‘বেদের মেয়ে জোছনা’খ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চন ১৯৯৩ সালের ২২ অক্টোবর সড়ক দুর্ঘটনায় তার স্ত্রীকে হারান। ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট সড়ক দুর্ঘটনার কবলে আমরা হারাই খ্যাতিমান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও সাংবাদিক, খ্যাতিমান চলচ্চিত্র ভিডিও-গ্রাহক মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মিশুক মুনীরকে। চার বছর আগে ২০১৮ সালে ঢাকার বিমানবন্দর সড়কে দ্রুতগতির দুই বাসের প্রতিযোগিতায় রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী আবদুল করিম রাজীব (১৭) ও দিয়া খানম মিম (১৬) নিহত হয়। তারপর ২৯ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাজপথে আন্দোলন করেছিলেন শিক্ষার্থীরা। বহু আশ্বাস দেয়ার পরও বর্তমানে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেকোনো সময়ে মানুষের জীবনের ইতি দেয়ার জন্য ভয়াবহ মৃত্যুকূপ হয়ে আছে সড়ক-মহাসড়কগুলো। প্রতি বছরের হাজারো মৃত্যুর মাঝে এখন সড়ক দুর্ঘটনার কথা কেবল সংখ্যা আর প্রতিবেদন পর্যন্ত রয়ে গেছে। এভাবে বছর বছর মৃত্যুসংখ্যা দুর্ঘটনার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েই চলছে।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ২০১৮ সালের করা জরিপে বাংলাদেশের সড়ক এশিয়ার মধ্যে দ্বিতীয় সবচেয়ে খারাপ মানের বলা হয়েছিল। ডব্লিউএইচও ২০২০ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের বার্ষিক মোট মৃত্যুর ৩ দশমিক ৫০ শতাংশের জন্য সড়ক দুর্ঘটনাকে চিহ্নিত করা হয়। ওয়ার্ল্ড লাইফ এক্সপেক্টেন্সির দেয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের ১৮৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১০৬তম। এবার আসা যাক আমাদের দেশের তথ্যের দিকে, ‘নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)’ জানুয়ারিতে দেয়া পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২ সালে মোট ৫ হাজার ৭০টি সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ঘটেছে ৫ হাজার ৭৬০ জনের ও আহত হয়েছে ৭ হাজার ৩৩১ জন। সম্প্রতি প্রকাশিত বেসরকারি সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ৬ হাজার ৮২৯টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে মৃত্যু ৭ হাজার ৭৩১ ও আহতের সংখ্যা ৬ হাজার ৮২৯।

ডব্লিউএইচও ও ইউএনসহ দেশী-বিদেশী বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থা নিজ উদ্যোগে এ দেশের সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভিন্নতর সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ ভিন্ন হওয়ায় জনগণের মাঝে তথ্যবিভ্রান্তির সৃষ্টি হওয়াটা স্বাভাবিক। সড়ক দুর্ঘটনার প্রকৃত রূপ আমাদের কাছে এখনো ঘোলাটে। তবে একটা ব্যাপারে আমাদের দেশের সব মানুষ একমত হবে যে আমাদের সড়ক এখনো সত্যিকার অর্থে নিরাপদ হয়নি। সব অংকের হিসাব-নিকাশ বাদ দিয়ে আমাদের ভাবা উচিত, এভাবে আর কত দিন চলতে থাকবে সড়কে অপমৃত্যু।

বাংলাদেশে মোটা দাগে তিন ধরনের সড়ক ও মহাসড়ক আছে—আঞ্চলিক, জাতীয় ও জেলা সড়ক। দেশের সড়ক দুর্ঘটনার বড় কারণগুলোকে চিহ্নিত করলে দেখা যায় সেগুলো হলো ১. মানুষের দ্বারা/মানবীয় ভুল ২. সড়কের হাল ও অবস্থা ৩. যানবাহনের অবস্থা। আমাদের দেশের সড়ক দুর্ঘটনার বেশির ভাগ হচ্ছে শুধু ঝুঁকি নিয়ে অতিদ্রুততার সঙ্গে ওভারটেক প্রবণতা ও সড়কের অবস্থা দায়ী। আমাদের দেশের সড়ক বেশি দিন কেন স্থায়ী হয় না? এমন প্রশ্নের  জবাবে সড়ক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রায় সময় বলে থাকেন যে আমাদের দেশের আবহাওয়ার কারণে বেশি দিন সড়কের মান ধরে রাখা যায় না। কুয়ালালামপুর, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুরে কিন্তু একই আবহাওয়ায় তারা সড়ক নির্মাণ করেছে যা বহু বছর ধরে টিকে আছে। তাহলে সমস্যাটা কোথায়? এ প্রশ্ন করলে এক কথায় কমন উত্তর আসবে—আমাদের দেশের অনিয়ম ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থা। কিন্তু এ নিয়ে আর বলার বাকি আছে কি! বছর বছর সড়ক যোগাযোগ খাতে যথেষ্ট বরাদ্দ থাকলেও যেকোনো সড়কের প্রজেক্ট নির্মাণ পরিকল্পনা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নানা পর্যায়ে ঘুস ও অর্থ আত্মসাৎ, রেড টেপিজমসহ নানাভাবে অনিয়ম হচ্ছে বলে দাবি করা হয়ে আসছে পত্রপত্রিকায়। সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের ইট, খোয়া ও বিটুমিন ব্যবহার থেকে শুরু করে ঠিকভাবে মাটি ভরাট ও বালি না ফেলা, মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানোর জন্য সময়মতো কাজ শেষ না করা, প্রকল্পের দরপত্রের মাধ্যমে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়া এবং সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি রয়েছে আমাদের। মূল প্রকল্পিত বাজেটের কিয়দংশ দিয়ে শেষ করা প্রকল্পের সড়কের মান কেমন হবে তা বুঝতে বাকি থাকে না জনগণের। সড়ক-মহাসড়ক টেকসই করতে হলে আগে দুর্নীতি দমন করতে হবে। অবশ্যই দুর্নীতি থেকে মুক্তি পেলে সমস্যা সমাধানের অনেক বড় একটা ধাপ আমরা এগিয়ে যাব। আফসোস এই যে আজকের বাজারে আমরা একটা মোবাইল ফোনের এক বছরের ওয়ারেন্টি পেলেও দেশের নির্মিত সড়কের কোনো গ্যারান্টি নেই। পশ্চিমা দেশগুলো সড়ক তৈরিতে ব্যবহার করে কংক্রিট আর আমরা সড়ক বানিয়ে থাকি বিটুমিন দিয়ে, যা সর্বোচ্চ ১০ বছর টেকে। এর মধ্যে সময়ে অসময়ে খোঁড়াখুঁড়ি ও আমাদের নিজের অজ্ঞতা-হীনতার সঙ্গে অপব্যবহারের জন্য পাঁচ বছরে সড়কের বেহালদশা তৈরি হয়। এবার আসা যাক যানবাহনের অবস্থার দিকে। বাংলাদেশে যানবাহন কেনার ক্ষেত্রে একটি মূল্য সংবেদনশীল মানসিকতা আমাদের বাজারে রয়েছে। মালিকরা কম খরচের যানবাহন খোঁজেন এবং সেটা কিনে থাকেন, যার জন্য মানের দিক দিয়ে কিছুটা হলেও ছাড় দিতে হয়। এভাবেই অনেক সড়কের অনুপযোগী যানবাহন সড়কে এসেছে। বিনা অনুমতিতে যানবাহনকে নানাভাবে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করা হয়। আমাদের দেশের বেশির ভাগ যানবাহনের যথাযথ ফিটনেস নেই। অথচ অনায়াসে সড়কে চলছে যানবাহন, যার জন্য হচ্ছে মারাত্মক সব সড়ক দুর্ঘটনা। বেসরকারি মতে, গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় আর্থিক ক্ষতি হিসাব করা হয়েছে ১৮ হাজার কোটি টাকা, যা গত বছর সড়কে বরাদ্দকৃত বাজেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। তাহলে আমাদের দেশ প্রতি বছর কী পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে! আমরা যদি সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারি তবে তা সরাসরি আমাদের অর্থনীতির ওপর প্রভাব আনবে।

