গত কয়েক দশকে গ্রামের হাটবাজারের নানা পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। এ পরিবর্তন হাটবাজারের অবকাঠামোগত দিক, পণ্য, পণ্য ব্যবস্থাপনা এবং সর্বোপরি বাজারবিষয়ক আর্থসামাজিক সম্পর্ককে যুক্ত করে। পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটের বহু কারণের মধ্যে গ্রামীণ সমাজে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সম্প্রসারণ, তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার, অভিবাসন, গ্রাম-শহরের যোগাযোগ বৃদ্ধির মতো বিষয়াবলি উল্লেখযোগ্য। হাটবাজারে নতুন নতুন পণ্য ও বিক্রয় ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়াবলির সংযোজন গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে নতুন অভিজ্ঞতার সঙ্গেও সংযুক্ত করে।

গ্রামীণ হাটবাজারের রূপান্তরের চিত্র সারা দেশে এক রকম নয়। রাজধানীর নিকটবর্তী জেলাগুলোর গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতার আলোকে এ বিষয়টি পরিলক্ষিত হয় যে স্বাধীনতার পর কৃষিতে যান্ত্রিক ও রাসায়নিক প্রযুক্তির বিস্তার কৃষি উপকরণ সংগ্রহের জন্য কৃষককে বাজারের ওপর অধিক নির্ভরশীল করে তোলে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের আগে কৃষিকাজে ব্যবহূত সামগ্রী, যেমন লাঙল দিয়ে হালচাষের উপকরণ, সার, বীজ, কীটনাশক কৃষক নিজ গৃহ থেকে সরবরাহ করতেন। আধুনিক প্রযুক্তির বিস্তার শুধু কৃষি পদ্ধতিরই পরিবর্তন আনে না, পারিবারিক কাঠামো, সমাজ কাঠামো এমনকি গ্রামীণ বাজার ব্যবস্থারও পরিবর্তন সাধন করে। আগে মানবশ্রম বিশেষত গৃহের নারীশ্রম থেকে শুরু করে মাঠে পুরুষশ্রম কৃষি উৎপাদনে মুখ্য ভূমিকা পালন করত। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাব কৃষিক্ষেত্রে মানবশ্রমের গুরুত্বকে অনেকাংশেই হ্রাস করে।  ইরি ও নানা ধরনের হাইব্রিড জাতের ধান চাষের প্রচলন শুরু হওয়ার সময় থেকে রাসায়নিক সার ও যান্ত্রিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়। কৃষক উৎপাদনের উপকরণ সংগ্রহের জন্য গৃহের পরিবর্তে বাজারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।

সার, বীজ ও কীটনাশক উৎপাদনকারী ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো বা তাদের এজেন্ট/ডিলার গ্রামে দোকান প্রতিষ্ঠা করে, যা গ্রামীণ বাজারের অবকাঠামোগত পরিবর্তনে প্রভাব ফেলে। ১৯৮০-এর দশকে গ্রামের বাজারে টিনের তৈরি দোকানপাটের সংখ্যা বাড়তে থাকে, যা পরবর্তী সময়ে অনেক ক্ষেত্রে ইটের দালানে রূপান্তর হয়। আধুনিক প্রযুক্তি বিকাশের শুরুর দিকে গ্রামে রাসায়নিক প্রযুক্তি বিক্রয় হলেও যান্ত্রিক প্রযুক্তি, যেমন ট্রাক্টর, পাম্পজাতীয় প্রযুক্তি ক্রয়ের জন্য শহরে যেতে হতো। নব্বইয়ের দশকের দিকে কৃষিতে যান্ত্রিক প্রযুক্তি ও রাসায়নিক প্রযুক্তির চাহিদা বৃদ্ধির কারণে গ্রামের বাজারে সেগুলো বিক্রয় হতে থাকে। মূল্যবান এ প্রযুক্তিগুলো দোকানে রাখার নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে দোকান মালিক বা বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রামের বাজারে ইটের তৈরি দোকান নির্মাণ শুরু করে। নব্বইয়ের দশকে সাটুরিয়া বাজারে সারের দোকান স্থাপন করেন এ রকম একজন ব্যবসায়ী কথা প্রসঙ্গে বলেন, ‘আগে তো বাজারে খোলা জায়গাতেই বেশির ভাগ পণ্য বিক্রি হতো, বাড়ি থেকে দৈনিক বা হাটের দিনগুলোয় অনেক দূর থেকেও বিক্রেতা তার মালপত্র এনে বিক্রি করতেন, এজন্য একটা সময় কোনো ভাড়াও দিতে হতো না। কিন্তু কৃষিতে সার-কীটনাশক ব্যবহার হওয়ার পর থেকে ব্যক্তিমালিকানায় এমনকি ভাড়ায়ও দোকান দেয়ার প্রচলন ঘটে, যা গ্রামের বাজারে অবকাঠামোগত পরিবর্তন ঘটায়।’ আগে বিক্রয়কৃত পণ্যগুলোর উৎপাদনের সঙ্গে গৃহস্থালির সম্পর্ক ছিল, তাই বাড়ি থেকেই এগুলো বাজারে নিয়ে আসা হতো। আধুনিক প্রযুক্তিগুলো আসে শহর  থেকে, যা আবার মজুদ ও সংরক্ষণ প্রয়োজন। পাশাপাশি ক্রেতা আকর্ষণের জন্য ডেকোরেশন করার প্রবণতাও দেখতে পাওয়া যায়। এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে বাজারের অবকাঠামোগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পায়।

