বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণের জন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারিভাবেও দেশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। যেগুলো দেশের জনগণের স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার জন্য প্রতিষ্ঠিত হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৮৫ শতাংশ বেসরকারি হাসপাতালে নেই লাইফ সাপোর্টের ব্যবস্থা। উন্নত ব্যবস্থা রয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ২৫ শতাংশ হাসপাতালে। জরিপে দেশের বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার যে করুণ চিত্র উঠে এসেছে, তা রীতিমতো ভয়াবহ। করোনার প্রাদুর্ভাব বেড়ে ওঠার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের বেশির ভাগ স্থানেই শয্যার ঘাটতি, অক্সিজেন-স্বল্পতাসহ আইসিইউ সংকটের বিষয়টি আলোচনায় আসে। স্বীকার করতেই হবে, করোনা আমাদের স্বাস্থ্য খাতের দৈন্যকেই তুলে ধরেছে। বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে এ খাতে বড় ধরনের সংস্কার কার্যক্রম হাতে নেয়া আবশ্যক।
বেসরকারি চিকিৎসাসেবা বলতে ব্যক্তিমালিকানাধীন নিবন্ধিত বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং রোগ নির্ণয় কেন্দ্র প্রদত্ত সেবাকে বোঝানো হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, সব অংশীদারের সমান সাড়ার অভাব, স্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে উদ্যোগ সত্ত্বেও এ খাতকে শৃঙ্খলায় আনা যায়নি। আইনি সীমাবদ্ধতা, বিদ্যমান যে আইন রয়েছে তা বর্তমান ব্যবস্থার সঙ্গে সংগতিপূর্ণভাবে হালনাগাদ না হওয়া, আইন ও নীতির প্রয়োজনীয় প্রয়োগ না হওয়া এবং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ, পরিদর্শন ও তদারকি কার্যক্রমে ঘাটতিসহ সরকারের যথাযথ মনোযোগের ঘাটতির কারণে বেসরকারি চিকিৎসাসেবা খাত নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে। ফলে অতিমুনাফাভিত্তিক বাণিজ্যিকীকরণের প্রবণতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সেবার অতিরিক্ত মূল্য আদায়সহ কিছু ব্যক্তির এ খাত থেকে বিধিবহির্ভূত সুযোগ-সুবিধা আদায়ের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। বিভিন্ন পর্যায়ে বিশেষ করে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের বেসরকারি চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোয় সক্ষমতার ঘাটতি ও অনিয়মের প্রবণতা অধিকতর লক্ষণীয়। অবকাঠামো, জনবল ও যন্ত্রপাতির ঘাটতিসহ সার্বিক সক্ষমতায় ঘাটতি থাকায় সেবাগ্রহীতারা সঠিক ও মানসম্পন্ন চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি আর্থিক ও স্বাস্থ্যগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। দেশের চিকিৎসাসেবার প্রতি আস্থা হারিয়ে সেবাগ্রহীতাদের বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে।
বেশির ভাগ বেসরকারি হাসপাতাল ও রোগ নির্ণয় কেন্দ্র নিবন্ধিত না হয়েই কার্যক্রম শুরু করে এবং দেশব্যাপী কতগুলো অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তার কোনো তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নেই। অধিক মুনাফা অর্জনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনেক সময় প্রসূতিকে সিজারিয়ান প্রসবে উদ্বুদ্ধ করার অভিযোগ রয়েছে। উচ্চমুনাফাভিত্তিক ব্যবসা হিসেবে বেসরকারি চিকিৎসাসেবা খাত বিকাশ হচ্ছে। এখানে তদারকির অভাব রয়েছে। সাধারণ মানুষ চিকিৎসাসেবা নিতে গিয়ে প্রতারিত হচ্ছে। বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাত নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি নিরপেক্ষ কমিশন গঠন করা দরকার। বেসরকারি খাত নিয়ন্ত্রণের জন্য বিধিমালা নেই। মান নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট তদারকি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক পরিদর্শনের তারিখ হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোকে আগেই জানিয়ে দেয়া হয় এবং সে অনুযায়ী এসব প্রতিষ্ঠান ওই নির্দিষ্ট দিনের জন্য জনবল ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র সঠিক রাখে। কিছু ক্ষেত্রে নবায়নের সব শর্ত পালনে ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও সর্বনিম্ন ৫০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়মবহির্ভূত অর্থ আদায়ের মাধ্যমে নিবন্ধন নবায়নের সুযোগ প্রদান করা হচ্ছে। অবহেলা ও ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় ভুক্তভোগীদের অভিযোগ করার কোনো আইন নেই।
