‘মানুষ মানুষের জন্য’—কথাটি অতি প্রচলিত একটি উক্তি এবং সমাজের নানা শ্রেণী ও পেশার মানুষের কাছে অতি পরিচিত। কথাটি যদি একটু ব্যাখ্যা করা যায়, এটি সাধারণ অর্থে সব মানুষের কথা বোঝানো হয়েছে। একজন মানুষ আরেকজন মানুষের আপদে-বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়বে। একে অন্যকে সহযোগিতা করবে এবং সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেবে—এটাই চিরাচরিত নিয়ম এবং একজন মানুষের মানবীয় গুণাবলির অংশ। মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব করা হয়েছে শারীরিক শক্তি বা উচ্চতার দিক বিবেচনা করে নয়, বরং মানুষের বিবেক, বুদ্ধি ও বিবেচনাপ্রসূত আচরণের জন্যই তাকে আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। একজন মানুষ হিসেবে অন্য মানুষের সঙ্গে সাধারণ এ আচরণ আরো বেশি তাত্পর্য বহন করে যদি এটা কোনো আত্মীয় বা অতি পরিচিত নিকটজনের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া হয়।

একটা মানুষ যখন পারিবারিক জীবন বা সংসার শুরু করে, তখন অতি কাছের আত্মীয় হয়ে যায় মা-বাবা, ভাই-বোন, ছেলে-মেয়ে, স্ত্রী, চাচা-চাচি, শ্বশুর-শাশুড়ি, খালা-খালু, ফুফু-ফুফা ইত্যাদি। এটা হচ্ছে একান্ত চক্রের আত্মীয়। এ ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তার অন্তরালে যৌতুক নামের ভাইরাস ঢুকে পড়েছে অনেক আগেই। তবে কালের আবর্তে এটি মহামারী আকারে রূপ নিয়েছে। সেই সঙ্গে সামাজিক এ ব্যাধি তার অতীতের অবয়ব বদলে ধারণ করেছে বহুরূপ। সাধারণত যৌতুক শব্দটা শুনলে আমাদের মাথায় পরিষ্কার যে ধারণা আসে সেটা হলো, মেয়েকে বিয়ে দেয়ার সময় পাত্র বা তাদের পরিবারের চাহিদা অনুযায়ী কিছু দেয়া। সমাজের তথাকথিত শব্দ অনুযায়ী ছেলেকে খুশি করতে হয়। একটা মেয়েকে তার পরিবার ২০-২৫ বছর ধরে সামর্থ্য অনুযায়ী লালন-পালন করে। তারপর অপরিচিত একটা ছেলের হাতে আদরের মেয়েটাকে তুলে দেয়া হয় বাকি জীবন সুখে-শান্তিতে থাকবে এ প্রত্যাশায়। এতে আমাদের প্রচলিত সমাজে পাত্র বা পাত্রের পরিবারের মন খুব একটা ভরে না। আর তাই খুশি করার জন্য বিভিন্ন ধরনের উপঢৌকন, যেমন টেলিভিশন, ফ্রিজ, ফার্নিচার, মোটরগাড়ি, স্বর্ণালংকার অথবা নগদ অর্থ প্রয়োজন। এসব উপঢৌকন যখন পাত্রপক্ষের দাবি থাকে বা বিয়ের শর্ত থাকে, তখন তাদের মনুষ্যত্ব যথেষ্ট প্রশ্নের মুখে পড়ে। একজন মানুষ যখন মানবীয় গুণাবলি হারিয়ে ফেলে তখন মনুষ্যত্ব কোথায় থাকে বা কীভাবে থাকে তা অনেকেরই বোধগম্য নয়। এই অযাচিত যৌতুক প্রথা, যা সমাজের প্রচলিত ভাষায় ‘খুশি করা’-কে কেন্দ্র করে কন্যার পিতাকে কখনো সুদের মতো ঋণের আবর্তে জড়াতে হয়। যাদের ঋণ করার সামর্থ্যও থাকে না, কন্যাদায়ে অনেকের দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা, যেমন স্ট্রোক বা এ-জাতীয় অসুখ এবং কখনো কখনো আত্মহত্যার মতো ঘটনাও লক্ষ করা যায়। এই হলো সাধারণ যৌতুকের কিছু কুফল।