সার-কীটনাশকের মতো প্রাত্যহিক কৃষি উপকরণ বিক্রির জন্য গ্রামেও নতুন বাজার ও বিজ্ঞাপন ব্যবস্থার প্রসার ঘটছে, যা কয়েক দশক আগেও ছিল অনুপস্থিত। ট্রাক্টর ও অন্যান্য মেশিনারিজ প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য যে ডিজেল প্রয়োজন হয়, ক্ষুদ্র পরিসরে তারও বিক্রয়কেন্দ্র বা দোকান তৈরি হয়েছে। ট্রাক্টর, পাম্পের মতো মেশিনারিজ মেরামতের জন্য ছোট পরিসরে মেরামত কেন্দ্রের আবির্ভাব গ্রামীণ বাজার ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ঘটিয়েছে।

এনজিও ক্ষুদ্রঋণ ও ব্যাংকঋণের চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গেও প্রযুক্তির সম্পর্ক রয়েছে। যান্ত্রিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ব্যাংকঋণের প্রচলন ঘটতে শুরু করেছে, যদিও গ্রামের সীমিতসংখ্যক মানুষ ব্যাংকঋণ গ্রহণ করে। ক্ষুদ্র জমির মালিকরা চারা রোপণ বা চাষাবাদের সময় সার, কীটনাশক বা ধান কাটার শ্রমিকদের মজুরি প্রদানের জন্য এনজিও থেকে ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে থাকেন। ১৯৯০-এর দশক থেকে এ ধরনের ক্ষুদ্রঋণের ধারণা গ্রামে খুব জনপ্রিয় হয়। কৃষি প্রযুক্তি ছাড়াও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী নানা কাজে ক্ষুদ্রঋণ গ্রহণ করে। ক্ষুদ্র্রঋণের কার্যালয় ব্যতীত এখন গ্রামীণ জনপদ চিন্তা করা যায় না। অন্যদিকে কৃষিতে ব্যবহূত রাসায়নিক প্রযুক্তি বিক্রয়ের অ্যাক্টরগুলো যেমন জাতীয় বা বহুজাতিক কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি থেকে শুরু করে দোকান মালিক, বিক্রয়কর্মীর ধারণা বা গ্রামের বাজারে শোরুম স্থাপনের মতো বিষয়াবলি গ্রামীণ কৃষি কাঠামোয় নতুন মাত্রা যোগ করে। অনেক এনজিও কৃষিতে ব্যবহূত রাসায়নিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন, প্রসার ও বিক্রয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়, যা গ্রামে বাজারের ধারণাকেও সম্প্রসারিত করে। রাসায়নিক প্রযুক্তির বিক্রয়কে কেন্দ্র করে শহরের বা গ্রামের বাইরের মানুষজনের গ্রামে অর্থ বিনিয়োগের ব্যাপারটিও লক্ষণীয়।

তবে গ্রামে একটি সময় ছিল, প্রযুক্তি বলতে শুধু কৃষি প্রযুক্তিকে বোঝানো হতো। যোগাযোগ ব্যবস্থা ও তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার গ্রামীণ সমাজ কাঠামো তথা বাজার ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করে। কৃষিবহির্ভূত খাতেও অর্থ বিনিয়োগ বেড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে নগদ অর্থের সংস্থান করতে পারা অনেক মানুষই গ্রামে ব্যবসায় অর্থ বিনিয়োগ করেছে। গ্রামের বাজারে টিন বিক্রয়ের দোকান, সারের ডিলারের বা দোকানের মতো প্রতিষ্ঠান নির্মিত হয়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় টিভি, ফ্রিজ বিক্রয়ের প্রতিষ্ঠান বা শোরুম প্রতিষ্ঠাও পরবর্তী সময়ে গ্রামের বাজারের চিরায়ত চরিত্রকে পরিবর্তিত করছে। কিস্তিতে টিভি, ফ্রিজ বিক্রয়ের প্রতিষ্ঠান বা শোরুমের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রামীণ স্বল্প আয়ের মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। কোনো কোনো গ্রামের বাজারে পোশাকের দোকানের উপস্থিতি মেলে। যারা ব্যবসায়ে অর্থ বিনিয়োগের সামর্থ্য রাখেন না, তাদের অনেকেই এসব প্রতিষ্ঠানে বিক্রয়কর্মী হিসেবে চাকরি নিয়েছেন। আবার সরকারি-বেসরকারি ভোকেশনাল ট্রেনিং প্রাপ্ত যুবকরা গ্রামেই প্রযুক্তি মেরামতের জন্য বাজারে দোকান স্থাপন করছেন।

বাজারে চা-স্টলকে কেন্দ্র করে আড্ডা দেয়ার ঘটনা নতুন কিছু নয়। কিন্তু গত কয়েক দশকে টিভি ও ডিশ অ্যান্টেনার সংযোজন আড্ডার চিরায়ত রূপকেও পাল্টে দেয়। চায়ের দোকানে ডিশ অ্যান্টেনায় প্রচারিত খেলা, নাটক, সিনেমা দেখতে আসা মানুষজন গ্রামের বাজারের আড্ডা-অবসরের ধারণাকেও পাল্টে দেয়।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাজার সম্প্রসারণে অভিবাসন ও রেমিট্যান্সপ্রবাহের যোগসূত্রতা রয়েছে। সিলেট জেলার বিভিন্ন গ্রামে দেখা গেছে বিদেশে অভিবাসন ও তাদের প্রেরিত অর্থ গ্রামে বসবাসকারীদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি করছে। বিদেশে অভিবাসিতদের রেমিট্যান্সপ্রবাহ গ্রামের বাজার কাঠামোয় পরিবর্তন এনেছে। গ্রামে বাসস্থানের জন্য যেমন দালানকোঠা তৈরি হচ্ছে, ঠিক তেমনি সুপার মার্কেটের মতো প্রতিষ্ঠান তৈরি হচ্ছে, যেখানে কর্মরত থাকেন অভিবাসীদের ভাই বা অন্য কোনো আত্মীয়। এ ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য গ্রামের অর্থনীতি তথা কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির পরিবর্তন আনছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে কৃষিতে পুঁজি বিনিয়োগের ব্যাপারটিও লক্ষ করা গেছে। শুধু বিদেশ অভিবাসনকারীরাই নয়, অভ্যন্তরীণ অভিবাসনকারীদেরও কৃষিতে পুঁজি বিনিয়োগ করতে দেখা যায়। ট্রাক্টর বা পাম্প ক্রয় করে তা ভাড়া খাটানোর ব্যাপারটিও গ্রামীণ জনপদে অনেকটাই প্রচলিত।

গ্রামের বাজারে যুক্ত হচ্ছে ব্যাটারিচালিত রিকশার বিক্রয়কেন্দ্র, মেরামত কেন্দ্র, যার সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় গ্রামের যুবক জনগোষ্ঠীর অনেকেই মোটরযান শ্রমিক, মেকানিক কাজে বা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালানোর কাজে নিযুক্ত হচ্ছেন। নগদ অর্থের মালিকরা এসব ব্যাটারিচালিত রিকশা ক্রয় করে বেতনভুক্ত চালক দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। আবার অনেকে কিস্তিতে ব্যাটারিচালিত রিকশা ক্রয় করে নিজেই চালাচ্ছেন। শুধু অটোরিকশার স্ট্যান্ড গ্রামের বাজারের পরিধি বৃদ্ধি করছে না, কোনো কোনো বাজারে অধিকসংখ্যক অটোরিকশার চলাচল বাজারের কেন্দ্রস্থলে যানজট সৃষ্টি করছে। এ ধরনের অভিজ্ঞতা গ্রামীণ চিরায়ত বৈশিষ্ট্যের রূপান্তর ঘটায়। 

