করোনা
মহামারীর ২য় ঢেউয়ে সংক্রমণ ভয়ঙ্কর রূপে বৃদ্ধি পাচ্ছে! সংক্রমণ বৃদ্ধির সাথে সাথে মৃত্যুও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় তেমনি দ্রুত, পরিকল্পিত, সমন্বিত ও সুসংগঠিত কার্যকরী প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত কর্মসূচীর বিকল্প নেই! গত মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই মূলতঃ করোনা সংক্রমণ পুনরায় বৃদ্ধি পেতে শুরু করে এবং ক্রমশ বেড়েই চলে যা করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের লক্ষণ বলেই বিশেষজ্ঞরা অনুমান করেছিলেন। হয়েছেও তাই। এপ্রিলে সংক্রমণ ও মৃত্যু দুটোই ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। এমতাবস্থায় সরকার স্বাস্থ্যবিধি সংশ্লিষ্ট ১৮ দফা নির্দেশনা ঘোষণা করেন এবং অনেকটা প্রস্তুতি ছাড়াই হঠাৎ ৫ এপ্রিল ২০২১ থেকে লকডাউন ঘোষণা করেন। গার্মেন্ট ও শিল্পকারখানা খোলা রাখা হয়। সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিস জরূরী কাজের বিবেচনায় সীমিত লোকবল নিয়ে খোলা রাখার সিদ্ধান্ত হয়। ব্যাংক-বীমা প্রতিষ্ঠানও বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়। পক্ষান্তরে, পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়। সৃষ্টি হয় অফিসগামী মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগ এবং সরকার ব্যাপক সমালোচনার মুখে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ষাট পার্সেন্ট ভাড়া বৃদ্ধির শর্তে স্বাস্থ্যবিধি মেনে অর্ধেক যাত্রী পরিবহনের সিদ্ধান্ত হয়। ব্যাংক খুলে দেয়া হয়। শেয়ার মার্কেটও খোলার সিদ্ধান্ত নেয়। পাবলিক ট্রান্সপোর্ট স্বাস্থ্যবিধি মানেনি। অনেক ক্ষেত্রে অধিক যাত্রী বহন করেছে। ব্যক্তিগত গাড়ি, মটরবাইক, রিকসা চলেছে। পুলিশকে কঠোর অবস্থানে যেতে দেখা যায়নি। মোবাইল কোর্টের তত্পরতাও ততটা জোরালো ছিলো না। এমন অবস্থায় কয়েক দিনের সময় দিয়ে আবার সর্বাত্মক লকডাউন ঘোষণা করা হয় গত ১৪ এপ্রিল ২০২১। এ লকডাউনেও যথারীতি গত বছরের মতোই মানুষ যেভাবে কোন রকম স্বাস্থ্য বিধি না মেনেই গ্রামে গিয়েছে সেটা লকডাউনের উদ্দেশ্যকে অনেক খানি ব্যাহত করবে নিশ্চিত বলা যায়। কমিউনিটি লেবেল সংক্রমণ বাড়িয়ে দিবে। সমন্বয়হীনতার ব্যাপারটা যেন শুরু থেকেই স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১৪
এপ্রিল ঘোষিত লকডাউনের প্রথম দুই-তিন দিন ঢাকা মহানগর ব্যতীত সারা দেশে ঢিলেঢালাভাবেই লকডাউন চলেছে। ঢাকার মহল্লা ও বাজারগুলিতেও যথরীতি ঢিলেঢালাভাবে
চলেছে। লকডাউনের
চতুর্থ-পঞ্চম
দিন
এসে
পুলিশ
অনেকটাই
কঠোর
অবস্থানে
