দিন
যায়, প্রজন্ম
বদলায়, রাষ্ট্র
পরিচালনা বদলায়,
সবকিছু বদলায়।
লোকের ধ্যান-ধারণায়
পরিবর্তন আসে।
গ্রামের লোকেরা
একেই ভিন্নভাবে
বলে। তারা
বলে, ঈশ্বর
পাহাড়কে দরিয়া
করে, দরিয়াকে
পাহাড় করে,
বাদশাহকে ফকির
করে, ফকিরকে
বাদশাহ। প্রধানমন্ত্রী
শেখ হাসিনার
ভারত সফর
এ কথাই
স্মরণ করিয়ে
দেয়। আমাদের
প্রধানমন্ত্রী, ভারতের
প্রধানমন্ত্রী দুজনেই
বৈঠক শেষে
সহযোগিতার কথা
বলেছেন, সাধারণ
শত্রুর কথা
বলেছেন, উন্নয়ন-উন্নতির
কথা বলেছেন,
বিনিয়োগের কথা
বলেছেন। বলেছেন
বাণিজ্যের কথা,
আন্তঃদেশীয় যোগাযোগ
বৃদ্ধির কথা।
দুই দেশের
ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা
কীভাবে পারস্পরিক
ব্যবসা-বিনিয়োগ
বাড়ানো যায়
তার কথা
বলেছেন। সীমান্ত
হত্যা বন্ধের
কথা বলেছেন,
জল বণ্টনের
কথা বলেছেন।
এককথায় দুই
প্রতিবেশী দেশের
মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ
সম্পর্ক কীভাবে
গভীর করা
যায়, তার
অঙ্গীকার ব্যক্ত
করেছেন। আমাদের
প্রধানমন্ত্রী তার
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার
কথা বলেছেন।
মুক্তিযুদ্ধে ভারতের
অবদানের কথা
বলেছেন। সাতটি
সহযোগিতা চুক্তি
সই করেছেন।
দুর্দিনে তিনি
ভারতের কাছ
থেকে যে
ব্যক্তিগত সহমর্মিতা
পেয়েছেন তার
কথা উল্লেখ
করেছেন। অনেক
কথা, অনেক
অঙ্গীকার, অনেক
আশাবাদ। প্রশ্ন
এসব কি
১৯৭৫-পরবর্তী
সময়ে বলা
সম্ভব ছিল?
তখন কি
এসব কথা
বলার পরিবেশ
ছিল? নিশ্চয়
নয়। অথচ
আজ বলা
যাচ্ছে। মাঝখানে
সময় পেরিয়ে
গেছে ৫০-৫১
বছর। পাঁচ
দশক, চার
যুগের ওপর।
যে কথা
৫ দশক
আগে বলা
হতে পারত,
তা আজ
বলা যাচ্ছে।
কত পরিবর্তন। দুনিয়াজুড়ে পরিবর্তন। তখন ছিল পুঁজিবাদী বিশ্ব, সমাজতান্ত্রিক শিবির আর শিল্প অর্থনীতির দেশগুলো। ছিল জোটনিরপেক্ষ দেশ। বাজার অর্থনীতির কথা খুব কমই শোনা যেত। আজ দুনিয়া ভরা বাজার অর্থনীতির কথা। সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব খতম। চীন ও রাশিয়াও বাজার অর্থনীতির দেশ। এখন সর্বত্রই জিডিপি, প্রবৃদ্ধি, উন্নয়ন, বিনিয়োগের কথা। দারিদ্র্য নিরসন, শিক্ষার হার, শিশুমৃত্যুর হার, মাতৃমৃত্যুর হার এসব বহুল চর্চিত বিষয়। একমুখী বিশ্ব অর্থনীতির দিক থেকে; কিন্তু রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দিক থেকে আবার দুই শিবিরে বিভিক্ত হতে চলেছে বিশ্ব। কভিড-১৯-এ ক্ষতিগ্রস্ত বিশ্ব হচ্ছে এখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের শিকার। বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি, সরবরাহ বিভ্রাট, তেল-গ্যাসের সংকট, খাদ্য সংকট, রাষ্ট্রীয় দেনার সংকট। বহু দেশ মুখ থুবড়ে পড়ছে। সবারই চোখে-মুখে অন্ধকার। আগামী দিন নিয়ে