সাম্প্রতিক সময়ে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষত সেলফোন, কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের ব্যবহার গ্রামীণ বাজার ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করেছে। গত দশকগুলোয় কোনো কোনো গ্রামের বাজারে ভিডিও গেমের দোকানের উপস্থিতি মিলত। স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের প্রসার তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক ব্যবসাকে সম্প্রসারিত করে, যার প্রভাব গ্রামীণ বাজারে দৃশ্যমান। সেলফোন রিচার্জের দোকান, সেলফোনে গান বা গেম ডাউনলোড যেমন যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ঘটিয়েছে, তেমনি নতুন নতুন বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেরও সৃষ্টি করেছে। যুবক সম্প্রদায়ের কাছে ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকের ব্যবহার খুব জনপ্রিয় হলেও স্বল্পশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কাছে এর প্রাথমিক ব্যবহার দুরূহ কাজ। গবেষণায় দেখা যায়, স্বল্পশিক্ষিতদের মাঝে অর্থের বিনিময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর অ্যাপস ডাউনলোড করে দেয়া হয়। দোকানের সাইনবোর্ডে লিখিত বিজ্ঞাপন চেখে পড়ার মতো, যেমন ‘এখানে ফেসবুক, ইউটিউবসহ সকল ধরনের গান ডাউনলোড করা হয়, ট্রেনিং এর ব্যবস্থা রয়েছে।’ আবার এমন বিজ্ঞাপনও দেখা যায়, ‘সকল প্রকার ইন্টারনেটের কাজ করা হয়। ভর্তি পরীক্ষার আবেদন ফরম, চাকুরির আবেদন ফরম, বিদেশগামীদের ভিসা আবেদন ফরম ফিল-আপ করা হয়।’ ফেসবুকে ছবি আপলোড করার বিষয়টিও দৃশ্যমান। একটি দোকানের সাইনবোর্ডে লেখা—‘এখানে ১০ টাকার বিনিময়ে ফেসবুক, টিকটক ও অন্যান্য অ্যাপস ডাউনলোড করা হয়; ১০০ টাকার বিনিময়ে ফেসবুক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়; ফেসবুক প্রশিক্ষণ নিলে ডাউনলোড ফ্রি।’ সেলফোনে ধর্মীয় ওয়াজ মাহফিল ডাউনলোডের বিষয়টিও লক্ষণীয়। একসময় আমেরিকার ডিভি লটারির ফরম ফিলআপের বিষয়টিও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে আকর্ষণ করেছিল।

গ্রাম্য বাজারের আশেপাশে যেসব খালি জায়গা ছিল, সেই জমির মালিক ইটের তৈরি বা টিনের তৈরি ঘর নির্মাণ করে তা দোকান হিসেবে ভাড়া দিচ্ছেন। কৃষিজমিতে বিভিন্ন শিল্প-কারখানা ও ইটভাটার মতো স্থাপনা বা গ্রামে এনজিওর সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে শহর থেকে শিক্ষিত শ্রেণীর মানুষকে গ্রামে এসে চাকরি করতে হচ্ছে, যার প্রভাবে গ্রামে ক্লিনিক, ব্যাংক, সন্তানদের পড়াশোনার জন্য কিন্ডারগার্টেন, কোচিং সেন্টারসহ নানা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। বৃহৎ মুদি দোকানসহ নানা ধরনের বাজার গড়ে উঠেছে, পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ব্যাংক-বীমার মতো প্রতিষ্ঠান। ব্যাংক, বীমা, এনজিও ও কিন্ডারগার্টেনের মতো প্রতিষ্ঠানের চাহিদা মেটানোর জন্য কম্পিউটার কম্পোজ ও প্রিন্টার, ফটোকপির দোকান গ্রামের বাজারে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে শহর ও গ্রামের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। যোগাযোগের এই উভয়মুখী কারণকে কেন্দ্র করে গ্রামেও নাগরিক জীবনের ভোগবাদী আচরণের সম্প্রসারণ ঘটছে। বাজারের অভ্যন্তরে বা আশেপাশে বিউটি পার্লার, কফিশপ, ফাস্টফুড শপ, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, কোচিং সেন্টার স্থাপিত হয়েছে।

