বাংলাদেশে যখন ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে, তখন আমিও আমার বড় ভাইদের সঙ্গে কুমিল্লায় মিছিল-মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করি। বয়সে আমি তখন ছোট হলেও ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’/ ‘নুরুল আমীনের কল্লা চাই’ বলে সেদিন যেসব স্লোগান দিয়েছিলাম, তা আমার আজও মনে পড়ে। যে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের কথা বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে উল্লেখ করেছেন, সেই মহান মানুষটির সঙ্গে আমারও কিছুটা সখ্য ছিল। আমি আমার শৈশবে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের অসামান্য স্নেহ-ভালোবাসা পেয়েছি। তার কাছ থেকে অনেক কিছু পেয়েছি, তবে সেসব কিছু আজ মনে না থাকলে তার Gandhi’s
letters to Tagore বইটি উপহারের কথা কোনো দিন ভুলব না। তিনি আমাকে মর্নিংওয়াকে নিয়ে যেতেন। মর্নিংওয়াকের ফাঁকে ফাঁকে অনেক গল্প শুনিয়েছেন এবং বই পড়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন। তার মতো দেশপ্রেমিকের সাহচর্য আমি দীর্ঘদিন পেয়েছি, এটা আমার পরম সৌভাগ্য।
আমি নিজেকে এ কারণে ভাগ্যবান মনে করি যে বাংলাদেশের অধিকাংশ ভাষাসৈনিকের সঙ্গেই আমি ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশা করার সুযোগ পেয়েছি। আমি বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীন আহমদের স্নেহ পেয়েছি। আবদুল মতিন, গাজীউল হকের সাহচর্য পেয়েছি। সাহচর্য ও বন্ধুত্ব পেয়েছি ড. রফিকুল ইসলাম ও আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর। কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরী, এমনকি কবি আলাউদ্দিন আল আজাদও আমার ভীষণ প্রিয় মানুষ।
একুশে ফেব্রুয়ারি আজ ইউনেস্কো ঘোষিত ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে’র মর্যাদা পেয়ে আমাদের গৌরব শিখাকে উজ্জ্বল করেছে বটে, কিন্তু এখনো বাংলাদেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন হয়নি দেখে খুব বেদনা বোধ করি। বঙ্গবন্ধু সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বত্র বাংলা ভাষা প্রচলনের জন্য কঠিন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ভাষাবিজ্ঞানী না হয়েও বাংলা ভাষার সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেভাবেই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।
১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান স্বাধীন হলে বঙ্গবন্ধু কলকাতা থেকে ঢাকা শহরে এসে রাজনীতি শুরু করেন। পূর্ব বাংলার সূর্যসন্তান শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন পাকিস্তানের কাছে এমন একটি সমাজ কাঠামো প্রত্যাশা করেছিলেন, যেখানে কোনো শোষণ-বঞ্চনা থাকবে না, একজন মানুষ কোনো কারণে আরেকজন মানুষকে জুলুম-নিপীড়ন করবে না, কিন্তু সদ্য স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার পরেই পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকরা পূর্ব বাংলার (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) জনগণের ওপর দমন-পীড়ন শুরু করেন। আহমদ রফিক যথার্থই বলেছেন,
‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনই ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রথম সরব প্রকাশ। পুরনো সম্প্রদায়ভিত্তিক অনুভব থেকে এর উদ্ভব হলেও এ অনুভবের মধ্য দিয়ে ক্রমে বাঙালি মুসলমানদের অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদে উত্তরণ সম্ভব হয়েছে।’
১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের শাসকরা ‘রাষ্ট্রভাষা’ বিতর্ক উসকে দিয়ে বাংলা ভাষাকে বাংলার মানুষের মুখ থেকে কেড়ে নেয়ার অপচেষ্টা করেন। ১৯৪৮ সালেই বাংলা ভাষাকে মর্যাদাসীন করার জন্য গণপরিষদ সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাকিস্তানি শাসকচক্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমির এক সভায় বঙ্গবন্ধু বলেন,
‘১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা প্রস্তাব করলে কোনো মুসলমান গণপরিষদ সদস্য তার প্রতিবাদ জানাননি। এর প্রতিবাদ করেছিলেন একজন হিন্দু, তিনি কুমিল্লার ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। এর সাথে ছিল ছাত্রদের প্রতিবাদ।’
