ছুটির মৌসুমের ঠিক আগের মুহূর্তে ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের বিস্তারে পৃথিবীর অগ্রসর অর্থনীতির দেশগুলোয় আক্রান্ত এবং হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় নতুন ঢেউ তৈরি হয়েছে। এর মাধ্যমে ভ্যাকসিন গ্রহণে দ্বিধার বিষয়ে (কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরাসরি প্রত্যাখ্যান, যেমন সার্বিয়ান টেনিস তারকা নোভাক জোকোভিচ) নতুন করে মনোযোগ আকর্ষিত হয়েছে। ভ্যাকসিন গ্রহণ না করা ব্যক্তিরা অধিক দুর্বল হয়ে পড়ছেন। দুই কিংবা তিন দফার এবং অধিক শক্তিশালী ডোজ ভাবতে বাধ্য করছে যেন বোঝা যায় কতটুকু হলে যথেষ্ট বলা যাবে। আরো খারাপ বিষয় হলো, উন্নয়নশীল দেশের লাখ লাখ লোক এখনো ভ্যাকসিন পায়নি। এটি চলমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় একটি বড় ব্যর্থতা।

তীব্র সংকটের এ মুহূর্তে নীতিনির্ধারকদের সাম্প্রতিকতম সমস্যা সমাধানে ঝাঁপিয়ে পড়া প্রয়োজন। সমস্যাটি হলো, ভ্যাকসিন যারা লাভ করেননি, তারা মৃত্যু এবং হাসপাতালে ভর্তির পাশাপাশি ভাইরাস মিউটেশনে সাহায্য করবেন। কিন্তু তার চেয়েও বড় বিষয়, নীতিনির্ধারকদের সমস্যাটির মূলে যেতে হবে। ভ্যাকসিন গ্রহণে দ্বিধা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি আমাদের যুগের প্রাথমিক ব্যাধিগুলোর লক্ষণ: ভঙ্গুর সামাজিক চুক্তি, যার কারণে বহু দেশে প্রতিষ্ঠানের প্রতি গণমানুষের বিশ্বাস হারিয়ে গেছে।

সামাজিক চুক্তি ১০১

সামাজিক চুক্তি মূলত একগুচ্ছ নিয়ম, রীতি ও পারস্পরিক দায়িত্বের সমন্বয়; যা ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ ও রাষ্ট্রকে যুক্ত করে। সহজ করে বললে, সামাজিক চুক্তি আমাদের পরস্পরের প্রতি কর্তব্যের কথা জানায়। অতিমারীর প্রেক্ষাপটে এটি নির্দিষ্ট করে যে সামষ্টিক স্বার্থের ওপর ব্যক্তির স্বার্থ কতটা গুরুত্ব লাভ করবে। ভ্যাকসিন গ্রহণ, মাস্ক পরা কিংবা নিজেকে আলাদা করে রাখার ক্ষেত্রে মানুষ নিজেকে বাধ্য মনে করবে কিনা তা মহামারীসংক্রান্ত নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

কিন্তু সামাজিক চুক্তি এছাড়া আরো কিছু সাধারণ বিষয় ‘নিয়ন্ত্রণ’ করে, যার মধ্যে মানুষে মানুষে যোগাযোগের বিষয় অন্তর্ভুক্ত। যেমন সমাজে শিশুস্বাস্থ্যের যত্ন নেয়ার দায়িত্ব কার? কেবল কী পরিবারই নিজ শিশুর দায়িত্ব গ্রহণ করবে, নাকি রাষ্ট্রের সহায়তায় কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নির্দিষ্ট নীতির পরিপ্রেক্ষিতে কাজটি করা হবে?

স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও প্রশ্নটি একই রকম। স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয় খরচ কি ব্যক্তি একা বহন করবেন, নাকি তার নিয়োগকর্তা বা বীমা কোম্পানি করবে? নাকি এ দায়িত্ব রাষ্ট্রের? এবং নিয়োগকর্তাদের তরফ থেকে নিয়মিত কর্মঘণ্টা এবং মুনাফা আশা করা যৌক্তিক—অসুস্থতার কারণে ছুটি, পেনশন প্রভৃতিও গুরুত্বপূর্ণ, নাকি কর্মচারীরা নিজের মতো করে নিজের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন?

