অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক শ্রমবাজার নানা রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। স্বভাবত দক্ষতার বিষয়টিও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তথ্য বলছে, বর্তমানে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ছয় কোটির বেশি। তাদের মধ্যে খুব স্বল্পসংখ্যকেরই বাজার-উপযোগী দক্ষতা আছে। অধিকাংশের তা নেই। ফলে বিশাল একটা জনগোষ্ঠী বেকারত্বের ঝুঁকিতে রয়েছে। কাজেই তাদের কর্মনিয়োজন নিশ্চিতে দক্ষতা উন্নয়ন জরুরি। সরকারও এক্ষেত্রে জোর দিচ্ছে। কিন্তু নানা সীমাবদ্ধতায় কাজটি যথাযথভাবে হচ্ছে না। সম্প্রতি প্রণীত জাতীয় কর্মসংস্থান নীতিতে দেশে শ্রমিকের দক্ষতা উন্নয়নে ১১টি চ্যালেঞ্জ উল্লেখ হয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের অপর্যাপ্ততা। এ চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

দক্ষতা উন্নয়ন এখন দেশের অন্যতম নীতি প্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এজন্য সরকারিভাবে বাড়ানো হচ্ছে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সংখ্যা। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতও বড় মাত্রায় যুক্ত হচ্ছে। তথ্য বলছে, বর্তমানে থাকা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ৮৭ শতাংশই বেসরকারি খাতের। তার মধ্যে একটি অংশ পরিচালিত হচ্ছে এনজিওগুলোর মাধ্যমে, আরেকটি অংশ পরিচালিত হচ্ছে ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান দ্বারা। তবে এসব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কার্যকারিতা ও মান নিয়ে রয়েছে বিস্তর প্রশ্ন। অনেক প্রতিষ্ঠান ভুগছে দক্ষ প্রশিক্ষকের ঘাটতিতে। আবার    বিচ্ছিন্নভাবে কিছু প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের নিজস্ব ম্যানুয়াল আছে বটে, কিন্তু সেগুলো যুগ চাহিদা মেটাতে পারছে না। নেই প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও অন্য সুবিধাদিও। যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিতে বিশ্ব অনেক এগিয়ে গেছে। অথচ প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো প্রশিক্ষণ দিচ্ছে সনাতনী সরঞ্জামের মাধ্যমে। ফলে প্রশিক্ষণ ও বাস্তব কর্মজগতের মধ্যে দক্ষতার বিপুল ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে। তদুপরি প্রশিক্ষণ খাতে অনিয়মও কম নয়। কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রশিক্ষণ না দিয়েই অর্থের বিনিময়ে সনদ বাণিজ্যের অভিযোগ আছে। এমনকি কিছু প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সরকারি নিবন্ধনও নেই বলে খবর মিলছে। এতে ভুয়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোয় মানুষের প্রতারণার সুযোগও থেকে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে বিদ্যমান প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা দক্ষতা উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।

