মেডুসার শরীর থেকে মাথাটাকে আলাদা করলেন পারসিয়াস। দীর্ঘ সময় পর শেষ হলো মেডুসা নিয়ে আতঙ্ক। তবে অদ্ভুত এক জীব জন্ম নিল তার রক্ত থেকে। দুই পাখাবিশিষ্ট ঘোড়াসদৃশ প্রাণী। বিপুল শক্তিধর ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী জীবটির নাম প্যাগাসাস। তাকে নিয়ে অনেক শত্রুর ব্যূহ ভেদ করেছেন বীর বেলেরফোন। দেবরাজ জিউস দিয়েছেন বজ্রের ভার বহনের দায়িত্ব। গ্রিক পুরাণে প্যাগাসাসের গল্প অল্প নয়। কিন্তু হাল আমলে নামটি পেয়েছে ভিন্ন মনোযোগ। পরিচিতি কুড়িয়েছে স্পাই সফটওয়্যার হিসেবে। নির্দিষ্ট কোনো ডিভাইসের মেসেজ পড়া, কল ট্র্যাক করা, পাসওয়ার্ড সংগ্রহ ও লোকেশন শনাক্ত করতে পারে প্রযুক্তিটি। তথ্য নিতে পারে মাইক্রোফোন, ক্যামেরা ও সংগ্রহে থাকা অ্যাপ থেকে। এমন তথ্যে হঠাৎ মানবাধিকার নিয়ে টনক নড়েছে কারো। মানবসভ্যতা কি তাহলে গোপনীয়তা রক্ষার স্বাধীনতা হারাচ্ছে? নিরাপত্তার অজুহাতে কি এমন পৃথিবী তৈরি হচ্ছে, যেখানে পাবলিক ও প্রাইভেট জীবনের কোনো ফারাক নেই? আশঙ্কা অস্বাভাবিক নয়। প্রযুক্তি মানুষের সামনে স্বর্গের স্বপ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সত্য। কিন্তু তার পেছনে উৎসর্গ করে আসতে হচ্ছে গোপনীয়তাকে।
অভিধান ঘাঁটলে ধারণা পেতে কষ্ট হবে না। পরিবার, প্রিয় মানুষ, বন্ধুদের নিয়ে গড়ে ওঠে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন। রক্তের দিক থেকে কিংবা মনস্তাত্ত্বিকভাবে সংজ্ঞায়িত হয় ব্যক্তিগত জীবনের পরিধি। বাকি সব ধরনের পরিচিতি মুক্ত জনপদের অঞ্চল। কিন্তু বাস্তব জীবনে কি এর অস্তিত্ব আছে? মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত ইস্যুগুলো হামেশাই ঝড় তুলছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। ব্যবহৃত হচ্ছে আবেগ। ব্যবহারকারীরা যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাকাউন্ট খোলেন, তাদের কয়জন ওই মিডিয়ার প্রাইভেসি নীতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকে? তারা কি সবকিছু বুঝেই সম্মতি দেয়? তৃতীয় কোনো পক্ষ যে তার ওপর নজরদারি চালাচ্ছে না, তার নিশ্চয়তা কে দিচ্ছে? ব্যক্তিগত তথ্য যে ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে না, কে বলতে পারে? খোদ বাংলাদেশেই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জনের ফোনালাপ ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। ভবিষ্যতেও ঘটবে। সে ব্যক্তির গোপন কোনো কর্মকাণ্ডের জন্য কয়েক দিনের জন্য সয়লাব হয়ে যাচ্ছে নেটপাড়া। ছি ছি পড়ে যাচ্ছে উপর থেকে নিচ তলায়। কিন্তু এ প্রশ্ন ওঠা কি স্বাভাবিক না যে ফোনালাপ ফাঁস হওয়ার ঘটনাটা কতটুকু আইন মেনে হয়েছে? অভিযুক্তের কি মৌলিক অধিকার থাকতে নেই? আদালতে অভিযোগ প্রমাণের আগেই কি এক দফা শাস্তি দিয়ে ফেলা হলো না? গোপনীয়তা মানুষের মৌলিক অধিকার। বিশ্বের ১৩০টি দেশের সংবিধানে একে আক্ষরিক অর্থেই উল্লেখ করা হয়েছে। রয়েছে ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক ঘোষণার ১২তম অনুচ্ছেদে। জোর দেয়া হয়েছে ১৯৫০ সালের ইউরোপিয়ান সম্মেলনে ঘোষণাপত্রেও। সে হিসাবে মানুষ তার পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবনের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা পাবে। পৃথিবীর শতাধিক দেশে কোনো না কোনোভাবে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন রয়েছে। কিন্তু তার বাস্তবায়ন সুদূরপরাহত।
