ওয়ামেক এ. রাজা এবং আহমেদ মুশতাক রাজা চৌধুরীর যৌথভাবে সম্পাদিত ‘করোনা টেল: মহামারীর বিরুদ্ধে এক বাংলাদেশী পরিবারের কলমযুদ্ধ’ বইটি সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে সংকটজনক সময়ে বাংলাদেশের ঢাকায় অবস্থিত একটি পরিবারের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিভ্রমণকে ধারণ করেছে।

কভিড বৈশ্বিক মহামারী সৃষ্টি করেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতি এবং জনজীবনকে একটি বড় ধাক্কা দেয়ার পাশাপাশি ইতিহাসে আরো কিছু প্রভাব ফেলেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অসাধারণ সাফল্য অর্জন সত্ত্বেও ভাইরাসটি প্রকৃতির খেয়ালের কাছে মানবসভ্যতার চরম দুর্বলতার বিষয়টিকেই প্রকাশ করেছে।

যদিও আধুনিক বিজ্ঞান তার বিস্ময়কর শক্তিমত্তায় দ্রুতই বেশকিছু কার্যকর টিকা আবিষ্কার করেছে, তার পরও এরই মধ্যে সংঘটিত সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি এখনো বিপর্যয়কর অবস্থায় রয়েছে। বিশ্বের বেশির ভাগ মানুষকে এখনো টিকা দেয়া হয়নি। বাংলাদেশে ১৭ লাখ ৬০ মানুষের কভিড শনাক্ত হয়েছে এবং প্রায় ২৯ হাজার মানুষ কভিডসংশ্লিষ্ট রোগে মৃত্যুবরণ করেছে। কিছু বিশেষজ্ঞ বিশ্বাস করেন যে, এ তথ্য তিন থেকে পাঁচ ভাগ কম। ভবিষ্যৎ যদি খারাপ নাও হয়, অন্তত এটা নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, অনিশ্চয়তা কাটেনি এখনো।

২৫৬ পৃষ্ঠার বইটিতে (১৯ পৃষ্ঠার আলোকচিত্রসহ) ৪৩টি অধ্যায় রয়েছে। বেশির ভাগ অধ্যায়ই এক দল বৈচিত্র্যপূর্ণ লেখকের লেখা বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত উপসম্পাদকীয়। সহসম্পাদক ড. মোশতাক চৌধুরী ব্র্যাকের স্যার ফজলে হাসান আবেদের একজন সাবেক সহযোগী। তিনি ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির জেমস পি. গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের প্রতিষ্ঠাতা ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির মর্যাদাপূর্ণ মেইলম্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথে ক্লিনিক্যাল পপুলেশন অ্যান্ড ফ্যামিলি হেলথের অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত রয়েছেন।

বইটিতে জনস্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মকর্তাদের মতামত থেকে শুরু করে এ রোগের বিস্তার কীভাবে রোধ করা যায় সে বিষয়ে বিভিন্ন ভাবনা সন্নিবেশিত হয়েছে। আলোচিত উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো হচ্ছে মাস্ক পরার তাত্পর্য, সামাজিক দূরত্বের গুরুত্ব, নিয়ন্ত্রিতভাবে ধর্মীয় উৎসব পালন, ‘সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের অত্যাবশ্যকতা, কভিড-১৯-এর সময় মাতৃত্বকালীন ছুটির প্রয়োজনীয়তা, বাংলাদেশে টিকা বিস্তারের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও মহামারীর কারণে সৃষ্ট সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে জনস্বাস্থ্য পরিচর্যায় গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সংস্কার প্রবর্তনের প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদি। এ লেখাগুলোতে আমরা কেবল পাণ্ডিত্য, অধ্যাপক, অর্থনীতিবিদ, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞই নয়, মা, শিশু (চার ও সাত বছর বয়সী), কর্মজীবী স্ত্রী, সমাজকর্মী এবং সাধারণ নাগরিকদের কণ্ঠস্বর শুনতে পাই।

