১৯৪৭ সালের সাম্প্রদায়িক বিভাজনের কিছু সময় পর তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিল, পাকিস্তান রাষ্ট্র কখনই বাঙালিদের জন্য কল্যাণকর হয়ে উঠবে না; হয়ওনি। সংখ্যার দিক থেকে বাঙালিরা বেশি থাকলেও পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাঙালির সংস্কৃতিকে আঘাত করতে এর শিকড় ‘ভাষা’কে আক্রমণ শুরু করে। বায়ান্নর একুশ—প্রতিটি বাঙালিই সেদিন হয়ে উঠেছিলেন বাংলা অক্ষরের পাহারাদার। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক সব বৈষম্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন তারা। একুশে ফেব্রুয়ারি—বাঙালির আত্মপরিচয়ের চেতনা থেকে উৎসারিত একটি দিন।
বায়ান্ন থেকে বাইশ—সুদীর্ঘ সাত দশকে জাতি হিসেবে আমাদের অর্জন অনেক, যার বুনিয়াদ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে। শুধু ভাষা নয়, এ লড়াই ছিল শিক্ষা-স্বাস্থ্য-কৃষি-রাজনীতি-বাণিজ্য-প্রশাসনিক বৈষম্য-বঞ্চনার বিরুদ্ধেও। কেননা পূর্ব বাংলার সঙ্গে পাকিস্তানি শাসকরা প্রথম থেকেই বৈষম্যমূলক নীতি গ্রহণ করে। পূর্ব বাংলা ছিল প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। আয়তনে বড় হলেও অধিকাংশ অনুর্বর অঞ্চল নিয়ে গঠিত পশ্চিম পাকিস্তানে কৃষির সম্ভাবনা ছিল ক্ষীণ। অন্যদিকে পূর্ব বাংলায় রফতানি পণ্য হিসেবে পাট, চা ও চামড়ার জোগান ছিল বেশি। প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্যের কারণে পূর্ব বাংলা অর্থনৈতিক দিক থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ ছিল। কিন্তু কৃষি উন্নয়নের জন্য যে ঋণ পাওয়া যেত তার সিংহভাগই ব্যয় করা হতো পশ্চিমে। ১৯৫৫ সালে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অবস্থার ওপর পরিচালিত জরিপ অনুসারে, ১৯৪৭ সালে সিন্ধু অঞ্চলে শতভাগ জমিসহ পশ্চিম পাকিস্তানের প্রায় ৭৯ শতাংশ কৃষিজমিকে সেচের আওতায় আনা হলেও পূর্ব পাকিস্তানে মাৎর ১ দশমিক ৫৮ শতাংশ কৃষিজমিতে সেচ ব্যবস্থা ছিল। ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে আধুনিক কৃষিযন্ত্র সরবরাহ বা তৈরি করা না হলেও পশ্চিম পাকিস্তানে ১৯৪৬ সাল থেকেই ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ করা হতো।
মূলত পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাংলাকে সমৃদ্ধ করার পরিবর্তে দেশের মানুষকে বঞ্চিত করে এ দেশের সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানে নিতেই তত্পর ছিল। পুরো পাকিস্তানের আয়ের ৬০ ভাগ আয় হতো পূর্ব পাকিস্তানের রাজস্ব থেকে। অথচ এ অঞ্চলে এর মাৎর ২৫ ভাগ ব্যয় করা হতো। শিল্পের কাঁচামাল পূর্ব পাকিস্তানে উত্পন্ন হলেও বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে থাকে পশ্চিম পাকিস্তানে। পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক এ ধরনের শোষণমূলক নীতি অনুসরণের ফলে পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য চরম আকার ধারণ করে। তার কিছু উদাহরণ যেমন, ১৯৫৩ সালে পূর্ব পাকিস্তানের তুলনায় পশ্চিম পাকিস্তানে ২২ গুণ বেশি বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। ১৯৫০-৫১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে লবণ সংকটের সময় পাকিস্তান সরকারের লবণ নিয়ন্ত্রণ আইন ভারত থেকে পণ্যটির আমদানি নিষিদ্ধ করে। বিপরীতে করাচি থেকে উৎপাদিত লবণ কিনতে বাধ্য করা হয়। পাকিস্তান সরকারের এ ধরনের পদক্ষেপ বাজারে লবণের মূল্য ২০০ গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মধ্যেও দামের পার্থক্য থাকত, যাতে তা বাঙালিদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে থাকে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় প্রতিটি জেলায় খাদ্য সংকট হয়েছিল। সিলেটে যা প্রায় দুর্ভিক্ষের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। পাকিস্তান সরকার কৃষকদের ধান কম দামে বিক্রিতে বাধ্য করলেও ক্ষুধার্ত জনগণকে সাশ্রয়ী মূল্যে চাল দিতে ব্যর্থ হয়।
