গ্রিনহাউজ গ্যাস (জিএইচজি) নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য অর্জনে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এটা একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য, প্রাণবন্ত/ সজীব প্রকৃতি, শোভন কাজ, বৃহত্তর সমতা এবং আরো সুযোগ বৃদ্ধিসহ নতুন ধরনের প্রাচুর্য বিষয়ে উপলব্ধির প্রতিযোগিতাও। নতুন করে আবার এ বিশ্বের সমৃদ্ধি/প্রাণ-প্রাচুর্য বিনির্মাণ করতে আমাদের অবশ্যই যুগপত্ভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী বিষয়গুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং এর প্রভাব প্রশমন করে স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে লড়াই বেগবান করতে হবে। আর সেটি করার সময় এখনই। 

জাতিসংঘের রেইস টু জিরো ও রেইস টু রিজিলিয়েন্স ক্যাম্পেইনের নয় বৈশ্বিক দূতের তিনজন হিসেবে আমরা বিভিন্ন শহরের কর্তৃপক্ষ, অঞ্চলের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী এবং এখন থেকে ২০৩০ সাল নাগাদ বড় বড় প্রচেষ্টার সঙ্গে জনসাধারণকে সংগঠিত করার কাজ করছি। আমাদের লক্ষ্য জিএইচজি নিঃসরণ অর্ধেকে নামিয়ে আনা, প্রকৃতির পুনর্জাগরণ এবং বৈশ্বিকভাবে ঝুঁকিতে থাকা চার বিলিয়ন মানুষের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবেলা করে এগিয়ে যাওয়া নিশ্চিত করা। 

আমাদের সবারই ভিন্ন প্রেক্ষাপট রয়েছে। তবে আমরা মনে করি, কভিড-১৯ মহামারীর বিপর্যকর স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক অভিঘাত আমাদের বৃহত্তর দায়িত্বশীলতা এবং মানুষ ও ধরিত্রীর জন্য একটি অধিকতর সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ার একটি অপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি করেছে।  

একটি শূন্য কার্বন বা গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ মানে সসীম সম্পদের আর কোনো শোষণ ও অপচয় না করা। এটি আসলে নির্মল বাতাস ও পানি, প্রাণবৈচিত্র্য, শোভন চাকরি, স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য, সমতা এবং ন্যায়ের প্রাচুর্য নিয়ে জীবনযাপন।

আলোচ্য উদ্দেশ্য পূরণে ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তিতে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন প্রাক-শিল্প মাত্রার চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখা এবং সেটি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে চেষ্টা করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। বিজ্ঞান আমাদের পরিষ্কার করে যে এক ডিগ্রি উষ্ণায়ন বৃদ্ধির প্রতিটি ভগ্নাংশই বিশ্বজুড়ে আরো অনেক মানুষের মৃত্যু ঘটাবে এবং অর্থনৈতিক ক্ষতিসাধন করবে। কাজেই প্যারিস চুক্তির লক্ষ্য অর্জনে কাজ করার জন্য ব্যক্তি খাত, স্থানীয় সরকার, কমিউনিটি এবং ব্যক্তিদের উৎসাহিত করতে হবে।

এসব প্রচেষ্টা বড় বড় স্বাস্থ্য সমস্যা এবং জীবাশ্ম জ্বালানি-সৃষ্ট বায়ুদূষণ, চরম দাবদাহ ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যের কারণে অকালমৃত্যুর মতো সমস্যার সমাধান করবে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মিলিয়ন মিলিয়ন লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। উদাহরণস্বরূপ উৎপাদন, বিপণন, বিক্রয়সহ পুরো খাদ্য ব্যবস্থা নতুন করে পুনর্বিন্যাস ও পুনঃচিন্তনের মাধ্যমে আমরা এ খাতে অনেকটা জিএইচজি নিঃসরণ কমাতে পারি, যা বর্তমানে মোট বৈশ্বিক গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের এক-তৃতীয়াংশের জন্য দায়ী। আবার এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও কার্বন শোষণের (কার্বন সিংক) একটা উৎস সৃষ্টি করতে পারি। 

একটি অ্যাপ্রোচ ইউএন ফুড সিস্টেমস সামিট সামনে নিয়ে আসছে, সেটি হলো ফুড অ্যান্ড ল্যান্ড নিট জিরো কান্ট্রি অ্যালায়েন্স। এটি দেশগুলোর একটা স্বেচ্ছাধীন জোট, যা ২০৫০ সাল নাগাদ খাদ্য ও ভূমি ব্যবহার থেকে শূন্য জিএইচজি নিঃসরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ জোট তাদের লক্ষ্য এমনভাবে অর্জন করতে চায়, যা ক্ষুদ্র কৃষকদের উৎপাদনশীলতা বাড়ায় এবং একইসঙ্গে অধিক পুষ্টিগুণসম্পন্ন ও টেকসই পণ্য উৎপাদনে তাদের সক্ষম করে তোলে।  

গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ কমানোর কাজ বেশ ভালোভাবেই এগোচ্ছে। যদিও এ কার্যক্রম আরো বেগবান করা প্রয়োজন, সমাধানগুলো মোটামুটি জানা। তুলনামূলক কম বোধগম্য বিষয় হলো জলবায়ু অভিযোজন সক্ষমতা বাড়ানো, স্থায়িত্বশীলতা জোরদার এবং জলবায়ু পরিবর্তনে প্রভাব কমানোর জন্য জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহণে প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নের আহ্বান। কিন্তু দুটি লক্ষ্য—জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন ও এর প্রভাব মোকাবেলার  প্রস্তুতি—আন্তঃনির্ভরশীল।  

