করোনা মোকাবেলায় সারা বিশ্বে টিকা প্রদানের ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশেও টিকাদান কার্যক্রম চলছে। এরই মধ্যে ৬০ শতাংশ মানুষ প্রথম ডোজ এবং ৪০ শতাংশ দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছে। কিন্তু গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ১৮টি জেলায় টিকাদানের জন্য মনোনীত ব্যক্তির ৩০ শতাংশেরও কম দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছে। টিকাদানের হার কম হওয়ার জন্য ভৌগোলিক অবস্থান ও জনসচেতনতার অভাবকে দায়ী করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জেলার প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের আরো সক্রিয় হতে হবে। এলাকাভিত্তিক তালিকা করে টিকা প্রদানের পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। 

বিশ্বজুড়েই করোনা মোকাবেলায় টিকার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। টিকার ব্যাপারে ইউরোপ, আমেরিকাসহ সর্বত্র একসময় মিশ্র মনোভাব ও মতামত ছিল। এক পক্ষ টিকাদানের পক্ষে থাকলেও অন্য পক্ষ ছিল বিপক্ষে। ইতিবাচক প্রচার-প্রচারণা ও টিকার কার্যকারিতা প্রমাণিত হওয়ায় বিপক্ষবাদীদের সংখ্যা এরই মধ্যে অনেকটাই কমেছে। আমেরিকার মতো দেশকেও টিকাদানে উদ্বুদ্ধ করার জন্য প্রচার-প্রচারণাসহ নানা কৌশল, এমনকি অর্থ পর্যন্ত দিতে হয়েছে। ইউরোপেও নানা উপহার ও প্রণোদনা দিতে হয়েছে। কোথাও কোথাও এজন্য যথেষ্ট কঠোরতাও অবলম্বন করতে হয়েছে। এসবের ফল ভালোই হয়েছে। উন্নত দেশগুলোয় জনসংখ্যার ৮০ শতাংশের বেশি টিকার আওতায় এসেছে। ফলে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার কমেছে। ওইসব দেশে দুই ডোজ টিকা ছাড়া বুস্টার ডোজও দেয়া হয়েছে বা হচ্ছে। ভারত-পাকিস্তানেও দুই ডোজের পাশাপাশি বুস্টার ডোজ দেয়া হচ্ছে। আমাদের দেশেও পঞ্চাশোর্ধ্ব ব্যক্তিদের বুস্টার ডোজ দেয়া হচ্ছে। টিকার ক্ষেত্রে আমরা অনেক দেশের চেয়ে, এমনকি ভারত-পাকিস্তানের চেয়েও পিছিয়ে। টিকাদানের ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা, শ্লথতাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। এখন পর্যন্ত সাড়ে আট কোটির মতো মানুষকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। রেজিস্ট্রেশন করেও দ্বিতীয় ডোজ গ্রহণ করেনি, এমন মানুষের সংখ্যা আড়াই কোটি প্রায়। ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে অর্ধেকের বেশি এখনো টিকার বাইরে রয়েছে। আর এ পর্যন্ত বুস্টার ডোজ দেয়া হয়েছে মাত্র সাত লাখ মানুষকে। বলা বাহুল্য, এ চিত্র হতাশাজনক। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নানা কারণে টিকা নিতে মানুষের আগ্রহ কমে গেছে। সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার কমতে কমতে প্রায় শূন্যে নেমে আসা, রেজিস্ট্রেশন করতে ঝামেলা, রেজিস্ট্রেশন করেও এসএমএস না পাওয়া বা বিলম্বে পাওয়া, স্থানীয় পর্যায়ে টিকার সরবরাহ না থাকা ইত্যাদি মানুষের অনাগ্রহী হওয়ার কারণ। শিক্ষার্থীদের টিকাদানের বিশেষ ব্যবস্থা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু রাখার জন্য অপরিহার্য। সেটা করা হয়েছে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের সমবয়সী বিপুলসংখ্যক মানুষ, যারা প্রধানত কর্মজীবী, প্রায় সবাই টিকার বাইরে রয়েছে। দারিদ্র্য ও অশিক্ষা বা ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে তাদের প্রতি বৈষম্য দেখানো মোটেই উচিত নয়।

