কভিড-১৯ মহামারী প্রতিরোধে বিশ্বের উন্নত অনেক দেশ যখন টিকা প্রাপ্তি নিয়ে অনিশ্চয়তায়, তখন সরকার ও নীতিনির্ধারকদের দূরদর্শিতা এবং বিচক্ষণতায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক টিকা প্রাপ্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। এ ধারাবাহিকতায় ফেব্রুয়ারি থেকে দেশে সূচনা হয় টিকাদান কর্মসূচি। ৫২ লাখেরও বেশি মানুষকে প্রথম ডোজ টিকা প্রদানে সক্ষম হয়েছে সরকার। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে দ্বিতীয় ডোজের শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। তবে চুক্তি অনুসারে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান টিকা সরবরাহ করতে না পারায় দ্বিতীয় ডোজ টিকা নিয়ে তৈরি হয়েছে এক ধরনের অনিশ্চয়তা। এদিকে দেশে নতুন করে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু দুটোই বেড়েছে। দেশে কভিড-১৯ পজিটিভ শনাক্তের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ছয় লাখের উপরে। এ অবস্থায় টিকা পাওয়ার অনিশ্চয়তা সমাধানে জোর তৎপরতা চালানো জরুরি।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই টিকা নিয়ে সংকট চলছে। ব্রিটেন ও ইউরোপের অন্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ভ্যাকসিন নিয়ে টানাপড়েনের জের ধরে ব্রিটেনে করোনার ভ্যাকসিন রফতানি বন্ধ করে দেয়ারও হুমকি দেয় জোট দেশগুলো। ভ্যাকসিন রফতানি নিয়ে চলমান সংকট সমাধানে ও নিজেদের মধ্যে সম্পর্কোন্নয়নে যৌথভাবে কাজ করছে ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। তেমনি ভ্যাকসিন নিয়ে সংকটে ভুগেছে কানাডা, জাপানসহ বিভিন্ন দেশ। গত নভেম্বরে কোভিশিল্ড টিকার তিন কোটি ডোজ কিনতে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি করে সরকার। চুক্তি অনুযায়ী দুই চালান টিকা পাওয়া এবং উপহারকৃত টিকার মাধ্যমে অনেক মানুষকে টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে দ্বিতীয় ডোজের টিকা প্রদান শুরুর কথা রয়েছে। অথচ আমাদের মজুদ রয়েছে ৪৯ লাখের কিছু বেশি টিকা। কেননা চুক্তির শর্ত অনুসারে মাসে ৫০ লাখ ডোজ টিকা আসার কথা থাকলেও মার্চে কেনা টিকার চালান না আসায় তৈরি হয়েছে এক ধরনের অনিশ্চয়তা। সংকটটি আরো ঘনীভূত হয়েছে টিকা রফতানিতে ভারতের স্থগিতাদেশ জারি করার মধ্য দিয়ে।

এদিকে যাদের প্রথম ডোজের টিকা দেয়া হয়েছে, তাদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজের টিকা যদি না দেয়া হয়, তাহলে তা কার্যকর হবে না। প্রথম ডোজ দেয়ার পর কোভিশিল্ড টিকার দ্বিতীয় ডোজ সাধারণত ৮ থেকে ১২ সপ্তাহের মধ্যে দিতে হয়। একই সময় নতুনদের প্রথম ডোজ টিকা প্রয়োগ কঠিন হয়ে যাবে। এ অবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিমাণে টিকার চালান নিশ্চিতের পাশাপাশি বিবেচনায় নিতে হবে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির বিষয়গুলো। আগে থেকেই যদি কয়েকটি সংস্থার সঙ্গে টিকাবিষয়ক চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়, তাহলে সংকটকালীন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।

টিকা প্রাপ্তির জন্য কেবল একটি উৎস নয়, বিকল্প উৎস অনুসন্ধান গুরুত্বপূর্ণ। চীনা কোম্পানি সিনোভ্যাক নভেল করোনাভাইরাসের যে টিকা উদ্ভাবন করেছে, বাংলাদেশের মানুষের দেহে তার পরীক্ষামূলক প্রয়োগের অনুমতি প্রদানের বিষয়টি ছিল সুবিবেচনাপ্রসূত। সিনোভ্যাককে তাদের রিসার্চ কাউন্সিল অনুমোদন দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল অনুমতি দেয়। এরপর তারা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরে ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যায়। অথচ পরবর্তী সময়ে সিনোভ্যাককে বাংলাদেশে ট্রায়াল করতে না দেয়ায় শুধু একটি উেসর টিকার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আমরা যদি সিনোভ্যাক ট্রায়ালের অনুমতি দিতাম তাহলে ভ্যাকসিন বিষয়ে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে থাকত।

আশার কথা, বাংলাদেশের গ্লোব বায়োটেক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন তৈরির অনুমতি পেয়েছে। পাশাপাশি আরো একটি বিষয়ে আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে। তা হচ্ছে ওষুধ শিল্পে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মেধাস্বত্ব সম্পর্কিত চুক্তির বিধিবিধান অনুযায়ী স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বৈধভাবেই অন্য দেশে উদ্ভাবিত কিছু ওষুধ স্থানীয়ভাবে বানাতে পারে। এ অবস্থায় অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন দেশীয়ভাবে উৎপাদনের বিষয়টি নিয়ে অগ্রসর হওয়ার উদ্যোগটি হবে সময়োচিত। তাছাড়া দেশের বেশ কয়েকটি বেসরকারি ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানির ভ্যাকসিন তৈরির সক্ষমতা আছে। ওই সুবিধা নিয়ে মার্কিন কোম্পানি গিলিয়াডের সায়েন্সেসের তৈরি করা রেমডিসিভির উৎপাদনও করেছে বাংলাদেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। তাছাড়া আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, যেসব কোম্পানি টিকা দিতে রাজি, তাদের সবাইকেই বাংলাদেশকে টিকা উৎপাদনের সুযোগ দিতে হবে—এ-বিষয়ক শর্ত দেয়া হয়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিষয়টি নিয়ে অগ্রসর হওয়া জরুরি।

কভিড-১৯ মহামারী মোকাবেলার অনেক কিছুই নির্ভর করছে টিকা প্রদান কর্মসূচি নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিচালনার ওপর। পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগগুলো সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নও জরুরি। সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব মেনে চলাসহ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের বিষয়টিকে কঠোর করতে হবে। তবে কভিড-১৯ মহামারী থেকে রক্ষা পাওয়ার ক্ষেত্রে টিকাই সর্বশেষ ভরসা হিসেবে কাজ করবে। তাই বাংলাদেশের সব মানুষের জন্য টিকার ব্যবস্থা করা অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত। আমাদের ঘনবসতির দেশ। জনসংখ্যা বিপুল। প্রতিটি মানুষের জন্য টিকার প্রাপ্যতা নিশ্চিতে বেশি মূল্যে বিপুলসংখ্যক টিকা কেনারও প্রয়োজন হতে পারে। সেজন্য পর্যাপ্ত তহবিল নিশ্চিতের বিষয়টিও জরুরি। একই সঙ্গে বিভিন্ন উৎস থেকে টিকা সংগ্রহে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে।