কে বলেছে সরকার মানুষের কথা, অর্থনীতিবিদদের কথা শোনে না? ব্যবসায়ীরাও বলেন সরকার তাদের কথা শোনে না। এখন কি আর এ কথা বলা যাবে? সরকারি সর্বশেষ সিদ্ধান্তের কথা আমলে নিয়ে বলা যায়—এখন আর এ কথা বলা যাবে না। অর্থনীতিবিদরা বলছিলেন এ অসময়ে বাজেট অনেক বড় হয়েছে। এত বড় বাজেট বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে যায় না। এত বিপুল পরিমাণ রাজস্ব সরকার আদায় করতে পারবে না। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে অর্থনীতি সংকটমুক্ত হয়নি, বিশ্ব পরিস্থিতিও অনুকূল নয়। তখন সরকার এসব কথা শোনেনি। বিশাল কলেবরের বিশাল খরচের বাজেট সরকার জাতীয় সংসদে পাস করে যথাসময়ে। অর্থমন্ত্রী তার কথা থেকে একচুলও নড়েননি। তার মতে, সব ছিল ঠিক, ঠিক এখনো আছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২০২২-২৩ অর্থবছরের তুলনায় বেশি হবে, মূল্যস্ফীতি কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে সুদিন ফিরে আসবে ইত্যাদি ইত্যাদি। এই তো সেদিন এসব কথা বলা হয়েছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট পাস হয়েছে জুনের শেষে। এখন চলতি অর্থবছরের মাত্র দ্বিতীয় সপ্তাহ। কাজ শুরু হতে না হতেই অর্থ মন্ত্রণালয় বাজেট বরাদ্দ কাটছাঁট করেছে। অনেক খরচে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। আবাসিক ভবন, অনাবাসিক ও অন্যান্য ভবনের খাতে বরাদ্দকৃত টাকা খরচ করা যাবে না। মোটরযান, জলযান ও আকাশযান খাতেও অর্থ ব্যয় বন্ধ থাকবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ২০-২৫ শতাংশ টাকা সাশ্রয় করতে হবে। সরকারি দপ্তরে সব ধরনের যানবাহন কেনাকাটা বন্ধ থাকবে। বিদেশ ভ্রমণ হবে সীমিত।
এসব কৃচ্ছ্রসাধনের কথা, নিষেধাজ্ঞার কথা অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রের মাধ্যমে দেশবাসীকে জানানো হয়েছে। একটি কাগজে দেখলাম, এসব কৃচ্ছ্রসাধন ও ব্যয় স্থগিতের কারণে সরকারের ৫৩ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। স্বভাবতই এত খরচ কমলে সরকারের ঋণের পরিমাণ কিছুটা কমবে। সুদ ব্যয় কমবে। বাজেট ঘাটতি কিছুটা হ্রাস পাবে। এসব সিদ্ধান্ত হঠাৎ কেন? দুদিন আগে বাজেট পাস, আর দুদিন পরই বাজেট কাট। সাধারণত বাজেট কাটছাঁট হয় বছরের শেষের দিকে। কিন্তু এবার একদম শুরুতেই। তার মানে কী? মানে হচ্ছে, অর্থনীতিবিদদের কথা পরোক্ষভাবে মেনে নেয়া। ব্যবসায়ীদের কথা মেনে নেয়া। সরকার সাধারণত এসব করে না। কিন্তু এবার স্ফীত বাজেটের কথা সরকার প্রথমেই স্বীকার করে নিল। কেন? কারণ খুবই সোজা। সরকারের রাজস্ব আদায় কম। ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট মোতাবেক রাজস্ব আদায় হয়নি অথচ সরকারের পরিচালন ব্যয় ঠিকই আছে। রাজস্ব আদায় বাড়ানোর বহু চেষ্টা সরকার করছে। কিন্তু কোনো কিছুতেই রাজস্ব বাড়ছে না। জিডিপির তুলনায় রাজস্ব খুবই কম। এ অবস্থায় উপায় একটাই—ব্যয় কমানো।