মান উন্নয়ন এবং এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করা না গেলে স্বাস্থ্যসেবা দানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যসেবা নেবে না। সেই সঙ্গে দরকার জবাবদিহিতা। উন্নত বিশ্ব, এমনকি ভারতেও এখন সব হাসপাতাল ও ল্যাবের জন্য ন্যাশনাল অ্যাক্রেডিটেশন বডি ফর হসপিটাল (এনএবিএইচ) ও ন্যাশনাল অ্যাক্রেডিটেশন বডি ফর ল্যাবরেটরির (এনএবিএল) সার্টিফিকেট গ্রহণ বাধ্যতামূলক করে দেয়া হয়েছে। এ সার্টিফিকেট আবার প্রতি দুই বছর পর অডিটের মাধ্যমে নবায়ন করা হয়। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোয় প্রতিনিয়ত উন্নতি সাধন এবং মান নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা থাকে। এভাবে যখনই একটা ধারাবাহিক উন্নতির ব্যবস্থা থাকে তখন ভুল চিকিৎসা, অতিচিকিৎসা, বিনা চিকিৎসা, ম্যালপ্র্যাকটিস ইত্যাদি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এতে সাধারণ জনগণও বিড়ম্বনাহীন স্বাস্থ্যসেবা পেয়ে থাকে। পাশাপাশি ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীরাও তাদের মর্যাদা নিয়ে স্বাস্থ্যসেবা দিতে পারেন।
দেশে মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) বলে একটা সরকারি প্রতিষ্ঠান আছে। ভুল চিকিৎসা বা অপচিকিৎসা, ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীদের ম্যালপ্র্যাকটিস—এসব দেখার দায়িত্ব আসলে এই বিএমডিসির। কেউ অন্যায় করলে এমনকি তার রেজিস্ট্রেশন পর্যন্ত বাতিলের ক্ষমতা বিএমডিসিকে দেয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বিএমডিসি কখনই তার ওপর অর্পিত সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারেনি। তাদের মধ্যে সবসময়ই এক ধরনের নিষ্ক্রিয়তা দেখা গেছে। বিএমডিসি যদি সক্রিয় হয়, তারা যদি চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও হাসপাতালের কর্মকাণ্ডকে ঠিকভাবে মনিটরিং করতে পারে, সেক্ষেত্রে বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতে জবাবদিহিতা অনেকটাই বাড়তে পারে এবং এতে স্বাস্থ্যকর্মী ও ডাক্তারদের সম্মান নিশ্চিত হবে। আমরা বিশ্বের অন্য অনেক দেশের সাফল্যের দিকে তাকাতে পারি। ইউরোপ, আমেরিকার মতো ধনী দেশগুলোর দিকে তাকালে হবে না; বরং আমাদের মতো অর্থনৈতিক অবস্থার দেশ থেকেই কিন্তু শেখার অনেক কিছু আছে। যেমন কিউবা, রুয়ান্ডা কিংবা ভিয়েতনামের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বেশ ভালো। তারা সীমিত সামর্থ্য নিয়েও একটা গণমুখী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পেরেছে।
হাসপাতালগুলোর মান উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে গবেষণার বিষয়টিও। উন্নত দেশগুলোয় এটি অতিস্বাভাবিক একটা বিষয় হলেও স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা খাতে গবেষণা আমাদের দেশে হয় না বললেই চলে। শুধু আইসিডিডিআর,বির ওপর ভরসা করলে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন আরো উন্নত, সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা অসম্ভব। প্রতিটি চিকিৎসাশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গবেষণা এবং বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) বিভাগ থাকা আবশ্যকীয় করে দিতে হবে। সেই সঙ্গে এটিকে উৎসাহিত করতে রাষ্ট্রীয়ভাবে ট্যাক্সসহ অন্যান্য সুবিধা দেয়ার কথাও ঘোষণা করা যেতে পারে। প্রত্যাশিত ফল পেতে হলে বেসরকারি স্বাস্থ্য খাত নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। উন্নতির ধারা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি বাড়াতে হবে এর গ্রহণযোগ্যতা ও সহজলভ্যতা। নিশ্চিত করতে হবে এ খাতের জবাবদিহিতা।