সরবরাহ ও সংরক্ষণ জটিলতায় দেশের বিভিন্ন জেলায় চাহিদা অনুযায়ী টিকা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এসব কারণে অনেক জেলায় টিকাদান কর্মসূচি দেরিতে শুরু হয়েছে। টিকায় আঞ্চলিক বৈষম্য দেখা দিলে মানুষের মধ্যে করোনা সংক্রমণের হার বাড়বে। এ কথা সত্য, সুনির্দিষ্ট কর্মকৌশল প্রণয়ন ও টিকার সহজলভ্যতার কারণে অধিকাংশ জেলায় টিকাদান কর্মসূচিতে সফলতা এসেছে। সমানতালে টিকাদান কর্মসূচি চালিয়ে যেতে হবে। এক্ষেত্রে অবহেলার কোনো সুযোগ নেই। টিকার জন্য সারা বিশ্বে সমতা আনতে হবে; সমতা থাকতে হবে দেশের ভেতরেও। সরকারের উদ্যোগেই সব জেলায় টিকা পৌঁছে দিতে ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা করা দরকার। এখন পর্যন্ত ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানি থেকে এগুলো ভাড়া করে কাজ চালানো হচ্ছে। ফলে নানা ধরনের অসুবিধা হচ্ছে। তাদেরও হয়তো পর্যাপ্ত ট্রান্সপোর্ট নেই। যে কারণে সরকার একদিকে ব্যবহারের জন্য নিলে অন্যদিকে কম পড়ছে। পিছিয়ে পড়া জেলাগুলোয় টিকা প্রদানে গতি আনতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিবন্ধন ও টিকা প্রদানের মতো পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। এরই মধ্যে রংপুর জেলায় এ উদ্যোগে সফলতা এসেছে। দেশে একসময় বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা টিকাসহ বিভিন্ন পরামর্শ দিতেন। এক্ষেত্রে তাদের কাজে লাগানো যেতে পারে। টিকা নেয়ার হার কম থাকা জেলাগুলোয় টিকা কার্যক্রম জোরদারে বিশেষ পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সিভিল সার্জন অফিসের সক্রিয়তা প্রত্যাশিত।

ব্রিটেন, ফ্রান্স, স্পেন এবং ইউরোপের রাজনীতিবিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা করোনা মোকাবেলায় নতুন পদ্ধতির কথা ভাবছেন। তাদের মন্তব্য করোনা কখনো সম্পূর্ণ নির্মূল হবে না। কোনো না কোনোভাবে থেকে যাবে। তার অস্তিত্ব ও ক্ষতিকারকতার কথা স্বীকার করেই মানুষকে চলতে হবে। এ কথাও বলা হচ্ছে, যেহেতু এটি দিন দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, সুতরাং তাকে মানিয়ে নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। সবকিছু বন্ধ করে দেয়া, নিজেদের ঘরে আবদ্ধ করে রাখা, লকডাউন বা শাটডাউনের আশ্রয় নেয়া, অর্থাৎ পালিয়ে থেকে বাঁচা যাবে না। তাকে সক্ষমভাবে মোকাবেলা করেই টিকে থাকতে হবে, মানবিক কর্মপ্রবাহ ও সভ্যতা, অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে হবে। এখন ওমিক্রন নামের যে ভ্যারিয়েন্ট এসেছে, তার তাণ্ডব চলছে ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের সর্বত্র। কিন্তু কোথাও কোনো কিছু বন্ধ করা হচ্ছে না। লকডাউন-শাটডাউন করা হচ্ছে না। তার বিপরীতে স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মানার সঙ্গে সঙ্গে টিকার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। করোনা থেকে সম্পূর্ণ নিরাময় লাভের কোনো প্রতিষেধক এখনো আবিষ্কার হয়নি। টিকা আবিষ্কার হয়েছে। এটা কোনো প্রতিষেধক নয়। টিকার মাহাত্ম্য হলো, এটি নিলে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমে যায় বা আক্রান্ত হলেও ক্ষতি তুলনামূলক কম হয়।