বাঙালিদের অশিক্ষিত রেখে তাদের শাসনকে পাকাপোক্ত করতে চেয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। শিক্ষা ক্ষেত্রেও বাঙালিরা সুস্পষ্ট বৈষম্যের শিকার হয়েছে। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য বিভিন্ন বৃত্তির সিংহভাগ সুবিধা দেয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানিদের। পূর্ব বাংলায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও আনুপাতিক হারে বিদ্যালয় সংখ্যা বাড়েনি। কৃষি, চিকিৎসা, বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা কেন্দ্রের বেলায় ১৬টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৩টিই অবস্থিত ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। চাকরি ও নিয়োগের ক্ষেত্রেও পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য প্রকটভাবে লক্ষ করা যায়। সিভিল, মিলিটারি ও অন্যান্য চাকরির মূল নিয়োগদানের কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। ফলে নিজেদের মতো করে নীতিনির্ধারণ করা সহজ হতো। প্রশাসনিক বৈষম্য, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য, রাজনৈতিক বৈষম্যের কারণে ক্রমে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। সরকারের অর্থনৈতিক ও পরিকল্পনাগত বৈষম্যের কারণে পূর্ব পাকিস্তান প্রথম থেকেই বঞ্চনার শিকার হয়। বাঙালি জাতিসত্তাকে ধ্বংস করে দেয়ার চূড়ান্ত রূপ হিসেবেই বাংলা ভাষার ওপর আঘাত হানার প্রস্তুতি নেয় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। বাংলা ভাষার ওপর আক্রমণের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা প্রতিরোধ আন্দোলনের কেন্দ্র হয়ে ওঠে, যা
স্বাধীনতার লড়াইয়ে পরিণতি পায়। তাই বায়ান্নর একুশ শুধু ভাষা নয়, অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক বৈষম্য-বঞ্চনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আহ্বান।
আজ জাতি হিসেবে আমাদের অর্জন অনেক। সমৃদ্ধি, উন্নয়নে আমাদের সমপর্যায়ের অন্য অনেক দেশকে পেছনে ফেলেছি। কিন্তু শিক্ষা-স্বাস্থ্য-সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য মেটাতে আমরা কতটা সফল হয়েছি তা পুনঃবিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। কভিড-১৯ পরিস্থিতি অন্যান্য সামাজিক সূচকে আমাদের অগ্রগতির ধারাবাহিকতাতেও খানিকটা ছেদ পড়েছে। দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। বাড়ছে শ্রেণীবৈষম্যও। কৃষকের কাছে পণ্যের ন্যায্যমূল্য পৌঁছাচ্ছে না। ধনীরা ক্রমে বিত্তশালী হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে অস্থিরতা বিদ্যমান। বেকারত্ব বাড়ছে। এসব সমস্যার সমাধান জরুরি।
তাছাড়া আজও আমরা মাতৃভাষাকে শিক্ষার বাহন করতে পারিনি। বিভিন্ন স্তরে বাংলা ভাষা আজ অবহেলিত। বিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র, প্রকৌশলসহ বহু বিষয়ে বাংলায় পাঠ্যপুস্তক রচনা করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশের শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও ব্যাংক-বীমা প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিনের কার্যক্রম সম্পাদন হচ্ছে ইংরেজি ভাষায়। অথচ ১৯৯৯ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি লাভের পর বিশ্বের প্রায় সব দেশ দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদযাপন করে মাতৃভাষার মর্যাদার স্মারক হিসেবে। প্রতিটি ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় আজকের দিবসটি তাত্পর্যপূর্ণ। প্রত্যাশা থাকবে, বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের প্রায় হারিয়ে যাওয়া ভাষাগুলো সংরক্ষণে ইউনেস্কো কার্যকর উদ্যোগ নেবে। একই সঙ্গে সক্রিয় হবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট। বাংলা ভাষার পাশাপাশি একই সঙ্গে দেশের অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতি-গোষ্ঠীর ভাষার বিষয়টিও প্রাধান্য দিতে হবে। কারণ ভাষার সঙ্গে জাতি-গোষ্ঠী, অঞ্চল, অর্থনীতি জড়িত। আর অর্থনৈতিক উন্নতি, উন্নয়ন সম্ভাবনা ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে মাতৃভাষার গুরুত্ব অনুধাবন জরুরি।










