দরিদ্রদের কভিড-১৯-এর অভিঘাত থেকে সুরক্ষা দিতে ১০ হাজার ১৭৩ কোটি টাকার সাতটি প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল সরকার। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, সামাজিক সুরক্ষার আওতায় নেয়া এসব প্যাকেজের অর্ধেকই অবণ্টিত থেকে গেছে। প্রায় ৫৬ শতাংশ এখনো বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। লক্ষ্য ছিল, প্যাকেজগুলোর মাধ্যমে দরিদ্র ও কর্মহীনদের নগদ ও খাদ্যসহায়তা, ঘর নির্মাণ, ১০ টাকা কেজিতে চাল বিতরণ, দরিদ্র, বিধবা ও বয়স্ক ভাতাসহ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো হবে। কর্তৃপক্ষ বলছে, উপকারভোগীর তালিকা তৈরির সঙ্গে কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ জড়িত। এ তালিকা তৈরিতে অনেক ক্ষেত্রেই নানা অনিয়ম দেখা যায়। তাই যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুতে অনেক সময় প্রয়োজন। এ কারণে এসব প্যাকেজ বাস্তবায়নে সময় বেশি লাগছে। সামাজিক সুরক্ষা প্রদানের কাজটি সরকারের। এটাকে রাষ্ট্রের কল্যাণমূলক কাজ হিসেবে দেখলে মনে হতে পারে এটি কোনো দয়া-দাক্ষিণ্য। অথচ এ দুঃসময়ে খাদ্য সরবরাহ পাওয়া জনগণের অধিকার। এ সাহায্য মোটেই অর্থনীতির বাইরের কোনো সাময়িক দান প্রকল্প নয়। এ মুহূর্তে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট সামাজিক সুরক্ষা তহবিলের কার্যকর বাস্তবায়ন।
করোনায় কর্মহীন দরিদ্র মানুষকে খাদ্যসহায়তা দিতে আড়াই হাজার কোটি টাকার প্যাকেজের মধ্যে বিতরণ বাকি আছে ১ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা। নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে ১০ টাকা কেজির চাল বিতরণের জন্য ৭৭০ কোটি টাকা প্রণোদনার পুরোটাই ব্যয় হয়েছে। এতে ১৮ লাখ গরিব মানুষ উপকৃত হয়েছে। আর সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বাইরে করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের নগদ আড়াই হাজার টাকা করে দেয়ার জন্য বরাদ্দকৃত ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকার প্যাকেজের ৩৭৮ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়নি। এ চিত্র হতাশাজনক। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দেশে মোট দারিদ্র্যের ৩৩ শতাংশ যুক্ত করতে পারছে। এটি শতভাগে উন্নীত করতে হবে। কভিড-১৯-এ অনেকে কর্মহীন হয়েছে। তাদের প্যাকেজ সহায়তার আওতায় আনতে হবে। গরিবদের খাদ্যসহায়তা আরো বাড়াতে হবে। স্বাস্থ্য খাতের সুবিধা বাড়াতে হবে। সব কয়টি উপজেলায় ওএমএস কর্মসূচি চালু, কর্মসংস্থান বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে। প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে কাজ হারানো শ্রমিকদের বেতন দেয়া নিয়ে জটিলতা তৈরি হলে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল, প্রণোদনা পেতে হলে শ্রমিকদের পরিচয়পত্রসহ অ্যাকাউন্টে বেতন জমা দেয়ার প্রমাণ দিতে হবে। কিন্তু সবার পরিচয়পত্র ও অ্যাকাউন্ট না থাকায় এ বেতনপ্রাপ্তি কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে, তা প্রশ্ন রয়ে গেছে। অর্থাৎ এখন শুধু প্রণোদনা প্যাকেজ দিলেই নিশ্চিত হয়ে বলা যাচ্ছে না, সরকারের সহায়তা আসলে জায়গামতো পৌঁছাচ্ছে কিনা, বরং সুষ্ঠু বিতরণ প্রক্রিয়া এখানে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।
কর্তৃপক্ষের দেখা উচিত ছিল সারা বিশ্বেই সামাজিক সুরক্ষায় সরকার কীভাবে অবদান রাখছে। অর্থাৎ সংখ্যার বাইরে গিয়ে প্রণোদনার কার্যকারিতা বিশ্লেষণের প্রয়োজন ছিল। বর্তমান সংকট মোকাবেলায় জনগণের দুর্ভোগ কমানোয় প্রণোদনার কার্যকারিতাকে মাপকাঠি হিসেবে ধরলে নিশ্চয়ই এখানে সামাজিক সুরক্ষার জন্য সুনির্দিষ্ট প্যাকেজটি সময়মতো বাস্তবায়ন হতো। মালয়েশিয়াসহ অনেক দেশের সরকার একটি নম্বর দিয়েছিল। করোনার কারণে নতুন করে যারা চাকরি হারিয়েছেন, তারা নিজেরাই ওই নম্বরে যোগাযোগ করে চাকরি হারানোর কথা সরকারকে জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে সরকার চাকরি হারানোদের আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। বাংলাদেশও এ ধরনের উদ্যোগ নিতে পারত। কিন্তু তারা সে উদ্যোগ নেয়নি। বর্তমানে আবার করোনা বাড়ছে, তাই সরকার প্রয়োজন মনে করলে এ উদ্যোগ এখনো গ্রহণ করতে পারে। এজন্য প্রয়োজন ক্ষতিগ্রস্তদের নির্ভরযোগ্য একটি তালিকা। জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বরের ওপর নির্ভর করে এমন তালিকা দ্রুত প্রণয়ন কঠিন কিছু নয়।
প্রণোদনার মাধ্যমে শ্রমিকের কর্মসংস্থানকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। শ্রমজীবী মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, রেশনিং ব্যবস্থাকেও ধরে রাখতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম উন্নয়নের জন্য একটি প্রকল্প নিয়েছে সরকার। পুরো বিষয়টিকে সরকার একটি ডিজিটাল ফর্মে নিয়ে আসতে চাইছে। আর তা হলো এমআইএস। এমআইএস করলে কিছুটা ভালো হবে। তবে এটিও মনে রাখতে হবে এমআইএস কিন্তু সব সমস্যা সমাধান করে দেবে না। তার জন্য আমাদের সুনির্দিষ্ট কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হবে। গ্রামে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বরাদ্দের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বিতরণ করা হয়নি। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর লক্ষ্যে শতভাগ বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধীদের সহায়তার জন্য বরাদ্দ থাকলেও বিতরণ করা হয়েছে কম। লক্ষ করা যাচ্ছে, যেসব প্যাকেজের আওতায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বেশি উপকৃত হতে পারে, সেসব প্যাকেজের বিপুল পরিমাণ অর্থ বিতরণ করা সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় প্রণোদনা প্যাকেজের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং জোরদার করা প্রয়োজন। সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম বা সংশ্লিষ্ট প্যাকেজের কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন ক্ষতিগ্রস্ত ও হতদরিদ্রদের সঠিক তালিকা। এখানেই নাকি জটিলতা। স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে সঠিক তালিকা প্রণয়নে এত সময় ব্যয় হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে না। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা কতটা দায়ী, সেটি চিহ্নিত করা প্রয়োজন।