সবাই আশঙ্কাগ্রস্ত। জ্বালানি তেল, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য, খাদ্যশস্য নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত সবাই—আমরাও। বাংলাদেশ-ভারত শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে এসব ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। টালমাটাল সময়ে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এসেছে। বিশাল পরিবর্তন—মনোজাগতিক, মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন। বিশ্ব পরিস্থিতির পরিবর্তন, আঞ্চলিক পরিবেশের পরিবর্তন ব্যতীত এটি সম্ভব ছিল না। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে আমরা ছিলাম অনুন্নত দেশ। এখন আমরা উন্নয়নশীল দেশ, মধ্যবিত্ত দেশ। এখন মানুষের মধ্যে চিন্তা-চেতনার পরিবর্তন হয়েছে। নতুবা বাংলাদেশ-ভারত এত খোলামেলা সম্পর্ক সম্ভব ছিল না। এ কথা স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ের কথা মনে করলেই বোঝা যাবে। ১৯৭৫-পরবর্তী কথা একটা— ‘ভারত সব নিয়ে যাচ্ছে’, চোরাচালান হচ্ছে দেদার। ভারত আমাদের প্রতিযোগী দেশ। ভারত পাট, পাটজাত দ্রব্য, চা, চামড়া রফতানি করে, আমরাও তাই। অতএব কোনো সহযোগিতা নয়। প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে হবে। ‘গঙ্গার জল’ বড় ইস্যু। ‘ফারাক্কা বাঁধ ভেঙে দাও’ তখন বড় স্লোগান। ভারত বিরোধিতা ঘরে ঘরে। এটাই হয়ে ওঠে রাজনীতি। এমনকি যখন ‘সার্ক’ (দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার সংগঠন) গঠিত হয়, তখন এর বিরোধিতা। আমার মনে আছে সার্ক গঠনের আগে যত আলোচনা সভা হয়েছে, সর্বত্র তখন এর বিরোধিতা। একটি ইংরেজি সাপ্তাহিকের কাজই ছিল এর বিরোধিতা করা। পরে ‘সার্ক’ হয়। কাজও হয় কিছু। কিন্তু সার্কভুক্ত বড় দুটি দেশের মতভিন্নতার কারণে তা এগোয়নি। অবশ্য এরই মধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ‘সাব-রিজিওনাল ডেভেলপমেন্ট’ বা ত্রিকোণ সম্পর্কের কথা বলতে শুরু করে। অর্থাৎ বাংলাদেশ-ভারত, নেপাল ও ভুটানের মধ্যে সহযোগিতা। পাকিস্তানও ধীরে ধীরে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ঘেঁষতে থাকে। পরে চীনের বন্ধু হিসেবে। অথচ পাকিস্তান না মধ্যপ্রাচ্যের দেশ, না দক্ষিণ এশীয় দেশ। তার অবস্থান ও রাজনীতি অভিনব। এ অঞ্চলের দিকে তার নজর অনুকূল—এ কথা বলা যাচ্ছে না।
এমন একটা
বেড়াজাল ভেঙে
বাংলাদেশ-ভারত
সম্পর্ক আজ
এক নতুন
উচ্চতায়। এর
কৃতিত্ব বর্তমান
প্রধানমন্ত্রী শেখ
হাসিনার। বাংলাদেশ
আজ একটা
শক্ত অর্থনৈতিক
ভিত্তির ওপর
দাঁড়িয়ে। অর্থনৈতিক
উন্নয়ন এবং
মানবিক সূচকে
বাংলাদেশ বেশ
এগিয়ে। রেমিট্যান্স,
তৈরি পোশাক
রফতানি এবং
