিও দেয়া হয়নি।

জনশক্তি রফতানিতে প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও ব্যয় কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এমনকি ভিয়েতনামের কর্মপ্রক্রিয়া অনুসরণ করা যেতে পারে। দেশগুলোয় সরকারি রেজিস্ট্রেশন ব্যতীত কেউ বিদেশে কর্মী হিসেবে যেতে পারেন না। এমনকি প্রতিটি এজেন্সির নিবন্ধন রয়েছে। নির্দিষ্ট সময় পরপর এজেন্সিগুলো তাদের কার্যক্রমের প্রতিবেদন জমা দেয়। হয়রানির শিকার কোনো ব্যক্তি অভিযোগ করলে দ্রুততার সঙ্গে ব্যবস্থা নেয়া হয়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, বিদেশে গমনেচ্ছুরা যেকোনো প্রয়োজনে সরকারি সহায়তা পান। অনলাইনেই সব সেবা দেয়া হয়। ভিয়েতনামে কার্যকর ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু রয়েছে। শ্রীলংকার সরকার এতটাই সচেতন যে কোনো দেশে তাদের কর্মী হয়রানির শিকার হলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ব্যবস্থা নেয়। অনেক দেশে জনশক্তি রফতানি নিজেরাই বন্ধ করে দিয়েছে। জনশক্তি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর থেকে শুরু করে সরকারি সংস্থাগুলোর জবাবদিহিতা আরো বাড়াতে হবে। দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ ও জেলা পর্যায়ে বিদেশে গমনেচ্ছুদের সহায়তার জন্য নির্ধারিত সেন্টারগুলোর মান উন্নয়ন করা চাই। 

জনশক্তি রফতানিকারক এজেন্সিও যদি প্রতারণা করে, তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ দেশের প্রচলিত বিধানেই রয়েছে। সরকার বিভিন্ন দেশে শ্রমবাজার খুঁজে প্রশিক্ষিত তথা দক্ষ শ্রমিক পাঠানোর উদ্যোগও নিয়েছে। তাতে যে ত্রুটি বা ঘাটতি রয়েছে তা বলাবাহুল্য। বিদেশেও শ্রম বিক্রির নিরাপদ রুটের শতভাগ নিশ্চয়তা নেই। এ অবস্থায় দেশের অগ্রযাত্রা কতটা গতিশীল, তা অনুমান করা সহজ। অবশ্যই যারা বিদেশে শ্রম বিক্রির জন্য যেতে আগ্রহী, তাদেরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন; প্রয়োজন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন। প্রবাসে দক্ষ শ্রমিকের কদর বেশি। দক্ষতা অর্জন এবং বিদেশে যাওয়ার জন্য কোনো এজেন্সির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হলে তার বৈধ কাগজপত্র দেশের জনশক্তি ব্যুরোর অনুসন্ধান বিভাগ থেকে জানা ও বোঝার সুযোগ রয়েছে। যদিও সেটা অনেকের কাছেই ঘুরো পথ বলে মনে হয়। ঘুরো পথকে সহজ করা যেমন জরুরি, তেমনি প্রয়োজন অভিযুক্ত এজেন্সির বিষয়ে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ। দুর্ভাগ্যজনক দিক হচ্ছে, এখনো বহু লোক বিদেশে চাকরির নামে নানাভাবে প্রতারণার শিকার হচ্ছে।

দালাল চক্রের মাধ্যমে বিদেশে বিপুলসংখ্যক অদক্ষ কর্মী যাওয়ার ফলে শুধু প্রবাসীর সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু শ্রম অনুযায়ী রেমিট্যান্স বাড়েনি। এ অদক্ষ কর্মীরা বেশির ভাগই গ্রামের দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী থেকে আসা। এই কর্মীরা জমিজমা বিক্রি করে সারা জীবনের পুঞ্জিত সঞ্চয় তুলে দেন দালালদের হাতে। তারা যে টাকায় বিদেশ যান, বিদেশে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেও সেই টাকাই তুলতে পারেন না। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বাংলাদেশের কর্মীদের মান অনেক নিচে। এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে না পারলে লাখ লাখ কর্মী বিদেশ গেলেও রেমিট্যান্সপ্রবাহ বাড়বে না। মূলত বাংলাদেশ থেকে বিদেশে সিংহভাগ কর্মী যায় বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বা তাদের মনোনীত দালালের মাধ্যমে। দালালরা অভিবাসন প্রক্রিয়ার তৃণমূল পর্যায়ে অবস্থান করায় বিদেশ গমনেচ্ছুরা তাদের ওপর অনেকটা নির্ভর করেন। তাদের কারণেই অভিবাসন ব্যয় ক্রমে বাড়ছে। শুধু এ দেশে নয়, গন্তব্য দেশটিতেও একটি শক্তিশালী মধ্যস্বত্বভোগী চক্র গড়ে উঠেছে। তাদের বিরুদ্ধে সরকারি পর্যায়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা করে ব্যবস্থা নেয়া দরকার বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। জনশক্তি এজেন্সিগুলোর জেলা পর্যায়ে অফিস না থাকায় এবং বিদেশ গমনেচ্ছুদের সিংহভাগ স্বল্পশিক্ষিত হওয়ায় তাদের ঠকানো দালালদের পক্ষে সহজ হয়ে দাঁড়ায়। জনশক্তি রফতানি খাতে স্বচ্ছতা আনতে দালালদের হয় বৈধ করতে হবে নতুবা এ খাতে তারা যাতে কোনো ভূমিকা রাখতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে।

শুধু দক্ষতা অর্জনই নয়, নতুন নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টির লক্ষ্যে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোর শ্রম উইংগুলোকে হারানো ও ক্ষতিগ্রস্ত বাজার পুনরুদ্ধারে এবং উদীয়মান নতুন ও বিকল্প শ্রমবাজার নিশ্চিত করতে আরো উদ্যোগী হতে হবে। প্রতারণার পথ বন্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ, দালালনির্ভরতা কমিয়ে প্রকৃত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানো এবং ইমেজ সংকট কাটিয়ে ওঠার কার্যকর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। সুষ্ঠু ও নিরাপদ অভিবাসী প্রক্রিয়ার লক্ষ্যে সার্বিকভাবে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উইং—বিএমইটি, বোয়েসেল, ওয়েজ আর্নার কল্যাণ বোর্ড, দূতাবাসের শ্রম উইং ও বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করা উচিত। মন্ত্রণালয় ও রিক্রুটিং এজেন্সির মধ্যে আলাপ-আলোচনা, সহযোগিতা ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে নিরাপদভাবে জনশক্তি রফতানিতে আরো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে বলে প্রত্যাশা।