তুলনামূলক প্রচলিত ধারার সমাজে সামাজিক চুক্তি বিষয়টি পরিবার ও সম্প্রদায়ের দ্বারা পালিত হয়। অন্যদিকে আধুনিক সমাজ, বাজার ও রাষ্ট্রের ওপর বৃহত্তর দায়িত্ব দিতে চায়। তবে যেকোনো সমাজেই সক্ষম প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি অধিক আশা থাকে যে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে তারা বেশি অবদান রাখবেন যেন তরুণ, বয়স্ক বা দুর্বল অবস্থায় তাদের দেখাশোনার ব্যবস্থা সহজ হয়।

জনগণের কল্যাণের পয়েন্টটি হলো, সমাজের জন্য ব্যক্তিকে অধিক অবদান রাখার ক্ষেত্রে আগ্রহী করে তোলা। প্রত্যাশা হলো, যারা সমাজ থেকে কিছু লাভ করছেন, তারা সমাজেও কিছু অবদান রাখবেন। সক্ষম ব্যক্তি যদি কোনো অবদান না রেখে কেবল গ্রহণ করেই যান, সোস্যাল কন্ট্রাক্টের এ লঙ্ঘন থেকে সমাজে ব্যক্তির অবস্থান নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি এর ফলে সমাজে পারস্পরিক বিশ্বাস এবং উদ্দেশ্য নষ্ট হবে। এতে কেবল ব্যক্তির জীবনই বাধাগ্রস্ত হয় না, বরং সমাজকে যুক্ত রাখার গ্রন্থিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে।

ভিত্তিতে ভাঙন

আজকের দিনে বেশির ভাগ দেশের প্রচলিত সামাজিক চুক্তি কিছু সাধারণ বিষয়ের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছিল। ঐতিহ্যগতভাবে এমন একটা ব্যবস্থা সবাই তৈরি করে ফেলেছে, যেখানে একজন পুরুষ পুরো পরিবারের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করবেন এবং নারীর কাজ কেবল শিশু ও বৃদ্ধদের সেবা।

মেনে নেয়া হয়েছে যে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মানুষ বিবাহিত থাকবে এবং সন্তান গ্রহণের জন্য বিবাহবন্ধন থাকতে হবে। পুরুষ তার রোজগারের বন্দোবস্ত স্থির রাখবেন এবং ক্যারিয়ারে অল্প কয়েকজন নিয়োগকর্তার অধীনেই কাজ করবেন। স্কুল থেকে পাওয়া তার শিক্ষাই জীবনের জন্য যথেষ্ট। অবসর গ্রহণ করবেন একদম শেষ বয়সে যেন অবসরের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বেশিদিন কারো ওপর নির্ভর করতে না হয়।

একবিংশ শতাব্দীতে অপ্রাসঙ্গিক হওয়ার পরও আজ পর্যন্ত এসব নীতির অনেকগুলো সমাজে প্রচলিত। বৈশ্বিকভাবে এখন অর্ধেকেরও বেশি নারী শ্রমবাজারে কর্মরত (যদিও অঞ্চলভেদে সংখ্যার তারতম্য রয়েছে)। বিশ্বের উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোয় এক-তৃতীয়াংশ থেকে অর্ধেক দম্পতি ডিভোর্স গ্রহণ করছেন। উন্নয়নশীল দেশগুলোয় ডিভোর্সের হার কম হলেও তা দিন দিন বাড়ছে। বিবাহিত দম্পতির বাইরেও শিশু জন্মগ্রহণ করছে।

এছাড়া গড়পড়তা কর্মচারীরা অতীতের তুলনায় অধিক ক্ষেত্রে চাকরি ধরে রাখতে পারেন। প্রযুক্তির উন্নতির কারণে সুযোগটি এসেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রথাগত কর্মসংস্থানে কর্মী নিয়োগে যখন হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো স্বল্প কিংবা বিনা লাভে শ্রমবাজারে অধিক কর্মী নিয়োগ করছে।

লিঙ্গ এবং প্রযুক্তি

এ পরিবর্তনগুলোর পেছনে নানা কারণ রয়েছে, তবে সবচেয়ে বড় দুটি কারণ হচ্ছে লৈঙ্গিক ভূমিকায় পরিবর্তন, যার মাধ্যমে শিশু ও বয়স্কদের যত্নের বিষয়গুলো বদলে গেছে। এছাড়া প্রযুক্তির উন্নতির ফলে কাজ ও শিক্ষা ব্যাহত হয়েছে। উভয় বিষয় এখনো প্রভাব রাখছে এবং এর মাধ্যমে আরো পরিবর্তন আসছে। স্থানান্তর এবং নানা কারণে বহু দেশই তাদের জনমিতিতে পরিবর্তন আশা করছে। আরো বাজে বিষয় হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অর্থনীতি ও জীবন পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে।