শ্রমশক্তিকে উন্নয়নের প্রতিটি ধাপের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে উন্নত দেশগুলো বরাবরই দক্ষতা উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়েছে। ক্রান্তিকালীন পর্বে দেশগুলো অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কারের সঙ্গে শ্রমশক্তির দক্ষতা বাড়ানোর কাজটি যুগপত্ভাবে করে গেছে। শিক্ষার পাশাপাশি সময়োপযোগী মানসম্মত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। শুধু সরকার নয়, ব্যক্তি খাতও নিজস্ব উদ্যোগে বিস্তৃত কর্মকালীন দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণ চালিয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্সসহ পশ্চিমা প্রাগ্রসর অর্থনীতির আজকের এ সমৃদ্ধির পেছনে এ নীতি বড় ভূমিকা রেখেছে। দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর এবং জাপানের পথও একই। চীন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভারতসহ আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোও একই কাজ করছে, যা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে এখনো জনমিতিক বোনাসকাল চলছে। তরুণ জনগোষ্ঠীর আধিক্য বেশি। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের দক্ষতা বাড়ানো গেলে দেশের অভ্যন্তরে ও বিদেশে প্রবেশ পর্যায়ের চাকরি থেকে শুরু করে উচ্চদক্ষ পদগুলোয় কর্মনিয়োজন বৃদ্ধির সুযোগ আছে। কাজেই এটা মাথায় রেখে দেশের দক্ষতা উন্নয়ন পরিকল্পনা সামগ্রিকভাবে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতির সঙ্গে শ্রমবাজার ও সামাজিক সুরক্ষা নীতি, শিল্প, বিনিয়োগ, বাণিজ্য, প্রযুক্তিসহ স্থানীয় ও আঞ্চলিক উন্নয়ন নীতিগুলোর সম্মিলন ঘটাতে হবে। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে সুশৃঙ্খলায় আনতে হবে। সেক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের নিবন্ধন পেতে অবকাঠামো, প্রশিক্ষক ও অন্য আনুষঙ্গিক লজিস্টিকস সুবিধার একটি ন্যূনতম মানদণ্ড ও শর্ত বেঁধে দেয়া যেতে পারে। সব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের জন্য খাতওয়ারি বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে যুগোপযোগী বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ মডিউল ও ম্যানুয়াল প্রণয়ন করাও জরুরি। এক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক শ্রমবাজারের বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনায় রাখা চাই। দেশের শিল্প খাতের অল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের কর্মকালীন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই। শ্রম দক্ষতা বাড়াতে হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব প্রশিক্ষণ উদ্যোগও জোরদার করতে হবে। আমরা দেখছি, আমাদের জনশক্তির গন্তব্য দেশগুলো প্রযুক্তি ও সরঞ্জামে অনেক এগিয়ে গেছে। আমরা এখনো পিছিয়ে। সেটা মাথায় রেখে তাদের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা কৌশল সাজানো দরকার। না হলে তারা সেখানে গিয়ে দক্ষতা ঘাটতি সহজে পূরণ করতে পারবে না।

আজকের বিশ্বায়িত দুনিয়ায় প্রতিটি রাষ্ট্রই আন্তঃসংযুক্ত। বহিস্থ যেকোনো প্রভাব তাই সহসা অভ্যন্তরেও পড়ে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব এখন আমাদের দোরগোড়ায়। বিশ্বের অন্য দেশগুলোর মতো এর প্রভাব এখানেও পড়তে বাধ্য। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এক হিসাব মতে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লববাহিত প্রযুক্তিগুলো এবং অটোমেশনের কারণে ২০৪১ সাল নাগাদ আমাদের পোশাক খাতে ৬০ শতাংশ, আসবাব শিল্পে ৫৫, পর্যটন ও হসপিটালিটি খাতে ২০ এবং চামড়া খাতে ৩৫ শতাংশ শ্রমিক কর্মচ্যুত হতে পারেন। এটা বড় শঙ্কার বিষয়। অন্যদিকে আলোচ্য শিল্প বিপ্লবে নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টির সম্ভাবনাও রয়েছে। বিশেষত এর ফলে ডিজিটাল মার্কেটিং, স্বয়ংক্রিয় খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, সাইবার নিরাপত্তা, ডাটা অ্যানালিটিকস, মোবাইল প্রযুক্তি, থ্রিডি প্রিন্টার অপারেটর, মডেলিং ও সিমুলেশন, অটোমেশন ও রোবোটিকস কনট্রোল, ব্লকচেইন, ইন্ডাস্ট্রিয়াল আইওটি প্রভৃতি ক্ষেত্রে কাজের চাহিদা বাড়বে। কাজেই কোন কোন খাতে কর্মসংস্থান সংকুচিত হতে পারে, আর কোন কোন খাতে বাড়তে পারে, তা বিবেচনায় নিয়ে দেশের অর্থনীতির কাঠামোগত, শিক্ষাগত রূপান্তরের সঙ্গে প্রশিক্ষণের কাজটি বেগবান করতে হবে।

দেশের টেকসই উন্নতি নির্ভর করছে শ্রমশক্তির দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতার ওপর। সংগত কারণে এসডিজিতেও দক্ষতার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এখন পর্যন্ত স্বল্পদক্ষ শ্রম দিয়ে আমরা এত দূর এসেছি। বৈশ্বিক দৃশ্যপটে সবকিছু দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সামনে প্রতিযোগিতা আরো বাড়বে। তাই শ্রমিকের দক্ষতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। জাতীয় কর্মসংস্থান নীতিতে শ্রমিক দক্ষতা উন্নয়নে যেসব চ্যালেঞ্জের কথা  এসেছে, তা নতুন নয়। আগে থেকেই এগুলো চিহ্নিত। কিন্তু সেগুলো উত্তরণে তেমন প্রচেষ্টা নেয়া হয়নি। এখন এর ব্যত্যয় কাম্য।