মহামারীর এ সময়ে অনলাইনে কেনাকাটায় মানুষের নির্ভরতা যত বাড়ছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে গ্রাহকের অভিযোগও। পণ্যের মান নিয়ে আপত্তি, ডেলিভারি পেতে বিলম্ব, কার্ড পেমেন্টে টাকা ফেরত পেতে সময় বেশি লাগাসহ বিভিন্ন অভিযোগ প্রতিনিয়ত পাওয়া যাচ্ছে। অনলাইন কেনাকাটা প্রতারণা নাকি আস্থার জায়গা—এমন প্রশ্ন সামনে আসছে বারবার। এসবের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার   ই-কমার্স নিয়ন্ত্রণে নতুন করে সিদ্ধান্ত দিয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নীতিমালা প্রণয়ন করেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকও পেমেন্ট বিধিমালা তৈরি করেছে। এতে গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষিত হবে বলে ধারণা করা হলেও বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে এখনো প্রতারণার ঘটনা ঘটছে। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে গ্রাহকদের নানা অভিযোগ ও সাম্প্রতিক পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে। এতে ৮ হাজার কোটি টাকার সম্ভাবনাময় খাতটির নানা দুর্বলতা উঠে এসেছে, যা গ্রাহক আস্থায় চিড় ধরাচ্ছে। ই-কমার্সের মাধ্যমে শুধু ভোক্তা নয়, ক্ষুদ্র বিক্রেতারাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বাকিতে পণ্য দিয়ে অর্থ পাচ্ছেন না বলেও অভিযোগ আসছে। এমন অবস্থায় আমরা চাইব সরকার ভোক্তা ও বিক্রেতা উভয়ের স্বার্থ রক্ষা এবং এ খাতের প্রতি মানুষের আস্থা ধরে রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

ই-কমার্সের লেনদেন যেখানে বাড়ছে, সেখানে সংগতকারণেই ক্রেতা-বিক্রেতাও বাড়ছে। তাই তিন বছর থেকে বাংলাদেশে  ই-কমার্সের বেশ ঊর্ধ্বগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। বেশকিছু দেশী প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, বিদেশী দু-একটি প্রতিষ্ঠানও এরই মধ্যে এখানে বিনিয়োগ করেছে, বিশ্বের নামকরা আরো কয়েকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ বা সরাসরি ব্যবসা শুরু করার অপেক্ষায় রয়েছে। তাছাড়া বর্তমান মহামারীকালীন মানুষ       ই-কমার্সের সহায়তায় ঘরে বসে অনেক দ্রব্য কিনছে। সব মিলিয়ে ব্যবসার অন্য দিকগুলো যখন অসুবিধার সম্মুখীন, তখন ই-কমার্সের অনেকটা তেজি ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, ই-কমার্স ঘিরে গ্রাহকের অভিযোগ বাড়ছে। যদিও অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের বোঝাপড়ার মাধ্যমে অনেক অভিযোগ নিষ্পত্তি হচ্ছে। আবার অনিষ্পন্ন থেকে যাচ্ছে অনেক অভিযোগ। এতে ভোক্তা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এক ধরনের পণ্য দেখিয়ে অন্য ধরনের পণ্য সরবরাহ করা; নকল পণ্য দেয়া বা মান ভালো না হওয়া; সঠিক সময়ে সরবরাহ না করা কিংবা প্রলোভন দেখিয়ে হয়রানি—এমন নানা অভিযোগ থেকে ভোক্তার মুক্তি মিলছে না। ই-কমার্সে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো গ্রাহকের আস্থা। তা রক্ষা করা না গেলে তাতে       দু-একটি প্রতিষ্ঠান নয়, গোটা শিল্পের ওপরই মানুষ আস্থা হারাবে। সেজন্য যেসব অভিযোগ আসছে, প্রশাসনিকভাবেই সেগুলো দ্রুত খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। কেবল ভোক্তার স্বার্থেই নয়, বরং ই-কমার্স খাতের শৃঙ্খলা আনতে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।  সরকার ও রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর সিদ্ধান্ত সার্বিকভাবে      ই-কমার্সের জন্য ইতিবাচক। ই-কমার্সের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে, বিশেষ করে যেসব চ্যানেল ই-কমার্স ব্যবসা পরিচালনা করছে, তাদের এ ইতিবাচক সিদ্ধান্তের মর্যাদা রাখতে হবে। 