বহুদিনের এ টালমাটাল পরিবর্তনের পরও আমাদের সামাজিক চুক্তি (সোস্যাল কন্ট্রাক্ট) সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে নেয়া হয়নি। ফলে নাগরিকদের প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার এক ধরনের ফারাক রয়ে গেছে। সমাজ একসময় যে আশাগুলো জাগিয়েছিল, তা পূরণ না হওয়া এবং ব্যক্তি যখন লক্ষ করেন আগের মতো তার অবদানের স্বীকৃতি মিলছে না, তখন থেকেই সমাজের মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস ও বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়।

বেশকিছু দেশেই এ ধরনের ভাঙন দৃশ্যমান। জীবনমান এবং আজকের দিনের মানুষের ক্ষোভ ও অস্থিরতা সম্পর্কে এ ঘটনাগুলো তুলনামূলক স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়। পরবর্তী বিষয়টির ব্যাখ্যা প্রায় একই ধরনের। তবে তা অপর্যাপ্ত। সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই যে অসমতা ও দারিদ্র্য সমাজের বহু দুর্দশার জন্য দায়ী কিন্তু ধনী বিশ্বের মধ্যবিত্ত সমাজে রাজনৈতিক চরম পন্থা, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, মাদক ও ভ্যাকসিন গ্রহণে অনীহা প্রসঙ্গ এর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায় না।

সচ্ছল ও শিক্ষিত জনগণের মধ্যে একাকিত্ব ও বিষাদগ্রস্ততার সমস্যাগুলো আমাদের শেখায় যে বস্তুগত অভাবের তুলনায় সামাজিকভাবে একা হয়ে যাওয়ার বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগতভাবে ভালো থাকার বিষয়টি সমাজে ব্যক্তির সংযুক্তি এবং অবদানের ওপর নির্ভর করে—সোস্যাল কন্ট্রাক্ট বা সামাজিক চুক্তি এ কথাই বলে।

ব্যাক টু দ্য ড্রইংবোর্ড

স্পষ্টতই সামাজিক চুক্তির বিষয়টি নিয়ে বৃহত্তর পর্যায়ে আলোচনা প্রয়োজন। কিন্তু কোন পর্যন্ত? বিশ শতকের শুরুর দিকে সমাজবিজ্ঞানী বিয়েত্রিস ওয়েব (লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা) ব্যাখ্যা করে বলেন, সামাজিক চুক্তি রক্ষা করতে হলে অবশ্যই—

‘...জাতীয় পর্যায়ে ন্যূনতম নাগরিক জীবন বজায় রাখতে হবে...সব লিঙ্গ ও শ্রেণীর প্রতি উদারতা প্রদর্শনের মাধ্যমে তরুণদের পর্যাপ্ত যত্ন ও প্রশিক্ষণ, কর্মক্ষম অবস্থায় উপযুক্ত মজুরি, অসুস্থতার সময় চিকিৎসা এবং বৃদ্ধাবস্থা কিংবা অক্ষম দশায় জীবিকার নিরাপত্তা প্রদান করতে হবে।’

সমাজ ও ব্যক্তির মধ্যে দরকষাকষির বিষয়টি ওয়েবের মতো প্রাসঙ্গিকভাবে কেউ ব্যাখ্যা করেনি। এখানে আধুনিক সময়ের সমাজে চুক্তির তিনটি নির্দিষ্ট বিষয় স্পষ্ট করে দেখানো হয়: সবার জন্য ন্যূনতম অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সক্ষমতা অনুসারে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ এবং বৃহত্তর পর্যায়ে ঝুঁকির সম্ভাবনা ভাগ করে নেয়া।

সবার জন্য ন্যূনতম অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বলতে বোঝায় প্রতিটি সমাজ থেকে এমন একটি সীমা নির্দিষ্ট করা হবে, যার নিচে কখনো ওই সমাজের মানুষের আয় কমবে না। এ ব্যবস্থা করতে উন্নয়নশীল দেশের ক্যাশ ট্রান্সফার প্রোগ্রাম থেকে অগ্রসর অর্থনীতির দেশের নিম্ন আয়ের শ্রমিকদের ট্যাক্স ক্রেডিট ব্যবস্থা পর্যন্ত বেশকিছু উপাদানের সহায়তা নেয়া যায়।