মূল্যস্ফীতি রোধে সরকারি ব্যয়ে সংকোচন নীতির যুক্তি গ্রহণযোগ্য। তা আমি সমর্থন করি। এর সঙ্গে সঙ্গে অবশ্য ঋণনীতিতেও পরিবর্তন আনা দরকার। ঋণের বিষয়ে আলোচনার আগে রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের বিষয়ে কিছু কথা বলা দরকার। রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের এ সমস্যা আজকের নয়। এ পর্যন্ত যত বাজেট হয়েছে সব বাজেটই ঘাটতি বাজেট। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। অতএব ঘাটতি মেটানো হচ্ছে দেশী-বিদেশী ঋণ দিয়ে। দিন দিন সরকারের ঋণ বাড়ছে। শুধু তা-ই নয়, বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণও সমানে বেড়ে যাচ্ছে। সরকারি নীতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উন্নয়ন বাজেট (এডিপি)। উন্নয়ন বাজেট মূল্যস্ফীতি হিসেবে নিয়ে বিবেচনা করলে বড় বেশি বাড়ছে না। আবার পুরো উন্নয়নের কাজটিই হচ্ছে ঋণের টাকা দিয়ে। এই যে পরিস্থিতি দিনের পর দিন চলে আসছে, এর থেকে মুক্তির পথ কী? পথ একটা হচ্ছে খরচ কমানো। আরেকটা হচ্ছে আয় বাড়ানো। খরচ কমানো বললে পুরো জিনিসটা বলা হলো না। খরচ কমানোর চেয়ে বড় হচ্ছে অপচয়, চুরি, দুর্নীতি কমানো। অন্য ভাষায় বলতে হয় সরকারি খরচের গুণগত মান বৃদ্ধি করা। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এ পর্যন্ত একজন অর্থমন্ত্রী আমরা পেলাম না যিনি তার বাজেট বক্তৃতায় খরচের গুণগত মান নিয়ে কথা বলেছেন। তারা এদিকে না গিয়ে গেছেন বড় বড় বাজেটের দিকে, বড় বড় প্রকল্পের দিকে, ব্যয়বহুল প্রকল্পের দিকে।
আমাদের বলা হয়েছে দেশের বৃহত্তম বাজেট ঘোষিত হচ্ছে। কিন্তু এ বৃহত্তম বাজেট যে খরচের বৃহত্তম বাজেট তা কিন্তু আলোচনায় আসছে না। বৃহত্তম বাজেটের দিকে নজর দিতে গিয়ে খরচের গুণগত মান সম্পর্কে সরকারের পর সরকার অঙ্গীকার দিয়ে যাচ্ছে। এমনকি আজকের অসময়েও, বৈশ্বিক ও দেশীয় সংকটের মধ্যেও। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য। আমরা ১ টাকার কাজ ২ টাকা, ৩ টাকায় করছি। এটা আমার কথা নয়। প্রতিদিন খবরের কাগজে এসব ছাপা হচ্ছে। এর মধ্যে অগ্রণী ভূমিকায় আছে দৈনিক বণিক বার্তা। প্রায় নিয়মিতভাবে বণিক বার্তা কাগজটি বিভিন্ন প্রকল্পের, রাস্তা বানানোর, মেট্রোরেল তৈরিতে কীভাবে আমরা টাকা অপচয় করছি, কীভাবে ১ টাকার কাজ ৩ টাকায় করছি তার উদাহরণ তুলে ধরছে। যদি অর্থ মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় একটু ‘সিরিয়াস’ হতো তাহলে এসবের নিরিখে সরকার বাস্তব পদক্ষেপ নিত। দেখা যাচ্ছে, সরকারি দপ্তরও এসব ব্যাপারে ওয়াকিবহাল। পরিকল্পনামন্ত্রী প্রকল্প তৈরি থেকে বাস্তবায়ন কর্মকাণ্ডে কীভাবে গুচ্ছ প্রকৃতির দুর্নীতি হয় তার কথা অনেকবার বলেছেন। তার কথা নয় শুধু, কাগজেও এসব ছাপা হচ্ছে। আমার সামনে ৬ জুলাইয়ের একটি কাগজ। এর শিরোনাম হচ্ছে ‘ছিটকিনি লাগে না, দেয়ালে শ্যাওলা। কোথায় এসব?’ খবরে দেখা যাচ্ছে, সরকারি টাকায় ২০১৮ সালের দিকে ২১০ কোটি টাকা খরচ করে ২০ তলা চারটি ভবন করা হয়েছে। ভবনগুলোর মেয়াদ ৭৫ বছর। অথচ চার-পাঁচ বছরের মধ্যে এ ঘটনা। নিম্নমানের কাজের জন্য এটা ঘটছে।
এই তো গেল উন্নয়নের টাকা খরচের গুণগত মান সম্পর্কিত খবর। রাজস্ব বাজেটেরও একই অবস্থা। ‘বালিশ কাণ্ড’, ‘পর্দা কাণ্ড’-এর কথা আমরা জানি। হাসপাতালের খবর, সরকারের ওষুধাগারের ওষুধের অবস্থা, জেলখানার কয়েদিদের খাবার নিয়ে কী হয় তা সবারই জানা। সর্বত্রই এসব চলছে। কী উন্নয়ন বাজেটের টাকা খরচে, কী রাজস্ব বাজেটের টাকা খরচে—সর্বত্রই এসব চলছে। আমি ভদ্রভাবে এসবকে গুণগত মানের ঘাটতি বলছি। সাদামাটা ভাষায় এসব দুর্নীতি, চুরি, ডাকাতি। সরকার, কোনো সরকারই এসবে হাত দিতে চায় না। বলা হয়, এসবে হাত দিলে সরকারের হাত পুড়ে যাবে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে যাবে। চুরি, দুর্নীতি, ডাকাতি নাকি কাজে গতি আনে। এসব বন্ধ হলে কাজে মোটিভেশন পাবে না সংশ্লিষ্টরা। কী দারুণ যুক্তি! একই যুক্তির কথা ওইদিন বাণিজ্যমন্ত্রীর মুখ থেকে শুনলাম। তাও সম্ভবত সংসদে। কিছুসংখ্যক সংসদ সদস্য তাকে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে আহ্বান জানান। উত্তরে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, এটা সম্ভব। কিন্তু প্রচুর ঝুঁকি এতে। সিন্ডিকেটকে ধরতে গেলে তারা বাজার তছনছ করে দেবে। সরবরাহ সংকট দেখা দেবে। তাহলে কী দাঁড়াল? সরকারি খরচের গুণগত মান বৃদ্ধি করতে গেলে কাজ করার ‘স্পৃহা’ হারাবেন সংশ্লিষ্টরা, কাজ বন্ধ হয়ে যাবে। আবার বেসরকারি খাতের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে সরবরাহ সংকট দেখা দেবে। তাহলে উপায় গুণের দিকে না তাকিয়ে খরচ শুধুই বাড়ানো। দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়া আর কি! অথচ এখন থেকে আমাদের গুণগত দিকে নজর দেয়া দরকার। বিশেষ করে এ অস্বাভাবিক সময়ে যখন টাকার মূল্য অনেক বেশি, যখন টাকার টানাটানি। এখন বড় বাজেটের সময় নয়। এখন কাজ চালিয়ে যাওয়ার সময়। এ অসময়ে সরকারি কর্মচারীদের ৫ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি সংগত হয়নি। কেন হয়নি এর কথা পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন—এ বেতন বৃদ্ধিতে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির ফলে বেসরকারি খাতেও বেতন বৃদ্ধির চাপ সৃষ্টি হবে। এসবই মূল্যস্ফীতির নিরিখে ভালো উদাহরণ নয়। এ কথা পরিকল্পনামন্ত্রী ভালো করে বুঝেছেন। তিনি বলেছেন, এ প্রেক্ষাপটে বর্তমান মূল্যস্ফীতির হার হ্রাস করা প্রায় অসম্ভব। অত্যন্ত খোলামেলাভাবে তিনি তা কয়েক দিন আগে বলেছেন।
মোদ্দা কথা, এখন খরচ বৃদ্ধি নয়, এখন কৃচ্ছ্রসাধনের সময়, যে কথা প্রধানমন্ত্রী বারবার বলছেন। খরচ কমানোর পাশাপাশি দরকার ব্যাংকঋণকে আরো ‘কস্টলি’ করা। দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ পরিস্থিতি স্থবির। আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ আছে। ডলারের সংকট আছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। মূল্যস্ফীতি চরম আকার ধারণ করেছে। প্রতিবেশী দেশগুলোয় মূল্যস্ফীতির হার কমলেও আমাদের দেশে সিন্ডিকেটের জন্য মূল্যস্ফীতি কমছে না। এ অবস্থায় সস্তায় ঋণ দেয়া ঠিক নয়। সস্তার তিন অবস্থা। সস্তা ঋণ পেয়ে বড় বড় ব্যবসায়ী শেয়ারবাজারে যাচ্ছেন না। তারা ব্যাংকের ওপর অতিনির্ভরশীল। বেশি বেশি ঋণ দিয়ে তারা ‘ওভার ক্যাপাসিটি’ তৈরি করেছেন। কি সিমেন্ট, কি কাপড়, কি চিনি, কি ইস্পাত প্রায় সব ক্ষেত্রেই ‘ওভার ক্যাপাসিটি’ একটা সমস্যা তৈরি করছে। ফলে বড় বড় ঋণগ্রহীতার ঋণের পরিমাণ বাড়ছেই। অনেকে ওই সব ব্যাংকঋণের টাকা বিদেশে পাচার করছে বলেও অভিযোগ আছে। এছাড়া লোকের বিশ্বাস, বড় বড় ঋণগ্রহীতার হাতে নানাভাবে টাকা আছে। তারা তাদের প্রয়োজন নিজস্ব সূত্রেই মেটাতে পারে। এ অবস্থায় দরকার ছোটদের ঋণ বাড়ানো। ছোটদের ঋণ দিলে কর্মসংস্থান বেশি সৃষ্টি হবে। এদিকে সরকারের নজর দেয়া দরকার। এসব দাবিও অর্থনীতিবিদদের। কৃচ্ছ্রসাধনের সিদ্ধান্তের মতো সরকার এক্ষেত্রে পদক্ষেপ নিলে সবাই উপকৃত হবে।
ড. আর এম দেবনাথ: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক










