পৃথিবীর বৃহত্তম এ বদ্বীপে সভ্যতা বিকাশের মূলে কাজ করেছে জলাশয়, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়, নদ-নদীর অমূল্য পানিসম্পদ। পানির প্রাপ্যতাকে কেন্দ্র করেই এখানে বিভিন্ন জনপদ গড়ে উঠেছে। কৃষি-শিল্পের কর্মকাণ্ড বেগবান করার পাশাপাশি মানুষের জীবনধারণ নিশ্চিত করেছে পানি। সেদিক থেকে বাংলাদেশকে পানির দেশ বললে অত্যুক্তি হবে না। কিন্তু পানির আধারগুলো অনেকটা সংকুচিত হওয়ায় সর্বজনের পানির অধিকার এখন মারাত্মক হুমকির মুখে। বিদ্যমান উন্নয়ন ডিসকোর্সে পানিসম্পদের উৎসগুলো সুরক্ষার বিষয়টি এখন পর্যন্ত বিশেষ গুরুত্ব পায়নি। ফলে সামনের দিনগুলোয় পানি আমাদের জন্য একটি বড় সংকট হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সমূহ শঙ্কা রয়েছে। ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা দূর করতে জলাশয়, জলাভূমি, নদ-নদী রক্ষায় বিভিন্ন মহলে নানা সময় আলাপ-আলোচনা হয়েছে। ওইসব আলোচনা থেকে নানা পরামর্শ এলেও সেগুলো বাস্তবায়নে অগ্রগতি সামান্যই। গতকাল এএলআরডি, বেলা, পানি অধিকার ফোরাম ও বণিক বার্তার যৌথ আয়োজনেও পানিসম্পদ সুরক্ষার বিষয়ে একটি অনলাইন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাতে বক্তারা উন্নয়ন ভাবনায় পানি ও নদ-নদী সুরক্ষাকে গুরুত্ব দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বিষয়টি আমলে নিয়ে নীতিনির্ধারকদের কার্যকর পদক্ষেপ ও জুতসই পরিকল্পনা জরুরি।

সন্দেহ নেই, দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পানির আধারগুলো প্রকৃতিদত্ত আমাদের অনন্য প্রাকৃতিক সুবিধারই প্রতিচ্ছবি। এ ধরনের সুবিধা অনেক দেশেই বিরল। অথচ যেটুকু পানির উৎস আছে, তারা সেগুলো সুরক্ষায় সদা তত্পর। দুঃখজনকভাবে বিশেষ ভৌগোলিক সুবিধার অধিকারী হয়েও বাংলাদেশে বিদ্যমান জলাভূমি, নদ-নদীসহ বিচিত্র ধরনের পানির উৎস সুরক্ষা অনেকটা অবহেলিত। দখল-দূষণে ক্রমসংকুচিত নদ-নদী। আগে যত নদ-নদী ছিল, কমতে কমতে তা বর্তমানে প্রায় এক-চতুর্থাংশে এসে ঠেকেছে। বিপরীতে বাড়ছে দখলদারের সংখ্যা। তথ্য বলছে, ২০১৯ সালে দেশে নদী দখলদারের সংখ্যা ছিল ৫৭ হাজার। আর ২০২০ সালে এসে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৩ হাজারে। শুধু দখল নয়, ক্রমাগতভাবে দূষিত হচ্ছে বিদ্যমান নদীগুলো। নদীসংলগ্ন কারখানাগুলোর বর্জ্য পরিশোধে ২৪ ঘণ্টা ইটিপি চালু রাখার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না। ফলে শিল্প-কারখানার বর্জ্য সরাসরি গিয়ে পড়ছে নদীতে। এতে একদিকে যেমন জলজ প্রাণবৈচিত্র্য হুমকিতে পড়ছে, অন্যদিকে মানুষের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। সমরূপভাবে জলাশয় ও জলাভূমিগুলোয় মানুষের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডে বিপন্নতার শিকার। অথচ দৃশ্যমান হওয়ায় নদ-নদীর পানি সুরক্ষার বিষয়টি যতটা গুরুত্ব পায়, আলোচনায় আসে; অন্য উৎসগুলো সুরক্ষার বিষয়টি ততটা আসে না। এই একদেশদর্শিতার অবসান প্রয়োজন।

বলা হচ্ছে, ২০৩০ সালে বিশ্বে পানির চাহিদা বাড়বে ৪০ শতাংশ। একই সময়ের মধ্যে পৃথিবীর শহর এলাকায় অর্ধেকের বেশি মানুষ বস্তিতে বসবাস করবে, যেখানে পানি সুবিধা থাকবে না। বাংলাদেশও বৈশ্বিক এ চিত্রের বাইরে নয়। নগরায়ণের ফলে মানুষ শহরমুখী হচ্ছে। নিম্ন আয়ের অনেক মানুষ বাস করছে বস্তিতে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বস্তিতে অনেক মানুষ পানির কষ্টে ভুগছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষও সুপেয় পানির সংকটে পড়েছে। একার্থে পানির ওপর ভাসলেও বাংলাদেশে মানুষের পানি অধিকার ক্ষুণ্নের বিষয়টি মেনে নেয়া যায় না। নানা বাঁক পেরিয়ে দেশের বয়স এখন ৫০। সুবর্ণজয়ন্তীর এই প্রাক্কালে পানিসম্পদে বিশেষ দৃষ্টি দেয়ার সময় এসেছে।

খাদ্যনিরাপত্তা, শিল্পায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন ও জীববৈচিত্র্যের প্রেক্ষাপটে দেশে পানির গুরুত্ব অপরিসীম। কাজেই জলাধারগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিবেশবান্ধব সবুজ ও টেকসই উন্নয়নে আজকাল পানির উৎস সুরক্ষা ও পানি সংরক্ষণ বিশেষ গুরুত্ব পেলেও বাংলাদেশে তা অনেকটা উপেক্ষিত। দেশের উন্নয়ন দর্শন এখনো আগের পশ্চিমা উন্নয়ন মডেলমুখী, যেখানে প্রতিবেশকে বিপন্ন করে শিল্পায়নে অধিক জোর দেয়া হয়। অন্ধভাবে এ মডেলের অনুকরণ দেশের জন্য মারাত্মক বিধ্বংসী হতে পারে, যার কিছুটা পরিণাম এরই মধ্যে স্পষ্ট। সুতরাং এ ধরনের উন্নয়ন চিন্তা থেকে বেরিয়ে প্রতিবেশ, নদ-নদী, জলাশয় সুরক্ষায় অধিক মনোযোগ দিতে হবে। দখল-দূষণ বন্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। অনেক দেরিতে হলেও পানি ব্যবস্থাপনায় ডেল্টা প্ল্যান একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা চাই। উন্নয়ন টেকসই করতে হলে পানির আধারগুলো অবশ্যই রক্ষা করতে হবে। এর বিকল্প নেই। রাষ্ট্রীয় নীতি-পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দর্শনে বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব দেয়া এখন সময়ের দাবি।