এবার আসা যাক যৌতুকের অন্য রূপ বা ধরন নিয়ে। যৌতুকের মহামারী এখন আর সমাজের একটা অংশে আবদ্ধ নয়। যখন একটা অংশে শুরু হয়েছিল তখন আমরা সবাই হয়তো যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারিনি, ফলে গোটা জাতি আজ এ মহামারীতে আক্রান্ত। বর্তমান সমাজের বাস্তব চিত্র আমলে নিলে যৌতুকের প্রচলিত তিনটি রূপ মোটামুটি এ রকম—সাধারণ নিম্নবিত্ত পরিবারের যৌতুক চেয়ে নেয়া, উচ্চবিত্তদের উপহারের মোড়কে যৌতুক নেয়া এবং পাত্র/ছেলের পকেট কেটে যৌতুক নেয়া।

নিম্নবিত্ত পরিবারের যৌতুক চেয়ে নেয়ার অতিনগণ্য একটা উদাহরণ উল্লেখ করা হয়েছে। এবার আসা যাক উচ্চবিত্তদের উপহারের মোড়কে যৌতুক নেয়া বিষয়ে। সমাজের অনেক অল্পশিক্ষিত মানুষ হয়তো জ্ঞানের অভাবে বা বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক বাস্তবতায় যৌতুক চেয়ে নেয়। কিন্তু সমাজে কিছু তথাকথিত উঁচু শ্রেণীর যৌতুক নেয়াটা অত্যন্ত হাস্যকর নির্লজ্জতাও বটে। একটা বহুল প্রচলিত বাক্য ব্যবহার করে কনের পরিবারকে বলা হয় ‘আমার কিছু চাওয়ার নেই, আপনি খুশি হয়ে যা দেন।’ এক্ষেত্রে পাত্রের পরিবারের নিজে যেচে কিছু বলতে কিঞ্চিৎ কুণ্ঠাবোধ, যার জন্য ঘটকের সহায়তা নেয়া হয় এবং যৌতুকের খানিকটা উচ্ছিষ্ট ওই ঘটককে দেয়া হয়। একটা কথা না বললেই নয়, যদি পাত্রের বা পাত্রের পরিবারের কথা অনুযায়ী ‘আমার কিছু চাওয়ার নেই, আপনি খুশি হয়ে যা দেন’—এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে কনেপক্ষ প্রত্যাশিত কিছু হালুয়া-রুটি না দেয়, বিয়ের পর থেকে শ্বশুর-শাশুড়ি, ননদ, দেবর বা বরপক্ষের যেকোনো আত্মীয়-স্বজন থেকে বিভিন্ন রকম কটূক্তি কনেকে সহ্য করতে হয়। কিছুু ক্ষেত্রে এটার মাত্রা অনেক নিকৃষ্টতর হয়। একটা বাস্তব উদাহরণ দিই। এক ব্যক্তির দুই ছেলে বিয়ে করেছে। এক ছেলের শ্বশুরবাড়ি থেকে কোরবানির ঈদে গরু এসেছে, আরেক ছেলের শ্বশুরবাড়ি থেকে ছাগল এসেছে। ফলে ছাগল দেয়া বাবার মেয়েটাকে ছাগলটাসহ বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। এটি যে একটি মানবিক সমাজের মানুষের জন্য কত বড় লজ্জার, এ প্রশ্ন প্রিয় পাঠকের বিবেচনায় সমর্পণ করলাম।