দুর্নীতি ও সড়কের সমস্যার কথা তো আমরা সবাই কম-বেশি জানি। তাই বিদ্যমান সমস্যার কথা বারবার না বলে সমাধানে আমরা কী করতে পারি তা আলোচনা করা যাক। আমাদের প্রথমেই সড়কনির্ভরতা কমাতে হবে। আমাদের অধিকাংশ ট্রান্সপোর্ট যাত্রী বা মাল পরিবহন বাহন যেটাই হোক না কেন সবকিছুতেই সড়কনির্ভরশীলতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। নৌ, রেলসহ অন্যান্য ট্রান্সপোর্ট ব্যবহারের দিকে আমাদের এগোতে হবে। মনে রাখা দরকার, আমাদের দেশ আগামীর সঙ্গে সবসময় প্রতিযোগিতা করে এগিয়ে যাচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আমরা সড়ক-মহাসড়ক যতই বাড়াতে চাই না কেন সেই প্রত্যাশা বাস্তবিক হবে না। তাই নিজেদের হিতার্থে আমাদের উচিত হবে সড়কের বিকল্প পথ ব্যবহারে মনোযোগী হওয়া। সড়কের সংখ্যা অনুপাতে আমাদের যানবাহনের মাঝে একটা ভারসাম্য আনতে হবে। দেশে বিশেষ করে মহানগর ঢাকায় সড়কের তুলনায় যানবাহনের একটা ভারসাম্য আনা আমাদের অত্যন্ত জরুরি। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিকে আরো কাজে লাগাতে হবে। কোনো রাস্তা বা সড়কের ৫০০ মিটারের মাঝে যদি বছরে ৫-১০টি দুর্ঘটনা হয়, তখন সে সড়ক বা রাস্তার অংশকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে একে ‘ব্ল্যাক স্পট’ বলা হয়। এই ‘ব্ল্যাক স্পট’-এর সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনার সম্পর্ক রয়েছে। প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এ ঝুঁকি কমানো সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের অঙ্গরাজ্য তামিলনাড়ুতে এটা করা হয়েছে। সেখানকার রাজ্য সরকার সড়ক দুর্ঘটনা ডাটাবেজ ও ফোকাস মেডিকেল ব্যবস্থা তৈরি করেছে যা দ্রুততার সঙ্গে দুর্ঘটনায় সাড়া দিতে সক্ষম, এটি তৈরি করে তামিলনাড়ুতে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা ১৫ হাজার থেকে ১০ হাজারে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। এজন্যই আমাদের উচিত হবে যে বিশেষায়িত প্রযুক্তিবিদদের সাহায্যে সমস্যা চিহ্নিত করে প্রযুক্তির সমাধান প্রয়োগ করা। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে বলার সঙ্গে সঙ্গে হয়ে যাবে না। প্রযুক্তির যথাযথ ধাপে ধাপে প্রয়োগ আমাদের অগ্রগতির দিকে এগিয়ে নেবে। সর্বোপরি আমাদের জনসাধারণকে নিজের কিছু দায়িত্ব বুঝে নিয়ে সিভিক সেন্স বা নাগরিক জ্ঞান তৈরি করতে হবে। আমাদের মধ্যে ট্রাফিক জ্ঞান নেই বলা চলে এবং সেটা না মানার এক ধরনের প্রবণতা আছে। অন্য কেউ ভুল করছে বলে নিজের ভুলকেও যৌক্তিকতা দেয়ার মনমানসিকতা থেকে বের হতে হবে। আমাদের জন্যই ট্রাফিক সিগন্যাল। আইন-নিয়ম মেনে সড়কে চলার অভ্যাস আমাদের তৈরি করতে হবে। আমরা সমাজবদ্ধ জীব হিসেবে শুধু লিখিত আইন দিয়ে পরিচালিত হই না। সমাজের অংশ হিসেবে আমাদের নাগরিক দায়িত্ব-কর্তব্য অস্বীকার করে আমরা সরকার ও কর্তৃপক্ষের ওপর দায় দিয়ে কোনোদিন প্রকৃত পরিবর্তন আনতে সক্ষম হব না। সঠিক সড়কে চলাচলের ক্ষেত্রে জ্ঞান ও তার প্রয়োগ না থাকলে আমাদের সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা কমবে না। ট্রাফিক আইন আমাদের জন্য। নিয়ম ভাঙার নয়, বরং নিয়ম মানার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

সবশেষে বলতে চাই, আমাদের গণমাধ্যমের দায়িত্ব অপরিসীম। সেজন্য দুর্ঘটনামুক্ত নিরাপদ সড়ক তৈরিতে জনসচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা বাড়াতে হবে। সড়ক ট্রাফিক আইন ও সড়ক নিরাপত্তার ব্যাপারে পাবলিক ডিসকোর্স তৈরি করতে হবে। নাগরিকদের ভীতি নয়, বরং দায়িত্বশীল ও নিরাপদ সড়ক বানাতে সবাইকে মিলে কাজ করতে হবে। সঠিক প্রচারণা ও জাগ্রত গণমাধ্যমের ভূমিকা থাকলে নীতিনির্ধারক পর্যায় থেকেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাবে। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনাজনিত যানবাহন এবং মানবসম্পদের ক্ষতির সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি যে অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে তার প্রকৃত পরিবর্তন আসুক—এই চাওয়া থাকবে। কেবল দিবস পালন, গোলটেবিল বৈঠক, আলোচনা, লেখালেখি, গবেষণা পরিসংখ্যান, টিভি টক-শো, সোশ্যাল মিডিয়ার আলোচনার মাঝে এ পরিবর্তন যেন সীমাবদ্ধ না থাকে।

 

মো. আবিদ মঈন খান: সাংবাদিক