কৃষির উন্নয়ন—এ
তিনটি এখন
আমাদের অর্থনীতির
মূল ভিত্তি।
এক থেকে
দেড় কোটি
বাংলাদেশী বিদেশে
কর্মরত। দুনিয়ার
এমন কোনো
দেশ নেই,
যেখানে বাংলাদেশীরা
নেই। যদিও
রাশিয়া-ইউক্রেন
যুদ্ধ আমাদের
সাময়িকভাবে স্থিরাবস্থায়
ফেলে দিয়েছে
তবু বিনিয়োগ,
বেসরকারি বিনিয়োগ,
বেসরকারি ঋণ
বৃদ্ধি, উৎপাদন
শক্তি বৃদ্ধি
ইত্যাদি উপাদান
আমাদের আশার
আলো দেখাচ্ছে।
এ জায়গাতেই
বাংলাদেশ-ভারত
ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার
প্রয়োজনীয়তা। এই
প্রয়োজনীয়তার কথা
আমাদের প্রধানমন্ত্রী
এবং ভারতীয়
প্রধানমন্ত্রী বারবার
উল্লেখ করেছেন।
দৃশ্যমান যে
দুই প্রধানমন্ত্রীর
মধ্যে একটা
চমত্কার ‘ওয়ার্কিং
রিলেশনশিপ’ গড়ে
উঠেছে, যা
বহুদিন ধরেই
কাম্য ছিল।
এ দুজনের
ঐকান্তিক চেষ্টায়
সীমান্ত চুক্তি
সাধিত হয়েছে,
যা ছিল
একটা বড়
‘লিগ্যাসি’।
দীর্ঘদিন ধরে
দুই দেশের
হাজার হাজার
সীমান্তবাসী জানত
না তারা
কোন দেশের
নাগরিক। পার্বত্য
চট্টগ্রামের সমস্যার
নিরসন হয়েছে,
গঙ্গার জল
চুক্তি বা
ফারাক্কা চুক্তি
হয়েছে। আমাদের
সক্রিয় সহযোগিতায়
ভারতের পূর্বাঞ্চলে
এখন পূর্ণ
শান্তি বিরাজ
করছে। তারা
উন্নয়নের দিকে
নজর দিতে
পারছে। দুই
দেশের মধ্যে
আন্তঃদেশীয় যোগাযোগ
বহুলাংশে বৃদ্ধি
পেয়েছে। ১৯৬৫
সালে সংঘটিত
ভারত-পাকিস্তান
যুদ্ধের সময়
বন্ধ হয়ে
যাওয়া সব
আন্তঃদেশীয় রেল
ও সড়ক
যোগাযোগ স্থাপিত
হয়েছে। হচ্ছে।
এতে দুই
দেশের অর্থনীতি
একটা শক্ত
সহযোগিতার ভিত্তির
ওপর দাঁড়াচ্ছে।
ঢাকা-কলকাতা,
ঢাকা-জলপাইগুড়ি,
ঢাকা-আগরতলা
রেল ও
সড়ক যোগাযোগ
স্থাপিত হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর
এখন ভারত
ব্যবহার করতে
পারছে। আমরা
বিনা শুল্কে
পণ্য পাঠাতে
পারব নেপাল
ও ভুটানে।
যোগাযোগের এ
সহযোগিতা দুই
দেশের উন্নয়নে
কাজে লাগছে।
ভারত শুল্কমুক্ত
সুবিধা দিয়েছে
শতাধিক বাংলাদেশী
পণ্যের ওপর।
আমাদের তৈরি
পোশাক উৎপাদনের
পরিমাণ অনেক
বৃদ্ধি পেয়েছে।
পূর্ব ভারতে
আমাদের রড,
লোহা, সিমেন্ট,
ওষুধ, খাদ্যবস্তু
ইত্যাদি রফতানি
হয়ে যাচ্ছে।
বস্তুত পূর্ব
ভারতীয় সাতটি
রাজ্য, বাংলাদেশ,
মিয়ানমার দিয়ে
শুরু করে
ওই অঞ্চলে
বিশাল এক
অর্থনৈতিক অঞ্চল
গড়ে তোলা
যায়। চীন
এতে অংশগ্রহণ
করতে পারে।
ভিয়েতনাম, লাওস
ও কম্বোডিয়া,
থাইল্যান্ডকে যোগ
করে যে
অঞ্চল গঠিত
হতে পারে,
তার সম্ভাবনা
আকাশচুম্বী। এতে
অর্থনৈতিক উন্নয়ন
তো হবেই,
নিরাপত্তা ইস্যুরও
সমাধান হবে।
পশ্চিম ভারত,
পশ্চিমবঙ্গ ইত্যাদি
অঞ্চলের জিনিসপত্র
পূর্ব ভারতে
বাংলাদেশের জমিনের
ওপর দিয়ে
গেলে আমরাও
লাভবান, ভারতও
লাভবান। অবশ্য
এখানে বাংলাদেশের
নিরাপত্তা ইস্যু
ভারতকে শতভাগ
গ্যারান্টি দিতে
হবে। যাতে
বাংলাদেশের মনে
