শুরু হলো ঈদযাত্রা। অনেকেই ঢাকা ছাড়ছেন, ঈদ করতে যাচ্ছেন গ্রামের বাড়িতে। টার্মিনালগুলোয় ঘরমুখো যাত্রীদের ভিড়। ঘাটে ঘাটে যানজট, ঘটছে দুর্ঘটনাও। তবে সবকিছু ছাপিয়ে স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষার বিষয়টিই সবচেয়ে আশঙ্কার। করোনার উচ্চ সংক্রমণের মধ্যে ঈদ উপলক্ষে বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়। শর্ত দেয়া হয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার। দুঃখজনকভাবে ঈদযাত্রায় বাস, ট্রেন, লঞ্চ কোথাও ঠিকমতো স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার বালাই নেই। অনেকেই মাস্ক না পরারও খবর মিলছে। এটা উদ্বেগজনক। এতে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে বৈকি। কাজেই ঈদযাত্রায় স্বাস্থ্যবিধি পরিপালনে সবার দায়িত্বশীলতাই জরুরি।
বাস্তবতা হলো, দেশে করোনা শনাক্তের হার বাড়ছে। প্রতিদিন দীর্ঘ হচ্ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর তালিকা। স্বাস্থ্য বিভাগ, জাতীয় পরামর্শক কমিটি, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ—সবাই বর্তমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অভিহিত করেছেন। সংশ্লিষ্ট জাতীয় কমিটি বিধিনিষেধ শিথিল করায় উদ্বেগ জানিয়েছেন। বরং তারা বিধিনিষেধ আরো ১৪ দিন বাড়ানোর সুপারিশ করেছেন। তাদের সুপারিশ আমলে নেয়া হয়নি। ফলে ঈদযাত্রায় ঘরমুখো মানুষের উন্মাদনায় পরিস্থিতি খারাপের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। এটাই প্রথম নয়। এর আগেও জাতীয় পরামর্শক কমিটির মত উপেক্ষা করে ইচ্ছামতো বিধিনিষেধ আরোপ আর শিথিল করা হয়েছিল। এর ফল ভালো হয়নি। বরাবরই বেড়েছিল করোনার প্রকোপ। এ প্রেক্ষাপটে জাতীয় পরামর্শক কমিটির কার্যকারিতা ও প্রয়োজনীয়তা আদৌ আছে কিনা, সে প্রশ্নটিও উঠছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কোনো দেশে দৈনিক শনাক্তের হার ৫ শতাংশের নিচে এলে সেটিকে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বলা যায়। সেই জায়গায় এখন সারা দেশে দৈনিক শনাক্তের হার ৩০ শতাংশের ওপরে। এমন এক পরিস্থিতিতে যেভাবে মানুষ গাদাগাদি করে বাড়ি যাচ্ছে, তা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকিস্বরূপ।
নির্দেশনা অনুযায়ী করোনার বিস্তার কমাতে সব ধরনের গণপরিবহনে ৫০ শতাংশ যাত্রী পরিবহনের কথা। কিন্তু এ নির্দেশনা খুব কমই মানা হচ্ছে। জনাকীর্ণ ফেরিগুলোয় পদ্মা পাড়ি দিতে গিয়ে অনেকে মাস্ক পরা বা শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার নিয়মও মানছেন না। মহাসড়কগুলোয় যানবাহনের দীর্ঘ সারি। বাস অপারেটররা বেশি ভাড়া নিচ্ছেন। সরকার প্রতি আসনে একজন যাত্রী বহনের শর্তে ৬০ শতাংশ ভাড়া বাড়িয়েছে। অথচ বাস কোম্পানিগুলো দ্বিগুণ বা ততোধিক ভাড়া নিচ্ছে। আবার যাত্রীও বেশি নিচ্ছে বলে অভিযোগ। লঞ্চেও একই অবস্থা। অর্ধেক আসনের বিপরীতে ৬০ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধি করা হলেও বাস্তবে নেয়া হচ্ছে তারও বেশি। যাত্রীও নেয়া হচ্ছে আগের মতো গাদাগাদি করে। বাসের মধ্যে দূরপাল্লার বাসগুলোয় কিছুটা স্বাস্থ্যবিধি মানা হলেও ছোট যানবাহনে এর কোনো বালাই নেই। রেলের অবস্থা কিছুটা ভালো। ট্রেনগুলো সময়মতো ছাড়ছে। শিডিউল বিপর্যয় নেই। তবে রাষ্ট্র পরিচালিত ট্রেনগুলোয় সরকারি নির্দেশনা ও স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে। সব মিলিয়ে ঈদযাত্রা যেভাবে চলছে, তাতে সামনে আমাদের জন্য কঠিন বিপদ অপেক্ষা করছে বৈকি।