কিন্তু এ ন্যূনতম নিরাপত্তার মধ্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, বৃদ্ধাবস্থায় দারিদ্র্য এড়াতে একটি পেনশন, অসুস্থতার কারণে ছুটি, বেকার ভাতা থাকা উচিত। যেকোনো ধরনের চাকরির ক্ষেত্রেই এ বিষয়গুলো নজর দিতে হবে। অর্থাৎ উন্নয়নশীল দেশগুলোয় আনুষ্ঠানিক ক্ষেত্রগুলোয় অধিক কর্মী নিয়োগ এবং সচ্ছল অর্থনীতির দেশগুলোয় কর্ম অনুসারে মুনাফা দিতে হবে।

এই শেষ বিষয়টি বেশ জটিল, কেননা এটি সামাজিক চুক্তির অভিযোজনের বিষয়টিকে চাপের মুখে ফেলে। শ্রমবাজারের নিরাপত্তা দ্রুত নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রকৃতপক্ষে যেখানে নিরাপত্তা ও নমনীয়তা একই সঙ্গে পাওয়া যায়, সে অবস্থাটি সবার পছন্দ। ডেনমার্কের সাবেক প্রধানমন্ত্রী পওল নিরুপ রাসমুসেনের ভাষায়, ‘ফেলক্সিকিউরিটি’। অনিবার্য বিপ্লব এবং কাজের বিঘ্ন এ ব্যবস্থায় আঘাত হানার দাবি করে।

একটি গ্রাম

দ্বিতীয় নীতিটি হলো সক্ষম ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ, যা কিনা অনেক ক্ষেত্রে অবহেলা করা হয়। সচ্ছল কিংবা উন্নয়নশীল উভয় অর্থনীতির ক্ষেত্রে প্রতিভার অপচয় হচ্ছে। সমাজকে সচল রাখতে সমাজের যেসব ক্ষেত্রে বিনিয়োগ হওয়া প্রয়োজন, এ সম্পর্কে কোনো নীতি না থাকায় এমন হয়। যেসব অঞ্চলে সময়ের সঙ্গে ব্যক্তির উন্নতি সম্ভব হওয়া সত্ত্বেও এ ধরনের অপচয়ের কারণে উন্নতি ব্যাহত হয়, সেখানে অসন্তুষ্টি বৃদ্ধি পেতে থাকে। নরডিক দেশগুলোয় নিম্ন মজুরি থেকে মধ্যমানে উঠতে দুই কিংবা তিন প্রজন্ম পরিমাণ সময় অপেক্ষা করতে হয়। আজকের দিনে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে পাঁচ এবং দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলে নয় প্রজন্ম পার হয়ে যায়।

নষ্ট হয়ে যাওয়া এ প্রতিভার অনেকটাই নারী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্ম নেয়া শিশুদের ক্ষেত্রে ঘটে; যারা তাদের অবস্থানের কারণে উন্নতি করতে পারে না। সবার জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব না হওয়ার কারণে সমাজে আংশিক নয়, বরং সার্বিকভাবে এক ধরনের ব্যর্থতা তৈরি হয়।

১৯৬০ থেকে ২০১০ পর্যন্ত সময়কালে যুক্তরাজ্যের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ২০-৪০ শতাংশের কৃতিত্ব মূলত এ সুপ্ত প্রতিভা ব্যবহারের। শ্বেতাঙ্গদের প্রাধান্য দেয়ার বদলে আইন ও সামাজিক নীতিতে পরিবর্তন এনে সব ধরনের মানুষের মধ্য থেকে কর্মী নিয়োগে নিয়োগকর্তাদের আগ্রহী করার মধ্য দিয়ে উভয়ের সুবিধা নিশ্চিত করা হয়।

একইভাবে যে সমাজ মেধাবী এবং সম্ভাবনাময় তরুণদের ক্ষমতায়িত করে, উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে তাদের ভালো ফল লাভ করা সম্ভব। এলএসইর সেন্টার ফর ইকোনমিক পারফরম্যান্স দেখায় যে দরিদ্র পরিবারের মেধাবী ছেলেমেয়েদের—লস্ট আইনস্টাইন—তরফ থেকে ধনী পরিবারের ছেলেমেয়েদের সমহারে নতুন নতুন পরিকল্পনা আসার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ভাবন চতুর্গুণ হয়েছে।