সর্বোপরি, সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুতের প্রকল্পগুলো বৈদ্যুতিক পরিবহন নেটওয়ার্ক এবং অন্য ক্লিন অবকাঠামো গড়ে তোলার বিষয়ে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া শূন্য কার্বন নিঃসরণ অর্থনীতিতে উত্তরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে আমাদের চরম দাবদাহ ও শীত, বন্যা, খরা এবং বনে আগুন ধরার মতো বিষয়গুলো রোধ করতেও অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। বিশেষ করে আমাদের এ ধরনের অবকাঠামোর উন্নয়ন ঘটাতে হবে জলবায়ু নাজুক দেশগুলোয়, যাতে টেকসই খাদ্য ব্যবস্থার মতো অধিক স্থিতিশীল ও লাভজনক জীবিকা নিশ্চিত করা যায়। 

স্থিতিশীলতার কাজটি স্থানীয় জনগোষ্ঠী উদ্ভাবিত সমাধানের নিরিখেই শুরু করতে হবে। আর সেটি করতে হবে চরম আবহাওয়ার পূর্বসতর্কতা ব্যবস্থা থেকে শুরু করে বন, প্যারাবন, সামুদ্রিক প্রতিবেশ ব্যবস্থাসহ প্রাকৃতিক পুঁজির পুনরুদ্ধার—সব ক্ষেত্রেই।

টেকসই প্রাচুর্য গড়ে তোলার এ প্রতিযোগিতায় অর্থায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস যেমনটা বলেছেন, অর্থায়ন প্রশমন ও অভিযোজন উভয় ক্ষেত্রে সমানভাবে হওয়া প্রয়োজন। সেটি করতে হলে ক্লিন পাওয়ার তৈরিতে অর্থায়নের মতো সুযোগগুলো উন্মোচন করতে হবে। গ্লোবাল কমিশন অন অ্যাডাপ্টেশনের মতে, এ দশকে পূর্বসতর্ক ব্যবস্থা, প্যারাবন সংরক্ষণ এবং পানি ব্যবস্থাপনার মতো প্রকল্পগুলোয় ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ ৭ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ সুফল সৃষ্টি করবে।

কভিড-১৯ মহামারী আমাদের অপ্রস্তুত থাকার বিপদ এবং অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নাজুকতাগুলো চোখের সামনে উন্মোচন করেছে। চলমান মহামারী দেখিয়েছে মানুষের, অর্থনীতির এবং ধরিত্রীর স্বাস্থ্য কতটা অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত এবং আমাদের অবশ্যই তিনটিকে একযোগে পুনরুদ্ধার করতে হবে। চলতি বছর এ এজেন্ডা এগিয়ে নিতে সুযোগও তৈরি হয়েছে।

আগামী সেপ্টেম্বরে প্রথমবারের মতো ইউএন ফুড সিস্টেমস সামিট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যা সরকার ও ব্যক্তি খাতকে বিশ্বের কিছু বড় চ্যালেঞ্জ, যেমন দারিদ্র্য, লিঙ্গ অসমতা, ক্ষুধা ও জলবায়ু পরিবর্তনের একটা টেকসই সমাধানে উপনীত হতে সহায়তা করবে।

ওই আয়োজন অক্টোবরে চীনের কুনমিংয়ে অনুষ্ঠেয় ইউএন বায়োডাইভারসিটি কনফারেন্সের (কপ১৫) পাটাতন তৈরি করবে, যেখানে সরকারগুলো চলতি দশকে প্রাণবৈচিত্র্যের ক্ষতি কমিয়ে আনতে একটি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করবে। নভেম্বরে গ্লাসগোয় অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের কপ২৮ জলবায়ু সম্মেলনে তারা খাদ্য ব্যবস্থার রূপান্তর ও প্রকৃতির পুনরুজ্জীবনে নতুন অঙ্গীকার ঘোষণা করতে পারে। একই সঙ্গে আলোচ্য উদ্দেশ্যে প্যারিস চুক্তির লক্ষ্যের সঙ্গে সংগতি রেখে শক্তিশালী জলবায়ু কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে। 

এ তিনটি শীর্ষ সম্মেলন জাতীয় সরকারগুলোকে অধিকতর স্বাস্থ্যসম্মত, আরো স্থায়িত্বশীল ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, নগর ও অঞ্চল কর্তৃপক্ষ এবং সর্বোপরি নাগরিকদের আহ্বান শোনার সুযোগ করে দেবে। আমরা সবাই টেকসই প্রাচুর্য গড়ার প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হতে পারি, যদি সবাই একযোগে কাজ করি। শুরুটা হয়ে গেছে। এখন দরকার প্রচেষ্টাগুলো চালিয়ে যাওয়া।

[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]

 

মাইকেল আর. ব্লুমবার্গ: নিউইয়র্ক সিটির সাবেক মেয়র; জাতিসংঘ মহাসচিবের জলবায়ু আকাঙ্ক্ষা ও সমাধানবিষয়ক বিশেষ দূত

সালিমুল হক: ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের পরিচালক

আগনেস কালিবাটা: জাতিসংঘ মহাসচিবের দ্য সেপ্টেম্বর ২০২১ ফুড সিস্টেমস সামিট-বিষয়ক বিশেষ দূত

ভাষান্তর : হুমায়ুন কবির