মার্কেটিংয়ের অবিচ্ছেদ্য উপাঙ্গগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ব্র্যান্ডিং, পজিশনিং, বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা। ২০১৬ সালে প্রকাশিত ‘মার্কেটিং ৪.০: মুভিং ফ্রম ট্র্যাডিশনাল টু ডিজিটাল’ (Marketing 4.0: Moving from Traditional to Digital) গ্রন্থে আধুনিক মার্কেটিংয়ের জনক বলে পরিচিত ফিলিপ কটলার ও তার সঙ্গে আরো দুজন সহলেখক বলেছেন যে আপামর জনতার মাঝে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের ব্যবহার উত্তরোত্তর বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ব্র্যান্ডিং, পজিশনিং, বিজ্ঞাপন ও প্রচারণার মূল পাটাতনটি অফলাইন জগৎ থেকে স্থান বদল করে অন্তর্জাল তথা ডিজিটাল স্পেসে চলে গেছে। কেননা আজকের ‘টিপিক্যাল তরুণ’ শব্দবন্দটির উল্লেখ মাত্রই আমাদের মানসপটে একজন স্মার্টফোন আসক্ত কাউকে দেখতে পাই, যে সারাক্ষণ তার ফোন কিংবা অন্য কোনো ডিজিটাল ডিভাইসের সঙ্গে সুপারগ্লুর মতো লেগে থাকে এবং চাতক পাখির মতো সারাক্ষণ ডিজিটাল স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকে।

এ অবস্থায় প্রচারণার সনাতন ছলাকলা আর আগের মতো কার্যকর নয়। আজকের যুগে বিলবোর্ড বিজ্ঞাপনের চেয়ে ফেসবুক বা ইউটিউবের মতো ডিজিটাল স্পেসের বিজ্ঞাপন অধিকতর সম্মোহনী। তাই ব্র্যান্ড সচেতনতা তৈরি হোক, ইমোশনাল কিংবা কালচারাল পজিশনিংয়ের প্রসঙ্গ হোক, যেকোনো বিজ্ঞাপনী ক্যাম্পেইন কিংবা প্রচারণা হোক, অন্তর্জালের ডিজিটাল স্পেসকে উপেক্ষা করার উপায় নেই। কাজেই শহরবাসীর দ্বারে দ্বারে পণ্যের ফ্রি স্যাম্পল বিলির চেয়ে ফেসবুক কিংবা টুইটারে চটকদার স্লোগানসংবলিত # হ্যাশট্যাগ ক্যাম্পেইন আজকে ব্র্যান্ড অ্যাওয়ারনেস বা সচেতনতা সৃষ্টিতে অনেক বেশি কার্যকর। অবশ্য এ কথাগুলো আজকে আর উচ্চারণের দরকার পড়ে না, কারণ তা অনুচ্চারিত থেকেও আমাদের কাছে স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে ধরা দেয়।

তবুও বলতে হয় যে কোকা-কোলার ট্রেডমার্ক অধিকারী ‘দ্য কোকা-কোলা কোম্পানি’র ‘কোক স্টুডিও’ মিউজিক শো ডিজিটাল স্পেসে ব্র্যান্ড সচেতনতা সৃষ্টি ও ইতিবাচক কালচারাল পজিশনিং নেয়ার ক্ষেত্রে অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। সত্যি বলতে, এই মিউজিক শোকে ব্র্যান্ড অ্যাওয়ারনেস ক্যাম্পেইনের টেক্সটবুক দৃষ্টান্ত হিসেবে গণ্য করা যায়। কারণ মিউজিক শোটি এতটাই ভাইরাল ও সেনসেশনাল হয়েছে যে আপনি কোকা-কোলার ভোক্তা হোন বা না হোন শোটির দর্শক বা শ্রোতা না হয়ে পারেন না। আর কোকা-কোলার মাস্টার স্ট্রোকটি এখানে যে তাদের ব্র্যান্ডিং ও পজিশনিংটা অত্যন্ত সাটল ও সাবলিমিনাল (subliminal) অর্থাৎ যা এতটাই সূক্ষ্ম ও উপসংবেদজ যে ক্রিটিক্যাল থিংকিং ছাড়া ধরা ও পড়া যায় না। দর্শক হিসেবে আপনি অবচেতনভাবেই তাদের পজিশনিং মেনে নিচ্ছেন কোনো বিরক্তি ছাড়াই, কেননা নিঃশব্দে লোগো প্রদর্শন কিংবা কোকের বোতলের আইকন প্রদর্শন ছাড়া তাদের অন্য কোনো পণ্যের কোনো ইনট্রুসিভ প্রচারণা কিংবা উপস্থিতির জানান দেয় না। যদিও সব শোই বস্তুত একটা ভার্চু সিগন্যালিং (virtue signalling), কিংবা সোজা বাংলায়, দেখনদারির চ্যারিটির ঘটনা, কোকের লোগো কিংবা আইকনের নীরব এ অবস্থানের কারণে বিদেশী এ ব্র্যান্ডকে আমরা আমাদের সংস্কৃতির অবিভাজ্য অঙ্গ হিসেবে মেনে নিই। কেননা বস্তুত সেই বিজ্ঞাপন সবচেয়ে বেশি কার্যকর যা আদতে বিজ্ঞাপন বলেই গণ্য হয় না। উপরন্তু সার্ভিল্যান্স-তাড়িত ডিজিটাল জগতে নব্য উদারনৈতিকতাবাদী কোনো বহুজাতিক কোম্পানির ব্র্যান্ড সচেতনতা ক্যাম্পেইনে এর চেয়ে বেশি কিছু আশা করাও অন্যায়। সর্বোপরি, মার্কেটিং তো এক ধরনের আর্ট অব সিডাকশনও বটে। এজন্যই স্বয়ং ফিলিপ কটলার বাইবেলের রেফারেন্স দিয়ে শয়তানকে (Satan) সৃষ্টির প্রথম মার্কেটার বলে আখ্যায়িত করেছিল, যেহেতু শয়তান সর্পের ছদ্মবেশে ইভকে নিষিদ্ধ আপেল খেতে প্ররোচিত করেছিল।

