বাংলাদেশে মোবাইলভিত্তিক আর্থিক সেবা (এমএফএস) ক্রমেই প্রসারিত হচ্ছে। মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালুর পর প্রথম দিকে দৈনিক শতকোটি টাকার লেনদেন হলেও পর্যায়ক্রমে এর পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। করোনা মহামারীকালে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় সরকারের দেয়া নগদ অর্থ প্রদান থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যক্তি খাতের সহায়তা পৌঁছে দিতে বড় ভূমিকা রাখছে এমএফএস। এর মধ্যেই আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর করপোরেট করহার বাড়ানোর ঘোষণা এসেছে। এমএফএসে বিনিয়োগকারী এবং সেবা পর্যায়ে আগে থেকেই অনেক বেশি কর-ভ্যাট কার্যকর আছে। তার ওপর করপোরেট কর সাড়ে ৩২ থেকে বাড়িয়ে ৪০ শতাংশ করা হলে সেটি সংশ্লিষ্ট সেবা প্রসারে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ানোর শঙ্কা রয়েছে। তাছাড়া খাতটিই এখন চলছে লোকসানে। এ মুহূর্তে এমন একটি সম্ভাবনাময় খাতে করপোরেট কর বাড়ানো হলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে সেটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বৈকি। 

আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় ধরনের অবদান রয়েছে। খাতটি বর্তমানে বিকাশের পর্যায়ে রয়েছে। এ অবস্থায় নিত্যনতুন সেবা ও প্রযুক্তি প্রচলনের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিনিয়ত বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। ফলে মুনাফার চেয়ে গ্রাহক সংখ্যা বাড়ানোর দিকেই নজর দিচ্ছে সবাই। কোনো এমএফএস লাভের মুখ দেখেনি এখনো। বিদ্যমান বাস্তবতায় সংশ্লিষ্ট খাতে কর বাড়ালে প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসা করতে নিরুৎসাহিত হতে পারে। তাতে এ সেবার মূল উদ্দেশ্য, অর্থাৎ আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও ডিজিটাল আর্থিক পরিষেবা সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কাও রয়েছে। বরং এ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা করা উচিত। কভিড-১৯ মহামারীর সময়ে সংক্রমণ এড়াতে নগদ অর্থের পরিবর্তে ডিজিটাল লেনদেনের পরামর্শ দিয়েছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। তাছাড়া দেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো এবং ক্যাশলেস সমাজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এমএফএস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। একই সঙ্গে এ ধরনের লেনদেনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করছে।

সরকারের অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার একটি বড় লক্ষ্য ছিল করপোরেট কর ৩০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা। সেখানে মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের কর ৪০ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব যুক্তিসংগত হতে পারে না। আর্থিক খাতে ডিজিটালাইজেশন করতে না পারলে ডিজিটালাইজেশনের সামগ্রিক লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সেবা রয়েছে। আফ্রিকা, যুক্তরাষ্ট্র, এমনকি লাতিন আমেরিকায় এ সেবা সম্প্রসারিত হচ্ছে দ্রুত। কিছুু দেশে কর ছাড় দিয়ে একে বিকশিত করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। আবার কিছু দেশে কর আছে, তবে কোথাও ৪০ শতাংশ করপোরেট কর আছে বলে জানা যায় না। এক গবেষণায় দেখা গেছে কঙ্গো, মালাও, কোস্টারিকার মতো দেশে এমএফএসে অযাচিত করারোপ এর বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করেছে। সর্বোপরি এর প্রভাবে অর্থনীতির স্বাভাবিক প্রবাহই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশগুলো পরবর্তী সময়ে এ সেবার ওপর থেকে কর কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়। করারোপের অন্যতম উদ্দেশ্য অর্থনৈতিক কার্যক্রম সংকুচিত না করে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি। কর উদীয়মান খাতের সম্প্রসারণ রুদ্ধ করলে সেটি অর্থনৈতিক উন্নয়নকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা পরবর্তী সময়ে সরকারের রাজস্ব আহরণকে বাধাগ্রস্ত করবে। দেশের কোনো এমএফএস যখন লাভজনক পর্যায়ে যায়নি, সেখানে করহার বাড়ানোর উদ্দেশ্য স্পষ্ট নয়।

সাধারণ মানুষ উপার্জিত যে টাকা গ্রামে থাকা পরিবারের কাছে অনেক ঝুঁকি নিয়ে পাঠাত, সেই ঝুঁকির দিন এখন আর নেই। কারণ এখন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে দিন দিনই টাকা দূর গ্রামের বাড়িতে পরিবার-পরিজনের কাছে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ইতিবাচক ব্র্যান্ডিংয়ে মোবাইল ব্যাংকিং সেবার দ্রুত বিকাশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে সন্দেহ নেই। এক্ষেত্রে গ্রাহক সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে গণ্য করা হচ্ছে বর্তমানে। মোবাইল ব্যাংকিং আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতিতে অনন্য গতিসঞ্চার করেছে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স গ্রামের পরিবার-পরিজনের কাছে সরাসরি পৌঁছে দিতে মোবাইল ব্যাংকিং কার্যকর ভূমিকা রাখছে। সিম রেজিস্ট্রেশন হওয়ায় মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে নিরাপত্তাও বেড়েছে। নগদ টাকা নিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার ক্ষেত্রে যে শঙ্কা, ভয়, অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা ছিল, তা দূর করেছে মোবাইল ব্যাংকিং। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ এবং এর সুষম ব্যবহার আমাদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করেছে। আমাদের অর্থনীতিতে গত এক দশকে অনেক সমৃদ্ধি ঘটেছে, উন্নয়নের নতুন নতুন দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হয়েছে।

আমানত, ঋণের মতো মৌলিক আর্থিক সেবাপ্রাপ্তি যেকোনো সমাজ তথা দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তির অন্যতম নির্ণায়ক। এটি উন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে যেমন সত্য, তেমনি বাংলাদেশের মতো উদীয়মান দেশগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আর্থিক ব্যবস্থায় সব শ্রেণীর মানুষের অন্তর্ভুক্তি টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও ব্যবসায় বিনিয়োগ সহায়ক আর্থিক সেবা মানুষকে দারিদ্র্য থেকে উত্তরণে পৃষ্ঠপোষকতা জোগায়। তদুপরি আর্থিক বিপর্যয়ে ঠেলে দেয়া আকস্মিক অসুস্থতার মতো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায়ও ব্যক্তির জন্য আর্থিক সেবা গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবতা হলো, দেশের আর্থিক ব্যবস্থাকে এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় অন্তর্ভুক্তিমূলক করা যায়নি। পরিবর্তিত বাস্তবতায় এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্প্রসারণ বৃদ্ধি এবং গ্রাহক ভিত্তি বাড়াতে বিভিন্ন উদ্ভাবনমূলক পথ অন্বেষণ ও প্রডাক্টে (পণ্য ও সেবা) বৈচিত্র্য আনা জরুরি। এজন্য বিপুল দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ প্রয়োজন। উচ্চ করপোরেট কর ভবিষ্যতে এ খাতে বিদেশী বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করবে। লোকসানি একটি খাতের করহার বাড়িয়ে সরকারের রাজস্ব বাড়বে না, বরং খাতটি শঙ্কায় পড়বে। দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করছে এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো। তাই এ মুহূর্তে খাতটির উন্নয়নে করপোরেট কর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত সরকারের পুনর্বিবেচনা করা উচিত।