ই-কমার্স খাতকে কঠোর নিয়ন্ত্রণের পক্ষপাতী নন অনেকেই। তাদের মতে, ভুলভাবে বা কড়াকড়িভাবে খাতটি নিয়ন্ত্রণ করা হলে তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। গত কয়েক বছরে ই-কমার্স খাতটি যেভাবে বড় হচ্ছে, যে হারে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে, রেগুলেশন করা হলে এসব বিষয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলেও অনেকের ধারণা। এখন যদি সরকার রেগুলেশন করে ই-কমার্স খাতের ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স গ্রহণ বাধ্যতামূলক করে দেয়, তাহলে এখন যে হারে খাতটিতে উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে, তাতে ভাটা পড়বে। তবে এ কথার আন্তর্জাতিক ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড—যেসব দেশে ই-কমার্স বিকাশ লাভ করেছে, সেখানেই শক্তিশালী আইনি কাঠামো রয়েছে। বাংলাদেশের মতো স্বল্প শিক্ষিত মানুষের দেশে শুধু ভোক্তা সচেতন করে ই-কমার্সের প্রতারণা রোধ করা যাবে না। এজন্য চাই শক্তিশালী আইনি কাঠামো ও তার সুষ্ঠু প্রয়োগ। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও ভোক্তাদের নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালে ভারতের ডিপার্টমেন্ট অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল পলিসি অ্যান্ড প্রমোশন (ডিআইপিপি) ই-কমার্স নীতিমালায় পরিবর্তন আনে। এতে ভারতের সংশ্লিষ্ট খাত আরো বেশি গ্রাহকবান্ধব হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের নীতিমালাটিও ভালো বলে জানা যাচ্ছে। এখন এর সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

ভোগান্তি এড়াতে অনলাইন বাজার ব্যবস্থা অর্থাৎ ই-কমার্স সহায়ক উপযুক্ত পরিচালন নীতিমালা দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। এজন্য চাই সুনির্দিষ্ট রূপরেখা। আর্থিক লেনদেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ইন্টারনেটের গতি বাড়ানো। আস্থাশীল ই-কমার্স পরিবেশ সৃষ্টি করাও দরকার। সব ধরনের ডিজিটাল ওয়ালেট, গিফট কার্ড, ক্যাশ ভাউচার বা অন্য কোনো মাধ্যম, যা অর্থের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার হতে পারে, তা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান নীতিমালা অনুসরণ এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ব্যতিরেকে তৈরি বা প্রণয়ন, ব্যবহার বা কেনা-বেচা করা যাবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ব্যতিরেকে ডিজিটাল মাধ্যমে কোনো ধরনের অর্থ ব্যবসাও পরিচালনা করা যাবে না। ক্রেতাকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো পণ্য বা সেবা ক্রয়ের জন্য বাধ্য করা যাবে না—এমন বিধানের বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

লেনদেনের বিষয়ই নয়, বরং ই-কমার্স খাতের পেশাদারিত্ব রক্ষা এবং গ্রাহকের আস্থা ফেরাতে হলে এ খাতের অন্যান্য দিকও দেখতে হবে। ভোক্তা যাতে সময়মতো, যথাযথ ও গুণগত মানের পণ্যটি পান, সেটি নিশ্চিতেও প্রশাসনিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বড় বিষয় হলো, দু-একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য     ই-কমার্স খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তা কারো কাম্য নয়। ভোক্তা যাতে প্রতারিত না হন, বাজারে যাতে প্রতিযোগিতা থাকে বা সব প্রতিষ্ঠানের জন্য সমান সুযোগ থাকে, সেজন্য এ খাতে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর বা পরিচালন নীতিমালা দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। একই সঙ্গে অনলাইনে কেনাকাটার ক্ষেত্রে ভোক্তারও সতর্কতা জরুরি। ভোক্তার সচেতনতার পাশাপাশি প্রশাসনের নজরদারিও প্রয়োজন। এক্ষেত্রে আইন করার পাশাপাশি সরকারেরও ই-কমার্স-সংক্রান্ত বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান থাকা দরকার, যারা এখানকার সার্বিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে ই-কমার্স সংগঠনকেও সক্রিয় হতে হবে খাতটিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায়।

করোনা মহামারীর মধ্যে ই-কমার্স মানুষের কতটা উপকার করছে তা বলা বাহুল্য। বিকশিত খাতটি যাতে গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং গ্রাহকের আস্থা না হারায়, সেদিকে এখনই দৃষ্টি দেয়া চাই। ই-কমার্স খাতে পেশাদারিত্ব ও শৃঙ্খলা এলে তা ব্যবসার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। এর মাধ্যমে শুধু নতুন কর্মসংস্থানই হবে না, একই সঙ্গে        ক্রেতা-বিক্রেতাসহ অর্থনীতিও লাভবান হবে।