কোক স্টুডিও মিউজিক শোটি ডিজিটাল সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিংয়ের পাশাপাশি ভোক্তাকেন্দ্রিক কন্টেন্ট মার্কেটিং ও মিউজিক মার্কেটিংয়েরও অতিসার্থক দৃষ্টান্তও বটে। ‘মার্কেটিং ৪.০’-এ কটলার ও তার সহলেখকদ্বয় বলেছেন, কন্টেন্ট হলো নতুন বিজ্ঞাপন, হ্যাশট্যাগ হলো নতুন ট্যাগলাইন (‘Content is the new ad, hashtag is the new tagline.’) কন্টেন্ট মার্কেটিংয়ের উদ্দেশ্য, বিনোদনমূলক বা শিক্ষামূলক কন্টেন্ট তৈরি করে সম্ভাব্য ক্রেতাদের মনোরঞ্জনের মাধ্যমে কিংবা তাদের সঙ্গে আদর্শগত সম্পর্ক স্থাপনের সঙ্গে এক ধরনের আদর্শিক, সাংস্কৃতিক, আবেগীয় ও শিক্ষামূলক বন্ধন সৃষ্টিই যার উদ্দেশ্য। সেই অর্থে কোক স্টুডিও বাংলা সফল। গত দুই সিজনে শুধু ইউটিউবেই ‘কোক স্টুডিও বাংলা’র এখন পর্যন্ত প্রকাশিত ১৭টি মিউজিক ভিডিওর ভিউ হয়েছে ২৭২ মিলিয়নের অধিকবার। ফেসবুকে ও অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্মেও একই সংখ্যক বা তার চেয়ে অধিকতর দর্শক ও শ্রোতা মিউজিক শোটি উপভোগ করেছেন।

সংগীতানুষ্ঠানটির কন্টেন্টগুলোও অতিসুচারুভাবে ধাপে ধাপে আয়োজিত হয়েছে। ‘মার্কেটিং ৪.০‘-এ ফিলিপ কটলার ও তার সহলেখক ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং অ্যাসোসিয়েশন সহপ্রতিষ্ঠাতা হারমাওয়ান কার্তাজায়া ও নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিংয়ের অধ্যাপক ইভান সেতিয়াওয়ানের মতে, কন্টেন্ট মার্কেটিং ধাপগুলোকে আটটি স্টেজে ভাগ করা যায়। কন্টেন্ট মার্কেটিংয়ের প্রথম ধাপ অবশ্যই ব্র্যান্ড সচেতনতা সৃষ্টি। দ্বিতীয় ধাপ দর্শক ও শ্রোতার মানচিত্র প্রণয়ন (audience mapping), অর্থাৎ তাদের বাসনা ও রাগ-বিরাগের সুলুকসন্ধান করা। তৃতীয় ধাপ কন্টেন্টের থিম, ফরম্যাট, স্টাইল, শিডিউল নির্ধারণ করা। চতুর্থ ধাপ কন্টেন্ট সৃষ্টির জন্য যথাযথ আয়োজনার্থে ইন-হাউজ প্রস্তুতি কিংবা এজেন্সির সঙ্গে চুক্তি ও সময়মতো কন্টেন্ট সৃষ্টি সম্পাদন করা। পঞ্চম ধাপ কন্টেন্ট ডিস্ট্রিবিউশন অর্থাৎ কন্টেন্টগুলোকে নিজস্ব মালিকানাধীন কিংবা অন্য কোনো ফ্রি কিংবা পেইড প্লাটফর্মে মুক্তি দেয়া। ষষ্ঠ ধাপ কন্টেন্ট পরিবর্ধন (content amplification), অর্থাৎ কন্টেন্ট নিয়ে দর্শক ও শ্রোতাদের মাঝে আলাপ-সংলাপ ও সোশ্যাল মিডিয়া কিংবা অন্য ইনফ্লুয়েন্সারদের দিয়ে কন্টেন্টের প্রসার বাড়ানো। সপ্তম ধাপ কন্টেন্ট মার্কেটিংয়ের সাফল্য ও অর্জন মূল্যায়ন। অষ্টম ধাপ কন্টেন্ট মার্কেটিংয়ের উন্নয়ন অর্থাৎ কন্টেন্টের থিম পরিবর্তন, কন্টেন্টের মানোন্নয়ন, কন্টেন্ট ডিস্ট্রিবিউশনে পরিবর্তন ও কন্টেন্ট পরিবর্ধন স্ট্র্যাটেজি পরিবর্তন।

কোক স্টুডিও বাংলা প্রসঙ্গে দর্শক ও শ্রোতার মানচিত্র প্রণয়ন ও কন্টেন্টের থিম, ফরম্যাট ও স্টাইল নিয়ে আরেকটু আলোকপাত করলে দেখা যায়, অনুষ্ঠানটিতে লোকজ ও শাহরিক এবং লোকাল ও গ্লোবাল রুচি, সংস্কৃতি ও সংগীত ঐতিহ্যের প্রায় নিখুঁত সংমিশ্রণ। অবশ্যই এ সংমিশ্রণকে হোমি বাবার মতো তাত্ত্বিকরা সৌংকর্য (hybridity) বলে আখ্যায়িত করেন তা সুপরিকল্পিত। কেননা সৌংকর্য হলো যেকোনো অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্য। কোনো কিছুকে শ্রেণী বিভাজন, স্থানিক দূরত্ব, ভাবাদর্শিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনৈক্যের দেয়াল টপকাতে হলে তাকে অবশ্যই সবার প্রতিনিধিত্বমূলক সাংস্কৃতিক চিহ্নগুলোকে জায়গা দিতে হবে যার অবশ্যম্ভাবী ফলাফল সৌংকর্য।

কোক স্টুডিওর গত সপ্তাহে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘কথা কইয়ো না’ মিউজিক ভিডিওটি পর্যবেক্ষণ করলে কোক স্টুডিওর সংগীতায়োজনে সৌংকর্যের মাত্রা অনুধাবন করা যায়। উল্লেখ্য, মিউজিক ভিডিওটি এরই মধ্যে ৫৬ লাখবার দেখা হয়েছে (২৪ জুন ২০২৩ পর্যন্ত)। মিউজিক ভিডিওটির রেকর্ডকৃত সংগীতায়োজনে একজন গায়ক ও একজন গায়িকা ছিলেন যেহেতু এটা ডুয়েট। তবে গায়িকার লিরিক নেয়া হয়েছে ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ থেকে এবং গায়কের লিরিক নেয়া হয়েছে ‘সাদা সাদা কালা কালা’ শিরোনামের জনপ্রিয় গানের জন্য বিখ্যাত শহুরে কবি ও গীতিকার হাশিম মাহমুদের গান থেকে। সংগীতায়োজনে ব্যবহার হয়েছে ইউরোপীয় ও ভারতীয়সহ গ্রামবাংলার স্থানীয় নানা বাদ্যযন্ত্র। তাই শিক্ষিত ও অশিক্ষিত এবং শহুরে ও গ্রামীণ সব দর্শক-শ্রোতার কাছে কোক স্টুডিওর অন্যান্য মিউজিক ভিডিওর মতো এটিও জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কারণ একজন দর্শক, হোক সে পশ্চিমা সংস্কৃতির সমঝদার কিংবা লোকজ গ্রামীণ সংস্কৃতির সমঝদার, সহজেই মিউজিক ভিডিওর কন্টেন্টের সঙ্গে কানেক্ট করতে পারে। আর যে কন্টেন্টের মুখ্য উদ্দেশ্যই মার্কেটিং, সে কন্টেন্ট যত ভোক্তার নিকট পৌঁছায় তত ভালো। সেই অর্থে কোক স্টুডিও বাংলা মার্কেটিং ৪.০-এর একটি টেক্সটবুক উদাহরণ।

জামান মঞ্জু: সাংবাদিক