১৯৪৮ সালে যখন বাংলাকে হটিয়ে উর্দু ভাষা চাপিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র করা হয়, শেখ মুজিব তখন ২৮ বছরের টগবগে যুবক। সদ্য কলকাতা থেকে ঢাকায় আসা শেখ মুজিব সাংগঠনিকভাবে কিছুটা দুর্বল হলেও ধীরে ধীরে তিনি প্রতিবাদের শক্তি সঞ্চয় করেন। ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ (বর্তমানে আওয়ামী লীগ) গঠিত হওয়ার ফলে সাংগঠনিকভাবে বাঙালি তাদের ন্যায্য দাবিদাওয়া আদায় করার প্লাটফর্ম খুঁজে পায়। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব পুনর্ব্যক্ত করলে বাংলার আপামর জনতা প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। কার্জন হলে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বক্তৃতা ছাত্ররা প্রত্যাখ্যান করলে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। শুরু হয় রাষ্ট্রভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। শেখ মুজিব ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার কারণে কারারুদ্ধ হন। তখন বন্দি অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকেই তিনি গোপনে ভাষাসংগ্রামীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেন। বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’-তে তিনি লিখেছেন,
‘বারান্দায় বসে আলাপ হল এবং আমি বললাম সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে। আওয়ামী লীগ নেতাদেরও খবর দিয়েছি। ছাত্রলীগই তখন ছাত্রদের মধ্যে একমাত্র জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান। ছাত্রলীগ নেতারা রাজি হল। অলি আহাদ ও তোয়াহা বলল, যুবলীগও রাজি হবে। আবার ষড়যন্ত্র চলছে বাংলা ভাষার দাবিকে নস্যাৎ করার। এখন প্রতিবাদ না করলে কেন্দ্রীয় আইনসভায় মুসলিম লীগ উর্দুর পক্ষে প্রস্তাব পাস করে নেবে। নাজিমুদ্দিন সাহেব উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথাই বলেন নাই, অনেক নতুন নতুন যুক্তিতর্ক দেখিয়েছেন। অলি আহাদ যদিও আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সদস্য হয় নাই, তবুও আমাকে ব্যক্তিগতভাবে খুবই শ্রদ্ধা করত ও ভালোবাসত। আরো বললাম, খবর পেয়েছি, আমাকে শীঘ্রই আবার জেলে পাঠিয়ে দিবে, কারণ আমি নাকি হাসপাতালে বসে রাজনীতি করছি। তোমরা আগামীকাল রাতেও আবার এসো। আরো দু-একজন ছাত্রলীগ নেতাকে আসতে বললাম। শওকত মিয়া ও কয়েকজন আওয়ামী লীগ কর্মীকেও দেখা করতে বললাম। পরের দিন রাতে এক এক করে অনেকেই আসল। সেখানেই ঠিক হল আগামী ২১শে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করা হবে এবং সভা করে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে হবে। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকেই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের কনভেনর করতে হবে। ফেব্রুয়ারি থেকেই জনমত সৃষ্টি করা শুরু হবে।’
সেই সংগ্রামে সম্মুখসারিতে থেকে যারা নেতৃত্ব দেন, কারাবরণ করেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তাদের অন্যতম। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রাম কারো একক কৃতিত্বের বিষয় না হলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেদিন যে ভূমিকা পালন করেন, বাংলাদেশের মানুষ তা কোনো দিন বিস্মৃত হবে না।
একুশের
চেতনাকে বাস্তবায়ন
করতে রাজনৈতিক
নেতা, ছাত্র-শিক্ষক-শ্রমিকসহ
সবাই সীমাহীন
নির্যাতন সহ্য করেছেন। বেশ কয়েকজন ভাষাসৈনিক
১৯৫২ সালের
একুশে ফেব্রুয়ারি
পুলিশের গুলিতে
নির্মমভাবে নিহত হন। অধ্যাপক
ড. রফিকুল
ইসলাম (সদ্যপ্রয়াত)
সেদিনের ঘটনাবলি
তার ক্যামেরাবন্দি করে স্মরণীয় করে রেখেছেন। একুশে
ফেব্রুয়ারির ঘটনা কোনো সামান্য
নয়, এ ঘটনার মধ্যেই
নিহিত ছিল বাঙালি জাতির
মুক্তি ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার
বীজ। অধ্যাপক
ড. রফিকুল
ইসলামের ক্যামেরা
ও কলম দুটোই সেদিন
জ্বলে উঠেছিল।
তিনি শ-খানেক দুর্লভ
ছবি তোলেন।