বইটির বিশেষত্ব হলো, লেখায় বাস্তব মানুষের গল্প তাদের নিজের ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে। শুধু পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে রচিত চিত্রের তুলনায় তাদের ব্যক্তিগত জীবনের অন্তরঙ্গ আভাস বৈশ্বিক এ সংকটের প্রভাব সম্পর্কে অধিকতর স্পষ্ট ধারণা প্রদান করে। লক্ষণীয় যে, সবকিছু ছাপিয়ে করোনা মহামারী বিশ্বজুড়ে কয়েক কোটি পরিবারের জন্য একটি ব্যক্তিগত সংকট সৃষ্টি করেছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বইটি আমাদের এ সময়ের জীবন্ত গল্প, যা ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছে। আজ থেকে ১০০ বছর পরের ইতিহাসবিদরা বুঝতে পেরে বিস্মিত হবেন যে, মানবসভ্যতা বিশ্বব্যাপী বিপর্যয়ের কতটা কাছাকাছি এসেছিল।

একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশে আমরা কী ব্যক্তিগত ও নীতিগত বিষয় শিখেছি এবং কীভাবে রাজনৈতিক নেতা, নীতিনির্ধারক, আমলা, ব্যবসায়ী নেতা এবং সাধারণ নাগরিকরা এ দুর্যোগের প্রভাব কমাতে এবং ভবিষ্যৎ মহামারীর জন্য প্রস্তুতি নিতে সাড়া দিয়েছেন। গ্রন্থটির বিষয়ে অন্তত একটি প্রত্যাশা করা যায় যে, ভবিষ্যতের মহামারী ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলার প্রস্তুতি জোরদারের জন্য নীতি গ্রহণে গ্রন্থটি জাতীয় নেতাদের সহায়তা করবে।

মানুষ পরিবেশের ওপর এমনভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত ও ক্ষতিকর আচরণ করে চলেছে, যার ফলে পরিবেশগত বিপর্যয়ের সংখ্যা এবং ভয়াবহতা বাড়বে বলেই বেশির ভাগ জলবায়ুু বিজ্ঞানী আশঙ্কা করছেন।

রোগের বিস্তার ‘প্রতিরোধ’ করার ক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার উদ্যোগ কিছু দেশে অত্যন্ত কার্যকর দেখা গেছে, যদিও অনেক দেশের জন্যই ‘প্রতিরোধ’-উদ্যোগ বিপর্যয়করভাবে অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে, যার মধ্যে বেশকিছু ধনী দেশও ছিল। বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে লেখক উল্লেখ করেছেন যে, ধনী দেশগুলো তাদের জনসংখ্যার একটি বড় অংশের জন্য টিকা কিনতে, মজুদ করতে এবং টিকা দিতে সক্ষম, বিপরীতে যেখানে দরিদ্র দেশগুলো টিকাপ্রাপ্তির আওতার বাইরেই রয়ে গিয়েছে। এখন পর্যন্ত আফ্রিকার ২ শতাংশেরও কম নাগরিক টিকা পেয়েছেন।

লেখক বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে পাণ্ডিত্যপূর্ণ গবেষণা এবং উদ্যোগ নেয়ার প্রেক্ষাপটে কিছু চ্যালেঞ্জের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তালিকার শীর্ষে রয়েছে সংকট ব্যবস্থাপনার জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাব (পৃ. ৯২)। প্রথম দিকের কিছু সংগ্রাম ও ব্যর্থতার বিষয়ে লেখক উল্লেখ করেন যে, প্রাথমিকভাবে বিজিএমইএ নেতৃত্ব সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়নি, লাখ লাখ তৈরি পোশাক খাতের কর্মীদের স্বাস্থ্য ও জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলেছে (পৃ. ৬৬)। একইভাবে অনেক মসজিদের নেতৃত্ব সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং মাস্ক পরার মতো সুরক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়নে শিথিলতা দেখিয়েছে।

মোশতাক চৌধুরী লিখেছেন, গত ২০ বছরে বাংলাদেশের একটি বড় কিন্তু আড়ালে থাকা অর্জন হচ্ছে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)। নিয়মিত টিকাদানে বিস্তৃতির ক্ষেত্রে দেশটি ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি ২ শতাংশ থেকে বর্তমানে জনসংখ্যার ৯০ শতাংশে চলে এসেছে। এটি দেশের ব্যবস্থাপনার দক্ষতা এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের উপস্থিতির প্রতিফলন। এ সংস্থাগুলো কভিড-১৯ টিকাদানের জন্য একটি ব্যাপক কর্মসূচির জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। এনজিও, বিশেষ করে ব্র্যাক, অতীতের টিকাদান প্রচেষ্টায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কভিড-১৯ মহামারী বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার বিভিন্ন ফাঁকফোকর প্রকাশ করেছে।

মোশতাক চৌধুরী উল্লেখ করেছেন যে, এ সংকট একদিকে যেমন বেদনাদায়ক, তেমনি এ পরিস্থিতিকে বাংলাদেশের জনগণের কল্যাণে কিছু বড় সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ হিসেবেও দেখা যেতে পারে। এক্ষেত্রে খুব কম সিদ্ধান্তই ‘সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা’-এর মতো প্রভাবশালী হবে।

স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্যে বিনিয়োগের বিপরীতে সুফল অর্জনের হার অসাধারণভাবে বেশি, যা কিছু অনুমান অনুসারে, ৯০০ শতাংশ থেকে ২ হাজার ২০০ শতাংশ পর্যন্ত। একটি জাতীয় সংকটের সম্মুখীন হওয়ার পর বেশ কয়েকটি উন্নয়নশীল দেশ ‘সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা’ নীতি বাস্তবায়ন করেছে। এশিয়ার আর্থিক সংকট থাইল্যান্ডকে ‘সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা’র দিকে নিয়ে গেছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা মূলত স্বেচ্ছায় ব্যয়িত ব্যক্তিগত খরচের ওপর নির্ভরশীল। ‘সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা’-এর প্রত্যাশা হলো সরকার কর্তৃক বাধ্যতামূলক খরচের ওপর ভিত্তি করে একটি স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচিতে যাওয়া। বাংলাদেশ বর্তমানে তার জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ জনস্বাস্থ্যে ব্যয় করে। লেখকরা সুপারিশ করেছেন, দেশটি জনস্বাস্থ্যের জন্য জিডিপির ২ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যয় করার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে, যা পর্যায়ক্রমে দু-তিন বছরের মধ্যে করা হবে। মূল কর্মসূচির মধ্যে সব নাগরিকের জন্য মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য পরিচর্যা ব্যবস্থা, যেমন টিকা প্রদানের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। একবার ‘সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা’ গৃহীত হলে, যারা সামর্থ্য রাখে তারা বীমার মাধ্যমে উচ্চ মানের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসেবা নেবে, সাধারণ নাগরিকদের জন্য জনস্বাস্থ্য পরিচর্যা বিনামূল্যে পাওয়ার ব্যবস্থা থাকবে।

সৌভাগ্যবশত, বাংলাদেশ সর্বজনীনভাবে অর্থায়িত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য অনন্যভাবে যোগ্য, যেখানে সব নাগরিক অংশগ্রহণ করতে এবং উপকৃত হতে পারে। ‘সবার জন্য স্বাস্থ্যব্যবস্থা’ (ইএইচসি, পৃ. ৮৪) সমর্থন করার ক্ষেত্রে বেশকিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত: একটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রাজনৈতিক নেতৃত্ব; দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি; শক্তিশালী ও ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো, যার মধ্যে রয়েছে, চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী এবং একটি সুষ্ঠু আইন-শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশ।

একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় নকশা তৈরি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে, রাষ্ট্র তার জনগণের কল্যাণের জন্য একটি বিশাল পদক্ষেপ নিতে পারে। এটি দেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করবে এবং পরবর্তী কোনো মহামারী আসার সময় তা মোকাবেলা করার জন্য বাংলাদেশকে প্রস্তুত করবে। লেখকরা যদি সরকারকে এদিকে এগিয়ে যেতে রাজি করাতে সক্ষম হন, তবে বইটি ভবিষ্যতের জন্য একটি উপযুক্ত অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

 

মুনির কুদ্দুস: বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের (বিডিআই) প্রেসিডেন্ট ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেইরি ভিউ এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক এবং বিজনেস কলেজের ডিন