নীতিনির্ধারণী মহল থেকে নিয়ম লঙ্ঘনকারী বাস অপারেটর ও লঞ্চ মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে এর প্রতিফলন নেই। বাড়তি ভাড়া আদায়ের পাশাপাশি গাদাগাদি লোক নেয়া অব্যাহত আছে। ফলে সার্বিকভাবে স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষিত হচ্ছে। একদিকে অনেক যাত্রীই নিজেরা মাস্ক পরছে না, অন্যদিকে সরকারি নির্দেশনার বিপরীতে বেশি লোক পরিবহন করায় শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় বিআরটিএ কিংবা বিআইডব্লিউটিএর নজরদারি বাড়ানো জরুরি। নিয়ম অমান্যকারী বাস ও লঞ্চগুলোকে সতর্ক করতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে প্রয়োজনে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে বাস ও লঞ্চ টার্মিনালে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তত্পরতা, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান বাড়াতে হবে, যাতে মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে। বাস ও লঞ্চ কর্তৃপক্ষেরও একটা সক্রিয় ভূমিকা পালন করা চাই। স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন ছাড়া যেন কোনো যাত্রী বাস-লঞ্চ-ট্রেনে ভ্রমণ না করে, তার দায় অনেকাংশে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। কেননা সরকার শর্ত দিয়েই তাদের গণপরিবহন চালানোর অনুমতি দিয়েছে। সুতরাং করোনার বিস্তার নিয়ন্ত্রণে তাদের ভূমিকাটিও কম নয়।
রোগীর চাপে এরই মধ্যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বেসামাল। দেশের কভিড হাসপাতালগুলোর শয্যা পূর্ণ হয়ে গেছে। রোগী আরো বাড়লে হাসপাতালে জায়গা দেয়া সম্ভব হবে না। এটিই বাস্তবতা। এ অবস্থায় নিজেদের সতর্কতাই সর্বাগ্রে জরুরি। দীর্ঘ লকডাউনে ব্যবসা-বাণিজ্যে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ খাদ্যকষ্টে ভুগছে। দিনমজুরদের কাজ নেই তো পেটে ভাত নেই অবস্থা। মানুষের জীবিকা, অর্থনীতি, জনচলাচলসহ হয়তো সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়েছে। কিন্তু নাগরিক হিসেবে আমরা এ সুযোগের অপব্যবহার করছি কিনা, তা-ও ভাবা দরকার। মনে রাখতে হবে, আমরা বিশেষ এক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি পার করছি। ভয়ংকর রূপে হাজির হচ্ছে করোনা। কারো কারো পরিবারের একাধিক প্রিয় মানুষকে, স্বজন-পরিজনকে কেড়ে নিয়েছে এ মারণব্যাধি। কাজেই নিজের জীবনকে নিজেরই সুরক্ষা দিতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি অবশ্যই মানতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।
এখন শুধু ঢাকা নয়, রাজশাহী, খুলনা, বরিশালসহ সারা দেশে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। গত বছর গ্রামাঞ্চলে সংক্রমণ ততটা না ছড়ালেও এবার তার ব্যত্যয় ঘটেছে। অনেক জেলা-উপজেলায় শনাক্তের হার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। এরই মধ্যে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট সারা দেশে, বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় প্রয়োজন ছিল আরো কঠোর লকডাউনের। কিন্তু ঈদ উপলক্ষে বিধিনিষেধ শিথিল করায় স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে মানুষ যেভাবে গ্রামে ফিরছে, তা বেশ আতঙ্কের। এতে ঈদের পর সংক্রমণ পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ নেয়ার আশঙ্কা। বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে বারবার সতর্ক করছেন। জাতীয় পরামর্শক কমিটি বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করছে। বিপর্যয়কর পরিস্থিতি এড়াতে তাই তাদের বাস্তবসম্মত ও বিজ্ঞানসম্মত সুপারিশগুলো আমলে নেয়া এবং সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন করা জরুরি।