তবে সাপ্তাহিক হাটের গুরুত্ব এখনো শেষ হয়ে যায়নি। গ্রাম গবেষণায় দেখা যায়, কিছু গ্রামে সবজি উৎপাদন আগের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সবজি উৎপাদন ধানের চেয়ে লাভজনক। সবজির বাণিজ্যিকভিত্তিক উৎপাদনও বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক গ্রামেই সাপ্তাহিক হাটের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হওয়ার কারণে নিকটস্থ অনেক শহুরে মানুষ স্বল্প মূল্যে সবজি ক্রয়ের জন্য গ্রামের হাটে আসছে। অনেক সময় শহুরে ক্রেতারা সবজি ছাড়াও গ্রামের হাট থেকে  ‘স্বল্প মূল্যে পাওয়া যায়’—এ বিবেচনায় গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি ক্রয় করে নিয়ে যাচ্ছেন। শহুরে বাজারের পাইকাররা গ্রামে এসে সবজি ক্রয় করে পিকআপ ভ্যানে নিয়ে যাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে শহরের সুপারশপগুলোর মালিকরাও গ্রামে জমি ক্রয় বা ভাড়া নিয়ে নিজস্ব তত্ত্বাবধানে সবজি উৎপাদন করছেন বা সরাসরি গ্রামের কৃষক থেকে পণ্য নিয়ে যাচ্ছেন। ‘পাইকার’ শ্রেণীর আবির্ভাব গ্রামের হাটবাজারের অবকাঠামোগত পরিবর্তনে প্রভাব না ফেললেও বাজার ব্যবস্থাপনাকে পরিবর্তন করছে। 

কৃষি প্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তৃতি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে নতুন নতুন পণ্যের সঙ্গে যোগাযোগ ঘটাচ্ছে, যা গ্রামীণ বাজারকে সম্প্রসারণ করছে। বাজার ব্যবস্থার এ ধরনের রূপান্তর গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। হাটবাজারের রূপান্তর গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন ও ভোগবাদী আচরণকেও প্রভাবিত করে। কৃষিবহির্ভূত পেশার প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধি, নতুন অবকাঠামো, পণ্য ও বিক্রয় ব্যবস্থাপনার ধরনগুলো গ্রামীণ হাটবাজার ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে প্রতিনিয়ত নতুন অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করে।

তবে হাটবাজারের সম্প্রসারণ বা রূপান্তরের বিষয়াবলি সব গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে একইভাবে প্রভাবিত করে না। অনেক ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র উৎপাদক শ্রেণীর অবস্থান আরো প্রান্তিক হয়ে পড়ে। যোগাযোগ দক্ষতা, শহরের বাজারে সরাসরি প্রবেশের অধিকার বা সুযোগ না থাকার কারণে ক্ষুদ্র উৎপাদক তাদের পণ্য মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হন। পাইকার বা মধ্যস্বত্বভোগীরা গ্রাম থেকে স্বল্প মূল্যে পণ্য ক্রয় করে শহরের বাজারে অধিক মূল্যে বিক্রি করে। এক্ষেত্রে বাজার সম্প্রসারিত হলেও ক্ষুদ্র উৎপাদকের আর্থসামাজিক অবস্থান পরিবর্তন হয় না। তাই গ্রামীণ বাজারের রূপান্তরকে শুধু পরিধিগত সম্প্রসারণ বা অবকাঠামোগত বিষয় দিয়ে বিবেচনা করলে প্রান্তিক উৎপাদক শ্রেণীর অভিজ্ঞতা যথাযথভাবে প্রকাশ পায় না। হাটবাজারের পরিধি ও অবকাঠামোগত সম্প্রসারণের পাশাপাশি গ্রামীণ উৎপাদক যাতে পণ্য বিক্রয়ের জন্য বৃহত্তর বাজারে প্রবেশের সুযোগ পান, সেদিকে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন।

[নিবন্ধে উল্লিখিত কিছু তথ্য লেখকের সম্প্রতি প্রকাশিত গ্রামীণ সমাজ ও কৃষি কাঠামো: সাম্প্রতিক পরিবর্তন গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত]

 

ড. রঞ্জন সাহা পার্থ: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের

নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক; বর্তমানে তিনি জাপানের

টোকিও ইউনিভার্সিটি অব ফরেন স্টাডিজে ভিজিটিং

প্রফেসর হিসেবে কর্মরত