ভাষাসৈনিক হিসেবে প্রত্যেকেই আমাদের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও সম্মানের পাত্র। কিন্তু অসংখ্য ভাষাসংগ্রামীর মধ্যে কেউ কেউ আছেন, সত্যিকার অর্থেই যাদের ত্যাগ ছিল অসামান্য। একুশের প্রথম কবিতা রচনা করেন চট্টগ্রামের কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরী। তার ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ কবিতাটি একুশে ফেব্রুয়ারির বীর শহীদদের স্মরণে লেখা হয়েছিল। এ কবিতা সেদিন সারা বাংলার মানুষের মনে একই সঙ্গে শোক ও সংগ্রামের প্রেরণা জাগিয়েছিল।
১৯৫২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি যখন পুলিশ বাহিনী ছাত্র-জনতার নির্মিত শহীদ মিনার গুঁড়িয়ে দেয়, তখন তা দেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আলাউদ্দিন আল আজাদ তার বিখ্যাত ‘স্মৃতিস্তম্ভ’ কবিতাটি রচনা করেন (যার কয়েকটি লাইন এ রকম—স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার? ভয় কী বন্ধু/ আমরা এখনো চার কোটি পরিবার/ খাড়া রয়েছি তো/)।
একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে এ পর্যন্ত যত কবিতা-গান রচিত হয়েছে, সবচেয়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর কবিতা ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী একজন ভাষাসংগ্রামী। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মুহূর্তে তিনি ঢাকা কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি তিনি ভাষাসৈনিকদের মিছিলে যোগদান করে কিছুটা আহত হন। এমন সময় আহমেদ হোসেন নামে একজন ভাষাসৈনিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর দিকে এক টুকরো সাদা কাগজ দিয়ে বারবার অনুরোধ করতে থাকেন— ‘তোমরা একটি কবিতা লেখো/ তোমরা একটি কবিতা লেখো।’ ওই মুহূর্তে তখন কবিতা লেখা সম্ভব না হলেও কথাটি আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর মনে গেঁথে থাকে। রক্তাক্ত শহীদ রফিকের চেহারার কথা মনে করে ঐতিহাসিক কবিতাটির প্রথম কয়েকটি লাইন তিনি রচনা করেন প্রিন্সিপাল সাইদুর রহমানের বাসায় বসে। বাকি অংশ লেখেন অন্য একটি বাসায়। এ কবিতাটিতে সুরারোপ করে গান হিসেবে প্রথম ব্যবহার করা হয় ঢাকা কলেজের একটি অনুষ্ঠানে। গানটি পরিবেশন করেন অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলামের ছোট ভাই আতিকুল ইসলাম। তিনি এবং তার কয়েকজন বন্ধু গানটি পরিবেশন করার পর ঢাকা কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হন। উল্লেখ্য, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর কবিতাটিতে বিভিন্ন জন সুরারোপ করলেও আজ সারা বিশ্বে শহীদ আলতাফ মাহমুদের সুরেই গানটি গীত হচ্ছে। গানটি একই সঙ্গে সুরস্রষ্টা আলতাফ মাহমুদ ও আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীকে অমরত্ব দান করেছে।
আজ ড. রফিকুল ইসলাম আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার ঐতিহাসিক কাজগুলো আমাদের মাঝে রয়েছে। তার ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ নিয়ে যেসব গবেষণা ও সৃজনশীল কর্ম রয়েছে, তা চিরদিন বাঙালিকে প্রেরণা জোগাবে। আমাদের আরেক ভাষাসংগ্রামী আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীও অসুস্থ অবস্থায় লন্ডনে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আশি-ঊর্ধ্ব জীবনে তিনি নিয়মিতই লেখালেখি করছিলেন, হঠাৎ তার অসুস্থতার খবর শুনে সব বাঙালিই কম-বেশি চিন্তাগ্রস্ত। আমরা তার দীর্ঘ জীবন কামনা করি।
অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বাংলা ভাষার সংগ্রামের ফসল আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা লাভ করেছে। পাকিস্তানিরা ভেবেছিল বাঙালি জাতির মুখের ভাষা কেড়ে নিলেই তাদের মেরুদণ্ড ভেঙে ফেলা সম্ভব হবে, কিন্তু তারা এটা বুঝতে পারেনি উর্দু ভাষা দিয়ে বাংলা ভাষাকে হত্যা করা যাবে না। উর্দু পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ কোনো জনগণের ভাষা ছিল না। ওই ভাষায় পশ্চিম পাকিস্তানেই নগণ্যসংখ্যক মানুষ কথাবার্তা বলত, অথচ বাংলা ভাষা ব্যবহার করত প্রায় ৫৬ শতাংশ মানুষ। ৫৬ শতাংশ মানুষের ভাষা অগ্রাহ্য করে মাত্র ৪ শতাংশ মানুষের মুখের ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্র পৃথিবীর কোথাও বাস্তবায়ন হতে পারে না। বাংলার মাটিতেও উর্দুর শিকড় প্রোথিত হতে পারেনি।
মোনায়েম সরকার: রাজনীতিবিদ, লেখক ও প্রাবন্ধিক