কেউ যখন অনলাইনে যুক্ত হয়, তখন ব্যক্তিগত তথ্য দিয়েই যুক্ত হতে হয়। সহজলভ্য হয়ে ওঠে আয় ও ব্যয়সংক্রান্ত তথ্য, অসুস্থতাজনিত তথ্য, ফোন, পাসপোর্ট, ই-মেইল অ্যাড্রেস কিংবা বসবাসের ঠিকানা। কেউ হয়তো অতি আবেগে দিয়ে বসে আরো গোপন কিছু। প্রতিটি তথ্যই প্রতিপক্ষের হাতে তুলে দেয়া অস্ত্রের মতো। অনলাইনে প্রেমের ফঁvGদ ফেলে টাকা আদায় করে নেয়ার ঘটনা পুরনো নয়। তবে করোনার প্রাদুর্ভাবে বিশ্বজুড়ে নতুন প্রবণতা দেখা দিয়েছে। নিরাপত্তার নামে নাগরিকদের ওপর বৃদ্ধি পেয়েছে নজরদারি। নাগরিকদের অবস্থান ও গতিবিধি ট্র্যাক করা হয়েছে কেবল করোনা প্রতিরোধের অজুহাতে নয়, দেশে বিদ্যমান সমালোচক ও বিরোধী মতামত দমনের জন্যও। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ চীন। সৌদি আরব ও ভারতেও দেখা মিলেছে নজরদারির প্রমাণ। ক্রমে অন্যান্য দেশ এদিকেই ঝুঁকে পড়ছে। যখন কোনো দেশের সরকার এ ধরনের নজরদারিতে যুক্ত হয়, তা আরো বড় ধ্বংসাত্মক ইঙ্গিত বহন করে। প্রথমত, ন্যায়বিচারের জন্য হুমকি ও দ্বিতীয়ত, গণতন্ত্রের মৃত্যু। কার্ল মার্ক্স নাকি পুঁজিবাদের পতন দেখেছিলেন। কিন্তু তাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পৃথিবীতে পুঁজিবাদ কেবল টিকে থাকেনি, রীতিমতো শাসন করে চলছে আজ অবধি। তার বড় কারণ মানুষের ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বাণিজ্য করতে পারে পুঁজিবাদ। শশব্যস্ত দুনিয়ার মাঝেও ব্যবহারকারীর মনকে বোঝার চেষ্টা করে। অবশ্যই সান্ত্বনা দেয়ার জন্য নয়। চাহিদা মোতাবেক নতুন পণ্যের গ্রাহকে পরিণত করার জন্য।
রিচার্ড সেনেট ১৯৭৭ সালে প্রকাশ করেন তার বহুল আলোচিত বই ‘দ্য ফল অব পাবলিক ম্যান’। তখনই তিনি উপস্থাপন করেছেন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। নাগরিকদের পাবলিক জীবন ক্রমাগত দূষিত হচ্ছে ব্যক্তিগত জীবনে অনুপ্রবেশে। অর্থাৎ একসময় যা একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় ছিল, তা ক্রমে চলে আসছে মানুষের সামনে। এটা অবশ্যই নতুন ধরনের দূষণ। কারণ এর মাধ্যমে শুধু পাবলিক জীবনই কেবল ম্লান হয়ে যাচ্ছে না, বিষাক্ত হয়ে উঠছে ব্যক্তিগত জীবনের বিষয়াবলিও। ফলে ক্রমে ফিকে হয়ে যাচ্ছে পাবলিক মোরালিটির ধারণা। বিগত দশকগুলোয় রাজনৈতিক টানাপড়েন বেড়েছে। বেড়েছে মানুষের ভেতরের অস্থিরতা। প্রযুক্তির আশীর্বাদে বদলে গেছে পৃথিবীর রূপ। মানুষ ভারসাম্য হারিয়েছে নিজেকে ও চারপাশের জীবনকে বোঝায়। ফলে পাবলিক ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যকার সীমারেখা ভেঙে পড়ছে। তৈরি হয়েছে নৈরাজ্য। এ নৈরাজ্যের ব্যারোমিটার চরম অবস্থা লাভ করেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্থানে। ধরা যাক, স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে মতের মিল হচ্ছে না। তারা উভয়ে মুখোমুখি না বসলেও ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারেন। তা না হয়ে দুজন দুজনের মতো করে জানিয়ে দিচ্ছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। সাবজেকটিভ বর্ণনা অধিকাংশ সময়ই নিরপরাধ হয়। সুতরাং মানুষ একপক্ষীয় বর্ণনা শুনে কাল্পনিক সব সিদ্ধান্ত জানায়। নানা ধরনের মিম ও ট্রল তো রয়েছেই। যেহেতু স্বামী-স্ত্রীই বিষয়টি পাবলিক স্পেসে এনেছেন, না তারা একে পুরোপুরি উইথড্র করতে পারেন। না পরে আর নিজেরা মীমাংসা করার রাস্তা অবশিষ্ট থাকে। ফলে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে পরিবার ভাঙনের ইতিহাস। যুক্তি দেয়া যেতে পারে, ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রসারে পরিবার ভাঙতেই পারে। কিন্তু এ ভাঙন মানুষের অসুখী জীবনের সূচককেই প্রকাশ করে নাকি? নতুন প্রজন্মের জন্য পরিস্থিতি আরো হতাশাজনক। তারা গোপনীয়তার কদর বোঝার আগেই চলে আসে জনসম্মুখে। সাময়িক ‘বাহ বাহ’ কিংবা খ্যাতির জন্য দেয়াল ভেঙে ফেলছে দুই জীবনের মধ্যে। তার জন্য খেসারত গুনতে হচ্ছে পরবর্তী জীবনে। যারা এখনো মুখোমুখি হয়নি, তারাও বিপৎসীমার খুব কাছাকাছি। মানুষের ভুল করাটা যেমন সত্য, প্রযুক্তির ভুলে না যাওয়াটা ততটাই সত্য। ফলে অবচেতনে করা একটা ভুলও প্রযুক্তির প্রশ্রয়ে জীবন বিষাক্ত করা আঘাতে পরিণত হতে পারে।
ক্যাথলিক খ্রিস্টধর্মে পাপ স্বীকার করে ‘কনফেশন’ দেয়ার রীতি বিদ্যমান। মধ্যযুগের ইউরোপে ধর্মীয় নেতারা এ প্রক্রিয়ায় পাপকর্তার অতীত গোপন বিষয়াদি জেনে যেতেন। ধর্মীয় নেতা মানেই তো আর ধর্মের আতরে ধুয়ে ওঠা মানুষ নয়। অনেকেই ব্যক্তির সে গোপনীয়তাকে ব্যবহার করে সুযোগ আদায় করে নিতেন। প্রোটেস্ট্যান্ট আন্দোলনের মূল সমালোচনাগুলোর মধ্যে এটাও ছিল একটা। ব্যক্তির গোপনীয়তা রক্ষায় নিরাপত্তা। আধুনিক সময়ে এমনতর ঘটনা কিন্তু নাই হয়ে যায়নি। হামেশাই ব্যক্তিগত স্ক্রিনশট, চ্যাট ও ভিডিওকল ভাইরাল করা বর্তমানে প্রকট আকার ধারণ করেছে। কোনো ধরনের বিচার-বিবেচনা ছাড়াই অন্যপক্ষকে শায়েস্তা করা হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া কিংবা ইন্টারনেটে ছেড়ে। এমন পরিস্থিতিতে অপদস্থ ব্যক্তি প্রায়ই প্রচণ্ড হতাশায় মৃত্যুর পথ বেছে নেন। কেউ সাহসের অভাবে বেঁচে থাকলেও তা মৃত্যুর চেয়ে কোনো অংশে কম হয় না। গোপনীয় বিষয়াবলিকে ব্যবহার করে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভিকটিমকেই পরিচিত করা হচ্ছে অপরাধী। প্রেমজনিত সম্পর্কের পর প্রেমিকা খুনের ঘটনায় প্রশ্ন তোলা হয় তরুণীর ব্যক্তিগত জীবনের নানা ইস্যুতে। ন্যায়বিচার পাওয়া থেকে তাকে বঞ্চিত করার চেষ্টা হিসেবেই এমন প্রচারণা চালায় অপরাধী পক্ষ। ভিকটিমের চরিত্র হননের হুজুগে তখন খুব কম জনেরই মাথায় আসে সত্য কথা। প্রতিটি মানুষেরই ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার আছে। আইন যতটুকু ধনীর দুলালের, ঠিক ততটুকু বারবণিতারও।
ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে হোক বা রাষ্ট্রীয় নজরদারির মাধ্যমে, ক্রমে ম্লান হয়ে যাচ্ছে পাবলিক ও প্রাইভেট জীবনের সীমারেখা। আর এ অবলুপ্তি মানবজাতির সামনে ছুড়ে দিচ্ছে নতুন চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা না করে প্রযুক্তির ব্যবহার অদূর ভবিষ্যতের জন্য দূরদর্শী সিদ্ধান্ত হবে তো?
আহমেদ দীন রুমি: সাংবাদিক