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা তিনটি প্রতিবন্ধকতার কথা বলছেন। এর একটি হলো সচেতনতার অভাব। দ্বিতীয়টি হলো নিবন্ধন করার প্রযুক্তিগত জটিলতা এবং তৃতীয়টি হলো যথাসময়ে সব জায়গায় ঠিকমতো টিকা না পাঠানো। গণপরিসরে টিকা প্রদানের জন্য যে হারে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন এবং যেভাবে কমিউনিটি পর্যায়কে যুক্ত করা প্রয়োজন, তা ততটা হচ্ছে না। তাছাড়া নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজন স্মার্টফোন, যা অনেকেরই নেই কিংবা স্মার্টফোন থাকলেও কীভাবে নিবন্ধন করতে হবে, সে দক্ষতা নেই অনেকের। সবাইকে টিকার আওতায় আনার জন্য এটাই বড় চ্যালেঞ্জ।  ইউনিয়ন পর্যায়ে তথ্যকেন্দ্রগুলোকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল, তারাও আসলে কাজ করেছে কিনা সন্দেহ আছে। আর নিবন্ধন করতে হলে এনআইডি, পাসপোর্ট বা জন্মনিবন্ধন সনদ দরকার। এগুলোও সবার নেই। তাই বিকল্প ব্যবস্থা থাকা উচিত ছিল। টিকায় উদ্বুদ্ধ করতে হলে কমিউনিটিকে কাজে লাগাতে হয়। তার সুফল আমরা গণটিকায় দেখেছি। কিন্তু এটি সর্বব্যাপ্ত হয়নি। ফলে করোনার টিকায় মানুষকে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত করা যাচ্ছে না। যখন টিকা পর্যাপ্ত ছিল না তখন প্রচার বেশি ছিল। আর এখন পর্যাপ্ত টিকা থাকার পরও তেমন প্রচার নেই। শুরুতে একপর্যায়ে প্রচার নিরুৎসাহিতও করা হয়েছে। এখন উপজেলা পর্যায়ে অন-স্পট নিবন্ধনের সুযোগ আছে। সেটাও অনেকে জানেন না। এক্ষেত্রে প্রচারণা বাড়াতে হবে।

করোনা নিয়ন্ত্রণের উপায় জনগণকে টিকার আওতায় আনা। এজন্য টিকার পক্ষে যেমন প্রচারণা চালাতে হবে, তেমনি টিকাদানের ব্যবস্থা ও প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। গণটিকা কার্যক্রম শুরু করতে হবে। টিকা দেয়া ও নেয়ার ক্ষেত্রে একটা বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। দেশে এ বাধ্যবাধকতার জায়গাটি বড়ই দুর্বল। তা না হলে টিকায় বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকত না। এ দুর্বলতা দূর করতে হবে। শিল্প-কারখানা, দোকানপাট, ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদি সচল রাখতে এর কর্মী ও শ্রমিকদের জরুরি ভিত্তিতে টিকা দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। পিছিয়ে পড়া অঞ্চল, হাওর, চরাঞ্চল, দুর্গম এলাকার সবাইকে টিকার আওতায় আনতে হবে। সবার জন্য প্রথম, দ্বিতীয় ও বুস্টার ডোজ দেয়া সম্ভব হলে করোনা থেকে বহুলাংশে নিরাপদ থাকা সম্ভব হবে। সেই সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধি মানা ও মানানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এখনো রাস্তাঘাটে, হাটবাজারে, শপিং মলে, পরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করার প্রতিযোগিতা লক্ষ করা যায়। মাস্ক পর্যন্ত অনেকে ব্যবহার করেন না। অথচ করোনা সংক্রমণ থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য মাস্ক ব্যবহারের অপরিহার্যতা প্রশ্নাতীত। জনজীবন, কর্মপ্রবাহ, উৎপাদন, অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য সচল ও নিরাপদ রাখতে টিকাদান ও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের বিকল্প নেই। আমরা আশা করব, সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো টিকাদান ও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের বাধ্যবাধকতা বাস্তবায়নে সর্বাত্মক কার্যব্যবস্থা গ্রহণ করবে।