গিয়েছে। মোবাইল কোর্টের তত্পরতাও বেড়েছিল। পুলিশ মুভমেন্ট পাশ চেক করছে। পাশ না থাকলে ২-৫ হাজার টাকা জরিমানা করছে। খুব জরুরী ও যৌক্তিক কারণ হলে পুলিশ তাদের ছেড়েও দিয়েছে। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমেও স্বাস্থ্য বিধি ভঙ্গের কারণে জরিমানা করছে। তারপরও কিছুতেই মানুষকে করোনা সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য বিধি/ নির্দেশনাসমূহ মানানো যাচ্ছে না। সারা দেশেই প্রায় একই অবস্থা। কেন এমনটা হচ্ছে? এক্ষেত্রে একটু পিছনে ফিরে দেখার প্রয়োজন বোধ করছি। মার্চ ২০২০ এ করোনার শুরুর পরবর্তী কয়েক মাসে ইউরোপ, আমেরিকা, চীন ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে যেভাবে বাংলাদেশে লোক এসেছিল তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা তথা বিমান বন্দরে কোভিড টেষ্ট ও কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা যথার্থভাবে করা যায়নি। অনেকে কোন রকম টেষ্ট ছাড়াই, আবার অনেকে ম্যানেজ করে বিমান বন্দর অতিক্রম করে গ্রামে ও বিভিন্ন শহরে চলে গেছে। কোয়ারেন্টিনের জন্যে আশুলিয়ায় হজ্ব ক্যাম্পে নেয়া প্রবাসী প্রত্যাগতরা কিভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে কোয়ারেন্টিনে অসহযোগিতা সৃষ্টি করেছিল সেটা সবার মনে থাকার কথা। ব্যবস্থাপনা চরমভাবে ব্যহত হয়েছিল। মাচের্র ৮, ২০২০ তারিখে প্রথম কভিড রোগী সনাক্ত হবার পর ২৪ মার্চ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিলো। আহ্বান ছিলো সবাইকে ঘরে থাকার। কিন্তু পাবলিক পরিবহন বন্ধ না করে চালু রাখাটা হয়েছিল বড় ভুল। মানুষ সরকারের নির্দেশনা মানেনি। বরং যেভাবে তারা কক্সবাজারে প্রমোদ ভ্রমণে বেরিয়েছিল এবং গ্রামে গিয়েছিল সেই দৃশ্য ভোলার নয়। লক্ষ লক্ষ লোকের কক্সবাজার জমায়েত ও ফেরি পারাপারের সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতাও ভোলার নয়। লক্ষ লক্ষ লোক ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা দেশে- শহরে ও গ্রামে। পরিনামে দেশের বেশ কয়েকটি জেলায় করোনা ছড়িয়ে পড়ে। সূত্রপাত হতে থাকে কমিউনিটি সংক্রমণের। তারপরের যে বিষয়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও ভয়াবহ সেটা হচ্ছে পরিবহন বন্ধ থাকা অবস্থায় সাধারন ছুটির মধ্যেই গার্মেন্ট শ্রমিকদের কাজে যোগদানের অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত। শ্রমিকরা ঠিক যেভাবে স্বাস্থ্য বিধি ভঙ্গ করে গ্রামে গিয়েছিলো, ঠিক একইভাবে আবার কাজে যোগদানের জন্যে ঢাকায় ফিরে এসেছিলো। ফিরে আবার ২-৩ দিন তারা গার্মেন্টসে যোগ দিতে পারেনি। মারাত্মক সিদ্ধান্ত হীনতা। বাসা-বাড়ীর মালিকেরাও তাদেরকে তাদের ভাড়া বাসায় সংক্রমণের ভয়ে উঠতে দিচ্ছিলো না। এই সবই যথাযথ সিদ্ধান্ত, সমন্বয়হীনতা ও স্বাস্থ্য বিধি না মানার ফল, যা গোটা দেশকে আজকের ভয়াবহ করোনার ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে। এ সব অব্যস্থাপনা ও স্বাস্থ্য বিধির মারাত্মক লঙ্ঘন,যা দেশকে করোনা সংক্রমণের ভয়াবহ এই পরিস্থিতিতে নিয়ে এসেছে তা থেকে আমরা কতটুকু শিক্ষা লাভ করলাম বা এর অভিজ্ঞতাকে কতোটা বা আদৌ কাজে লাগাতে পারলাম কিনা বা বিবেচনায়ই নিলাম কিনা সেটা বহু মূল্যবান প্রশ্ন! আমার কাছে মনে হয় আমরা এগুলো থেকে তেমন কোন শিক্ষা নিতে বা কাজে লাগাতে পেরেছি বলে মনে হয় না, যা দুঃখজনক এবং সামপ্রতিক ঘোষিত চলমান লকডাউনের ক্ষেত্রেও সেটা লক্ষ্যনীয়!