এই গেল যৌতুকের অতি প্রচলিত দুটি রূপ বা ধরন। সম্প্রতি একটি নতুন ধরনের যৌতুকের আবির্ভাব হয়েছে—পাত্র বা বরের পকেট কেটে যৌতুক নেয়া। একটা ছেলে ২৫-৩০ বছর কষ্ট করে পড়াশোনা করে মা-বাবা, ভাই-বোনের প্রত্যক্ষ সহোযোগিতায় মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে বিয়ে করে। বিয়ের শুরুতে বিপাকে পড়তে হয় দেনমোহর এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক নিয়ে। বর্তমানে দেনমোহরটা অতি বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে  গেছে। দেনমোহরের একান্ত মর্মার্থ পরাভূত। উদাহরণস্বরূপ, দেনমোহরটা কনের বাবার সামাজিক মর্যাদার ওপর নির্ভর করে। সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি হলে তার মেয়ের বিয়েতে দেনমোহর অনায়াসে লাখ লাখ ধার্য করতে পাত্রপক্ষকে চাপাচাপি করে। দেনমোহর এরূপ নির্ধারণ কোনো সভ্য সমাজের উদাহরণের মধ্যে পড়ে না। এক্ষেত্রে ধর্মের বা সুস্থ সমাজের সব স্বাভাবিক নিয়ম অনুপস্থিত।

সমাজের প্রচলিত এসব জঘন্য রীতি ডিঙিয়ে বড় ধরনের আর্থিক সর্বনাশের মধ্য দিয়ে যখন বিয়ে হয় তখন শুরু হয় পকেট কাটার দ্বিতীয় পর্ব। বর যখন প্রতিষ্ঠিত হয়ে নিজের পরিবারের দিকে নজর দেয় তখন কনে/স্ত্রী নিজের পছন্দের লিস্ট হাতে তুলে দেয়। প্রতিষ্ঠিত বর কীভাবে কতটুকু কষ্ট করে আজকের অবস্থানে এল, সেটা তখন বিবেচনায় থাকে না। অধিকন্তু, বর যখন তার নিজের পরিবারকে কিছু দিতে উদ্যত হয়, তখন তাকে কনে বা তার পরিবারের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। সেই সঙ্গে কনের চাহিদা মেটানোর ফিরিস্তি লম্বা হয়। অথচ একজন পাত্রের বা ছেলের মা-বাবা বা ভাই-বোনের জন্য যেটা করবে সেটা দায়িত্ব। আর শ্বশুরবাড়ির জন্য যেটা হবে সেটা উপহার এবং উপহার কখনো জোর করে আদায় হয় না। যদি উপহার জোর করে আদায় হয়, সেটাও যৌতুকের তৃতীয় রূপ কিনা, এ প্রশ্ন সমাধানের ভারও প্রিয় পাঠকের ওপর ছেড়ে দিলাম। 

এবার আসা যাক এ মহামারী থেকে পরিত্রাণের কিছু উপায় সম্পর্কে। প্রথমত আমরা যারা সমাজে মানুষ হিসেবে বসবাস করি, সবার আগে আমাদের মানবীয় গুণাবলির অধিকারী হতে হবে। একজন মানুষ হিসেবে পরিবারের, সমাজের বা রাষ্ট্রের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা উপলব্ধি করতে হবে। সত্যিকারের মানুষ হতে হলে মানবীয় গুণাবলি নিজের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করার বিকল্প নেই এবং একজন সত্যিকারের মানুষ কখনই এ যৌতুকের মতো ন্যক্কারজনক, মানবতাবিরোধী, সমাজবিরোধী কাজ করতে পারে না। সেই সঙ্গে রাষ্ট্র বা সমাজের দায়িত্বশীলদের সবিনয়ে অনুরোধ করব খাদে পড়া এ সমাজকে অতি দ্রুত উদ্ধারের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে আর কোনো বাবা যৌতুকের চাপে বড় কোনো সর্বনাশে না পড়েন, যাতে আর কোনো মা যৌতুকের চাপে অশ্রু না ফেলেন, যাতে আর কোনো বোন যৌতুকের চাপে আত্মহত্যা না করেন, আর যাতে কোনো ভাই স্ত্রী বা পরিবারের চাহিদার চাপে দিশেহারা না হন। প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় যৌতুকবিরোধী সংগঠন গড়ে উঠুক, যারা সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় যৌতুকের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বে। সমাজকে এই ভয়াবহ অভিশাপ থেকে, এই কলংক থেকে মুক্ত করুক। সচেতন হোন, সচেতন করুন, মানবিকতার সমাজ গড়ে তুলুন।

 

ড. এসএম এমদাদ হোসাইন: সহকারী অধ্যাপক

ইউনিভার্সিটি অব নিজওয়া, ওমান