নাগরিকদের প্রারম্ভিক বছরগুলোর বিনিয়োগ থেকে বলা যায়, একুশ শতকে সফল সমাজগুলো শিক্ষা বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করে তুলনামূলক ভালো ক্যারিয়ার তৈরি করতে পারবে। যদিও বেশির ভাগ দেশেই শিক্ষা ক্ষেত্রে সমান সুযোগ রয়েছে কিন্তু কর্মক্ষেত্রে নারীরা এখনো নানা সমস্যা মোকাবেলা করেন, কেননা তাদের অন্তত ২ ঘণ্টা বিনা মজুরিতে কাজ করতে হয় (গার্হস্থ্য এবং অন্যান্য); যা পুরুষদের দরকার হয় না। মাতৃত্বকালীন ছুটির ক্ষেত্রে উদারতা, পরিবারের সহায়তায় সরকারি প্রণোদনা এবং ঘরে তুলনামূলক কম শ্রম নিশ্চিত করলে নারীর প্রতিভা কাজে লাগানো সম্ভব হবে, যা কিনা সমাজের কল্যাণ করবে।

পরিশেষে, সামাজিক চুক্তির ঝুঁকি ভাগাভাগি করে নেয়ার পরিসর বাড়াতে হবে। মূলত ঝুঁকিগুলো ব্যক্তি নিয়ে থাকেন, যা কিনা সমষ্টিগতভাবে কাজটি করা সম্ভব। যেমন নিয়োগ ও চাকরিচ্যুতির ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তারা আরো নমনীয় হতে পারেন যদি চাকরিচ্যুত কর্মীদের বেকারত্ব বীমা এবং পুনঃপ্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যায়। এর মাধ্যমে সমাজে চাকরিচ্যুতি ও বেকারত্ব বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবা, বৃদ্ধ ও শিশুদের যত্নের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। যেমন মাতৃত্বকালীন ছুটির খরচ নিয়োগকর্তা কর্তৃক বহন করার বিষয়টি কোনো অর্থ তৈরি করে না। সর্বোপরি সরকারি অর্থে প্রণয়ন করা প্যারেন্টাল লিভ ছোট প্রতিষ্ঠানের ওপর থেকে বোঝা কমানোর পাশাপাশি নারী ও পুরুষের জন্য সমতাভিত্তিক প্লাটফর্ম তৈরি করবে।

একইভাবে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যঝুঁকি কমিয়ে আনার মাধ্যমে অধিক দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টি এবং স্বল্প খরচে কাজ করা সম্ভব। খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে সহজেই স্বাস্থ্যঝুঁকি কমিয়ে আনা সম্ভব। আবার নির্দিষ্ট বয়সের মানুষের জন্য পেনশন এবং ইন্স্যুরেন্সের ব্যবস্থা করা হলে মানুষ বৃদ্ধাবস্থায় অধিক নিরাপত্তার নিশ্চিন্ত জীবন লাভ করবে এবং অন্যদের ওপর চাপ কমবে। এ কারণে জাপান ও জার্মানি তার নাগরিকদের বৃদ্ধাবস্থায় সামাজিক বীমার ব্যবস্থা করেছে।

সম্পর্কের পুনঃপ্রতিষ্ঠা

সামাজিক চুক্তি মূলত কোনো আইনি ব্যবস্থা নয় কিংবা এমন কোনো একক সাধারণ ব্যবস্থা নয়; যা যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, চিলি ও ঘানা সব ক্ষেত্রেই কার্যকর হবে। প্রতিটি সমাজের নিজস্ব ইতিহাস, রীতিনীতি অনুসারে এবং পরিবার, প্রতিষ্ঠান, সম্প্রদায়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন নিয়মের ওপর ভিত্তি করে আলাদাভাবে সোস্যাল কন্ট্রাক্ট তৈরি করতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও অতিমারীর মতো ঝুঁকিগুলো পৃথিবীর সব দেশকে একই সময়ে একইভাবে মোকাবেলা করতে হয়। তাই এগুলোকে খণ্ড খণ্ডভাবে মোকাবেলা করার বিষয়টি অবাস্তব; সামষ্টিক উদ্দেশ্য এবং পদক্ষেপ ছাড়া এ সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। যে সূত্রগুলো আমাদের সমাজকে একত্রে বাঁধে, সেগুলো পুনরায় দৃঢ় করার ক্ষেত্রে আমাদের বৈশ্বিক আন্তঃনির্ভরশীলতাকে স্বীকার করতে হবে। জাতীয় পর্যায়ে নতুন ধারার একটি সামাজিক চুক্তি—যা আমাদের আধুনিক জীবনের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক—প্রতিষ্ঠিত হলেই প্রতিটি দেশের অভ্যন্তরীণ এবং বৈশ্বিক পর্যায়ে দেশের সঙ্গে দেশের বিশ্বাসের সম্পর্ক বৃদ্ধি করে একাত্মতা তৈরি করা সম্ভব হবে।

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]

 

মিনুশ শফিক:  লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সেসের অধ্যাপক ও পরিচালক

ভাষান্তর: মাহমুদুর রহমান