১৮ এপ্রিল খবরে বলছে করোনা সংশ্লিষ্ট নির্দেশনাসমূহ মানুষ কিছুতেই মানছে না। লকডাউনও প্রত্যাশিতভাবে কর্যকরী হচ্ছে না। সরকার সর্বাত্মক লকডাউন ঘোষণা করলেও এটা কিছুতেই সর্বাত্মক হচ্ছে না- অভিমত বিশেষজ্ঞদের! সাধারণ মানুষও তাই মনে করছে! গার্মেন্ট ও ইন্ডাস্ট্রি, ব্যাংক ও শেয়ার মার্কেট খোলা রেখে লকডাউন হয় কিভাবে? শুধুমাত্র ব্যাংক সপ্তাহে ২-৩ দিনের জন্যে সীমিত সময়ের জন্যে খোলা রাখা যেত! খাবার ও নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যবসায়ীরা সময়সীমা মানছে না। মানুষও যেন ক্ষেপে গেছে! কিছুতেই ঘরে থাকছে না। প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে বের হচ্ছে। ঢাকা মহানগরীর বড় সড়কগুলিতে পুলিশের তত্পরতায় যানবাহন কিছুটা কম থাকলেও গোটা দেশে ঢিলেঢালা লকডাউন চলছে। মহল্লার ভিতরে ও বাজারে স্বাস্থ্যবিধিসমূহ মানা হচ্ছেনা- শারীরিক দূরত্ব বজায়তো রাখছেইনা, মাস্ক পারছেনা অনেকেই। প্রয়োজন কঠোর পদক্ষেপ। জরিমানা ও প্রয়োজনে জেলের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হোক। আর জনগনের কি কোন দায়ভার নেই? প্রয়োজন জনগনকে সম্পৃক্ত করা! পুলিশ প্রশাসনের পাশাপাশি মেয়রবৃন্দের তত্ত্বাবধানে কাউন্সিলরদের নেতৃত্বে ভলান্টিয়ার নিয়োগের মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি ও করোনা সংশ্লিষ্ট নির্দেশনাসমূহ মানতে বাধ্য করা যেতে পারে! সেটা নিঃসন্দেহে কাজ করবে আমার বিশ্বাস।
একদম খেটে খাওয়া চরম দরিদ্র ও নিঃস্ব জনগোষ্ঠীর জন্যে সরকারের বরাদ্দকৃত অব্যবহূত অর্থ পরিকল্পিত ও সুষ্ঠুভাবে বন্টনের ব্যবস্থা জরুরী ভিত্তিতে করা হোক। জরুরী গুরুত্বের সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলাযর সর্বাত্মক চেষ্টা করা হোক। প্রত্যেক জিলাসদর হাসপাতালে কভিড টেস্ট ও আইসিইউ-সহ প্রয়োজনীয় ডাক্তার-নার্স ও দক্ষ জনশক্তি নিয়োগ ও চিকিত্সার পর্যাপ্ত ব্যাবস্থা দ্রুত নিশ্চিত করা হোক! আগামী দুই মাসে দেশে করোনা আরো ২-৩গুন বৃদ্ধি পেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। আমরা কি ধারনা করতে পারছিনা কেমন ভয়াবহ অবস্থা হতে পারে! আমাদের কি জরুরী ভিত্তিতে আরো প্রস্তুতি বাড়ানো অত্যাবশ্যক নয়? জনসম্পৃক্ততাও বাড়ানো দরকার, তাহলে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে! ভালো খবর যে সরকারী হাসপাতালগুলোতে করোনার বেগ বাড়ানো হচ্ছে। আইসিইউ বাড়ানো হচ্ছে। ঢাকা সিটি কর্পোরেশন (উত্তর)- এর উদ্যোগে ১০০০ শয্যা বিশিষ্ট করোনা হাসপাতাল চালু হয়েছে, আইসিইউ বেডের সংখ্যা প্রায় দুই শতাধিক করা হয়েছে। এগুলো ভালো সংবাদ। তবে করোনা রোগীদের কার্যকর সেবা ও চিকিত্সা নিশ্চিত করতে হলে নিরবিচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনীয় দক্ষ ও প্রশিক্ষিত ডাক্তার, নার্স ও টেকনিক্যাল জনশক্তি নিশ্চিত করতে হবে। করোনার ভ্যাকসিনের ব্যাবস্থাপনা প্রসংশিত হয়েছে। এটা যাতে কোনভাবেই ব্যহত না হয় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। সমপ্রতি টীকার ঘাটতি নিয়ে উত্কণ্ঠায় সরকার। ফেব্রুয়ারি মাসের ২০ লাখ ও মার্চের পুরো ৫০ লাখ টীকা ভারত থেকে আসা এখনো অনিশ্চিত। এটা দ্রুত না আনতে পারলে পরিকল্পনা অনুযায়ী ২য় ডোজ যাদের প্রাপ্য হতে চলেছে তাদের টীকা দেয়া নিশ্চিত করা না গেলে তাদের উপর অন্যায্যতা করা হবে। সরকারকে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। আইন ও স্বাস্থ্য বিধির কঠোর প্রয়োগ করতে হবে। প্রয়োজনে পর্যাপ্ত জরিমানা ও জেলে পাঠাতে হবে। কঠোর লকডাউন ও স্বাস্থ্য বিধি মানার বিকল্প নেই। দুটো সমানভাবে কার্যকর করা না গেলে কাজ হবেনা। আর যেখানে সীমিতাকারে গার্মেন্ট-ইন্ডাস্ট্রি খোলা রয়েছে সেখানে কঠোর না হলে চলবে না। পরিস্থিতির ক্রমবর্ধমান অবনতি কোথায় পৌঁছাবে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। সুতরাং পরিকল্পিত ও সুসমন্বিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন ছাড়া উপায় নেই। কভিড নিয়ন্ত্রণ জাতীয় কমিটির পরামর্শ সর্বদা বিবেচনায় নিন ও সে অনুযায়ী সেবা প্রদান করুন। সুসমন্বিত পর্যাপ্ত কার্যক্রম ব্যতীত এ ভয়াবহ মহামারী প্রতিরোধ করা যাবে না।
উন্নয়ন গবেষক
smalauddin1964@gmail.com