কোনো প্রশ্ন
না জাগে।
ইস্যুটি বেশ
স্পর্শকাতর এবং
এতে জড়িত
অনেক মনোজাগতিক
সমস্যা। আমাদের
তিনদিকে ভারত,
দক্ষিণ দিকে
বঙ্গোপসাগর। এখানে
একটা মনোজাগতিক
সমস্যার সৃষ্টি
হয়ে আছে।
অনেকের মনে
ধারণা এতে
ভারত সুবিধাজনক
অবস্থানে। আবার
ভারতীয়দের মনেও
একটা ‘মনের
বাঘ’ আছে। বাংলাদেশ
মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ
একটি দেশ।
১৬-১৭
কোটি লোক
এখানে। পূর্ব
ভারত, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান
অধ্যুষিত অঞ্চল।
রয়েছে আদিবাসী, মূল
নিবাসী ও
বহিরাগত সমস্যা।
অনেক ভারতীয়
মনে করে,
বাংলাদেশ থেকে
কিছু লোক
ওইসব অঞ্চলে
গেলেই ‘ডেমোগ্রাফিক
ইনভেশন’ ঘটতে
পারে। ভারতে
এটি একটা
বড় প্রশ্ন,
যা নিয়ে
হরদম রাজনীতি
হচ্ছে। দেখা
যাচ্ছে উভয়ের
মধ্যেই ‘মনের
বাঘ’ কাজ
করছে। অথচ
উভয়ই মনে
করে দুই
দেশের মধ্যে
ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক
দরকার। পারস্পরিক
বিনিয়োগ বাড়ানো
দরকার। একজনের
বাজার আরেকজনের
কাছে উন্মুক্ত
করা দরকার।
এ প্রেক্ষাপটেই
কথা উঠেছে
কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক
ফ্রেমওয়ার্কের। দেখা
যাচ্ছে, আমাদের
ব্যবসায়ী ও
শিল্পপতিরা এ
ব্যাপারে উৎসাহী।
২০-৩০-৪০
বছর আগে
তা ছিল
না। আমাদের
ব্যবসায়ীরা ধীরে
ধীরে ধনী,
অতিধনী হয়েছেন।
সিঙ্গাপুরের শ্রেষ্ঠ
ধনীর তালিকায়
আমাদের ব্যবসায়ীরাও
আছেন। টাকা-পয়সা-ধনদৌলত
ও অভিজ্ঞতায়
আমাদের ব্যবসায়ীরা
এখন অনেক
বেশি ‘সাবালক’।
প্রতিযোগিতার ভীতি
বেশ কম।
ভারতীয় ব্যবসায়ীদের
সঙ্গে বেশি
উদ্যোগ হচ্ছে,
হওয়ায় অনেক
সম্ভাবনাও দেখা
দিয়েছে। এটাই
আমার কথা।
আমাদের প্রধানমন্ত্রী
শেখ হাসিনা
ভারতীয় ব্যবসায়ীদের
এখানে বিনিয়োগ
করতে উৎসাহিত
করেছেন। বড়
বড় গ্রুপ,
ভারতীয় ধনীরাও
এতে উৎসাহ
দেখাচ্ছেন। মিডিয়া
এখন অনেক
অনুকূল। সবাই
উন্নয়ন ও
সহযোগিতার প্রশ্নে
উদার দৃষ্টিভঙ্গি
পোষণ করে।
মানুষের মধ্যেও
অতীতের মতো
অন্ধ বিরোধিতা
অনেক কম।
বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেও
বিরোধী শক্তি
দুর্বল। প্রকৃতপক্ষে
বাংলাদেশ ও
ভারত যদি
সহযোগিতার মাধ্যমে
উপকৃত হয়,
তাহলে অনেক
কাজ করা
সম্ভব। এখন
উভয় দেশের
মধ্যে বাণিজ্যের
পরিমাণ ১৮
বিলিয়ন ডলার।
আমাদের আমদানিই
বেশি, রফতানি
কম। এ
জায়গায়ই একটা
সমতা না
হোক ব্যালান্স
সাধন করতে
হবে। আমরা
আমদানির জন্য
চীন ও
ভারতের ওপর
নির্ভরশীল। আর
রফতানির জন্য
আমেরিকা ও
ইউরোপের ওপর
নির্ভরশীল। এই
কাঠামো ভাঙতে
হবে। এর
মধ্যেই বাংলাদেশ-ভারত
ভবিষ্যৎ বাণিজ্য
ও বিনিয়োগের
প্রশ্ন উঠবে।
ড. আর এম
দেবনাথ: অর্থনীতির বিশ্লেষক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক










