দারিদ্র্য বিমোচন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশের বিপর্যয় প্রতিরোধ ও খাদ্যনিরাপত্তার বলয় সৃষ্টিতে উত্কৃষ্ট পদ্ধতি হচ্ছে সমবায়ী উদ্যোগ। তাই সমবায়ী চেতনায় দিতে হবে নতুন উদ্দীপনা, সব সহযোগিতা, আইন ও বিধিমালা সহজ করে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ। যেমনটি লক্ষ করা যায় জার্মানি, ডেনমার্ক, সুইডেন, নিউজিল্যান্ড অথবা অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত বিশ্বে। এসব দেশে সমবায় অঙ্গনে বৃহৎ পুঁজির অনুপ্রবেশের ফলে সমবায় সমিতিগুলো অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে এবং বিশ্ববাজারে বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। দেশে সমবায়ের যাত্রা স্বাধীনতার আগে থেকেই। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসেনি এতে। আইনি দুর্বলতা, তদারকির অভাব, আমলাতান্ত্রিক জটিলতাসহ বিভিন্ন কারণ নানা আলোচনায় উঠে এসেছে। প্রত্যাশা থাকবে সরকার বিষয়গুলো আমলে নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেবে।
বাংলাদেশের সমবায় সমিতিগুলো লক্ষ্য অর্জন না করার পেছনে একটি বড় কারণ হচ্ছে বাংলাদেশের বিদ্যমান সমবায় আইন। যথাযথ আইনি কাঠামো না থাকায় সরকারের দেয়া বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রকৃত সমবায়ীদের হাতে না গিয়ে বিভিন্ন গোষ্ঠীর কাছে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। সরকারি খাসজমি বা জলমহাল, যেগুলো কিনা বরাদ্দের ক্ষেত্রে সমবায়ীদের অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা, সেখানে অনেক সময় অভিযোগ পাওয়া যায় যে তারা সেটি পান না; সমাজের অনগ্রসর গোষ্ঠীর নামে বিভিন্ন ধনিক শ্রেণীর প্রতিনিধিরা এ সুবিধা ভোগ করেন। এ অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে হলে আইনের মাধ্যমে এটি নিশ্চিত করতে হবে যে সমাজের প্রান্তিক শ্রেণীর সদস্যদের জন্য গড়ে ওঠা সমবায় সমিতিতে ওই শ্রেণীর সদস্যরাই নেতৃত্বে থাকবেন। তাদেরকে যথাযথভাবে প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন না, এমন কেউ তাদের সমিতির নেতৃত্বে বসবেন না। এ কথা সত্য, শুধু সমবায় আইন সংশোধনের মাধ্যমেই সমবায়ীদের সব সমস্যা দূরীভূত হবে না, কিন্তু এটি অনস্বীকার্য যে বিদ্যমান আইনের মৌলিক সংস্কার ছাড়া সমবায় সমিতিগুলোর প্রকৃত সম্ভাবনা অর্জন সম্ভব নয়। একটি সমবায়বান্ধব আইনি কাঠামো সমবায়ীদের হস্তক্ষেপ কমাতে পারে, সমবায় সমিতির সদস্যদের তাদের সমিতির কার্যক্রমের প্রতি আরো উৎসাহী করে তুলতে পারে। সমবায় আন্দোলন আশানুরূপ অগ্রগতি লাভ করেনি এবং সমবায়ে সুশাসন দৃশ্যমানভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সমবায় সমিতির ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন, নিরীক্ষা, বিরোধ নিষ্পত্তি, অবসায়ন, উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ, অভ্যন্তরীণ অনিয়ম ও দলীয়করণ এবং অসমবায়ীদের অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ করে আদর্শভিত্তিক সমবায় প্রতিষ্ঠান গঠনে সমবায়ের কর্মকর্তারা দক্ষতা প্রদর্শন করতে পারেননি। জনগণ সমবায়কে একটি অর্থবহ খাত হিসেবে মনে করে না এবং এ খাতে বিনিয়োগের আকর্ষণ বোধ করে না।
সমবায় বিকাশে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা হয় সমবায় আইনকে। সমবায় আইনের নিবন্ধন সম্পর্কিত বিধানাবলি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সরকারি কর্মকর্তাদের হাতে এখানে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। যদি কোনো সমবায় সমিতি নিবন্ধনের জন্য সমবায় অধিদপ্তরে আবেদন করা হয় তাহলে আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে আবেদনকারী ৩০ দিনের মধ্যে এ ব্যাপারে আপিল করতে পারেন এবং আপিল কর্মকর্তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। এ বিষয়ে দেওয়ানি আদালতে আপিল করার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশের অংশীদারি ব্যবসা আইন, ১৯৩২ অনুযায়ী, যে অংশীদার তার অংশীদারি ফার্মের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক কোনো ব্যবসায় জড়িত থাকবে, তাকে ওই ব্যক্তিগত ব্যবসালব্ধ মুনাফা তার ফার্মের অংশীদারদের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে হবে। কিন্তু আমাদের সমবায় সমিতি আইনে এ ধরনের কোনো বিধান নেই। সমবায় সমিতি আইনের ৪ ধারা অনুযায়ী, সরকার গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা জনস্বার্থে কোনো সমবায় সমিতিকে কোনো বিধানের প্রয়োগ থেকে কোনো শর্ত সাপেক্ষে বা নিঃশর্তভাবে অব্যাহতি দিতে পারে। যদিও ধারাটি শুধু ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে ব্যবহার হওয়ার কথা, কিন্তু কার্যত এর যথেষ্ট অপব্যবহারের সুযোগ আছে। এ ধারার অপব্যবহার করে জনস্বার্থের নামে আইনের বিধানগুলো থেকে অব্যাহতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনেক সমবায় সমিতি চালানোর সুযোগ রয়েছে। এসব বিধান দ্রুত সংশোধন করা প্রয়োজন। এ কারণে অনেকে নিবন্ধন ছাড়াই কাজ করছে। আবার আইনের ত্রুটির কারণে অনেকে অর্থ আত্মসাতের মাধ্যম হিসেবেও সমবায়কে বেছে নিচ্ছে। এ প্রবণতা বন্ধ হওয়া জরুরি।
পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ন্যাশনাল কো-অপারেটিভ ডেইরি ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া লিমিটেড সমবায়ের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ২০২০-২১ সময়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায় লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৬৬১ কোটি রুপি। ১৯৮৪ সালে যাত্রা করে ২৭টি রাজ্য, ২২৩টি জেলা দুগ্ধ ইউনিয়ন, ১ লাখ ৯৬ হাজার গ্রাম দুগ্ধ সমিতি ১ কোটি ৭২ লাখ দুগ্ধ খামারি নিয়ে এ ডেইরি ফেডারেশন বর্তমানে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এ ফেডারেশন বর্তমানে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঘি, পনির, মাখন, দুগ্ধ, গুঁড়ো দুধ, টেট্রাপ্যাকে দুগ্ধ বাজারজাত করে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, ভারতের ৬১ বছরের পুরনো সমবায় সমিতি লিজ্জতের কথা সবাই জানে। গ্রামীণ নারীদের পাপড় বিক্রির মাধ্যমে এর যাত্রা হলেও আজ পুরো ভারতের পাপড়ের বাজার বলতে গেলে তাদের অধিকারে। জাপানের জেন-নোহ হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ কৃষি সমবায় সমিতিগুলোর একটি ফেডারেশন। ১৯৭২ সালে যাত্রা করে সারা দেশে ৯৪৫টি সমবায় ইউনিয়নের মাধ্যমে পরিচালিত এ ফেডারেশনের বর্তমান মূলধনের পরিমাণ ১০৮ কোটি মার্কিন ডলার এবং বার্ষিক টার্নওভারের পরিমাণ ৪ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। আন্তর্জাতিক সমবায় মৈত্রীর হিসাব অনুসারে, কানাডা, জাপান ও নরওয়েতে প্রতি তিনজনে এক জন সমবায়ী। আমেরিকা, যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানিতে প্রতি চারজনে একজন সরাসরি সমবায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
সুষ্ঠু কর্মপরিকল্পনা, আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবে সমবায় খাতে প্রত্যাশিত অগ্রগতি আজ পর্যন্ত দৃশ্যমান হয়নি। সমবায় হিসেবে অন্যতম সফল প্রতিষ্ঠান মিল্ক ভিটা এক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। কিন্তু এমন প্রতিষ্ঠান আর বিকাশ লাভ করতে পারেনি, এমনকি মিল্ক ভিটাও সম্প্রসারণ হতে পারছে না ব্যবস্থাপনাগত অদক্ষতায়। ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমল ও স্বাধীন বাংলাদেশের সূচনালগ্নে গঠিত সমবায় সমিতিগুলো হয় বন্ধ হয়ে গেছে নয়তো নিষ্ক্রিয় রয়েছে। কিছু সমিতির কার্যক্রম আছে মাত্র। নতুন সমিতি খুব একটা গঠিত হয় না। এ পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের যা করণীয় তা হচ্ছে দেশের নিষ্ক্রিয় সমবায় সমিতিগুলো পুনরুজ্জীবিত করতে একজন সমবায় বিশেষজ্ঞকে প্রধান করে এবং আরো দুজন অভিজ্ঞ সমবায় গবেষককে সদস্য করে কমিশন গঠন করা যেতে পারে। কমিশন দেশের সমবায় সমিতির বিদ্যমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সমস্যা ও সম্ভাবনা নির্ণয় করে সরকারের কাছে করণীয় প্রস্তাব পেশ করবে। সমবায়ের বেহাত ও বেদখল হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এছাড়া কমিশনকে সমবায় অঙ্গনে ন্যায়পালের ক্ষমতায়নের দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে। সমবায় অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে সমবায়ীদের কোনো অভিযোগ থাকলে তা কমিশনে পেশ করবে। কমিশন দায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। পাশাপাশি দেশের বিদ্যমান সমবায় আইন বিধিমালা প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধনের জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব পেশ করতে পারবে।
সমবায়ের মূলমন্ত্র হচ্ছে স্বনির্ভরতা ও স্বশাসন। কিন্তু সমবায়ীদের এ আচরণের জন্য তারা যতটা না দায়ী, তার চেয়ে অনেক বেশি দায়ী বর্তমান আইনি কাঠামো। তাই সমবায়ীদের আরো সক্রিয় করতে হলে আইনের সংশোধনের মাধ্যমে তাদের অধিকতর ক্ষমতায়ন করতে হবে।










