জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টায় বাংলাদেশীদের অবস্থান বর্তমানে বিশ্বে চতুর্থ। করোনা সংক্রমণের ভয় উপেক্ষা করেই গত দেড় বছরে ইউরোপে অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টা করেছেন ৫ হাজার ৩৬০ জন বাংলাদেশী, যা উদ্বেগজনক। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপ অভিমুখে শরণার্থীদের যে স্রোত, তাতে অসংখ্য বাংলাদেশী রয়েছেন। বিশেষ করে লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ইতালি (সেন্ট্রাল মেডিটেরিয়ান রুট) যাচ্ছেন হাজার হাজার বাংলাদেশী। এভাবে যেতে গিয়ে প্রতারণার ঘটনা ঘটছে। সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে ট্রলারডুবিতে অনেকে মারাও যাচ্ছেন। ইউরোপের জেলে বন্দি রয়েছেন অনেকে। কেউবা গ্রেফতার হচ্ছেন। ইউরোপে অবৈধভাবে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নাম আসায় আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। মধ্য আয়ের দেশসহ বিভিন্নভাবে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং করা হলেও যুদ্ধ চলমান দেশগুলোর মানুষের অবৈধভাবে প্রবেশের সঙ্গে বাংলাদেশীরা কেন প্রবেশ করছে, বিশ্বের বিভিন্ন ফোরামে তার উত্তর দিতে আমাদের বেগ পেতে হচ্ছে। অবৈধ অভিবাসন বন্ধে সরকারকে আরো কঠোর ও শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে।
অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন মূলত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর একটি বড় সমস্যা। কারণও মূলত একই রকম। দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব একটি বড় কারণ। তাছাড়া ভৌগোলিক অবস্থান ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের কারণে বাংলাদেশ মানব পাচারের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। বিদ্যমান অবস্থা বজায় থাকলে জনশক্তি রফতানিতে বাংলাদেশ কালো তালিকাভুক্ত হয়ে যেতে পারে। আমরা যখন উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন দেখছি, তখন অবৈধ অভিবাসন একটি বড় সমস্যা বৈকি। আইনের কড়াকড়ি এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু কেবল আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়। যারা অবৈধ অভিবাসনপ্রত্যাশী বা দালাল চক্র সহজেই যাদের এ পথে প্রভাবিত করতে পারে, তারা আর্থিকভাবে দরিদ্র। জীবন ও জীবিকার যুদ্ধে লিপ্তদেরই দালালরা স্বপ্ন দেখায়। আমাদের এ স্বপ্নবৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার পথের সন্ধান করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, প্রবাসী আয় আমাদের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের রক্ষায় সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে বৈধ পথে দক্ষ জনশক্তি রফতানির পথও খুঁজে বের করতে হবে।
বৈধ পথে ইউরোপ, আমেরিকায় যাওয়ার সুযোগ বাড়লে পরিস্থিতি এমন হতো না। বৈধ পথে যেতে হলে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে। এ জায়গায় বাংলাদেশের ঘাটতি দৃশ্যমান। কোন দেশে কেমন জনশক্তি প্রয়োজন তা যাচাই এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। মানসম্মত অভিবাসনের দিকে নজর দিতে হবে সরকারকে। অনেকদিন ধরেই দালালরা সাগরপথে লোকজনকে ইউরোপে পাচার করতে সক্রিয় রয়েছে। দালালরা নানা কৌশল ও প্রলোভনে অনেককে ফাঁদে ফেলছে। নিশ্চিত মৃত্যু, ভয়ংকর পথে কেন বাংলাদেশীরা অবৈধভাবে সমুদ্রপথে ইউরোপ যাত্রা করছেন, এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অনেকেরই ধারণা, মূলত ইউরোপে গেলেই ভাগ্য ফিরবে—এমন আশায়ই লোকজন যাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিরিয়া-লিবিয়ায় না হয় যুদ্ধ চলছে, তাই সেখানকার নাগরিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথ পাড়ি দিতে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু বাংলাদেশীরা কেন জীবনের এত ঝুঁকি নিচ্ছেন? শুধুই কি ভাগ্য অন্বেষণ, নাকি যেকোনোভাবে বিদেশে যাওয়ার নেশা? বিশ্লেষকরা নানা তথ্য টানছেন। তাদের বিশ্লেষণে অনেক কিছু বেরিয়ে এসেছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম সম্প্রতি তরুণদের নিয়ে যে জরিপ করেছে, সেটাও রেফারেন্স হিসেবে আনছেন তারা। ওই জরিপ বলছে, আরো ভালো জীবনযাপন এবং পেশার উন্নতির জন্য বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ৮২ শতাংশ তরুণই নিজের দেশ ছেড়ে চলে যেতে চান। অবৈধ অভিবাসন রোধে ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার উদাহরণ এক্ষেত্রে বিশেষভাবে গ্রহণ করা যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলো দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং শক্তিশালী অভিবাসন প্রক্রিয়া গড়ে তুলেছে। সেখানে দালাল বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের সুযোগ কম। কারণ তাদের রয়েছে অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভিন্ন ইউনিট। প্রচারণার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনে মানুষকে অনুৎসাহিতও করেছে তারা। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত তদারকি সংস্থাই অভিবাসন বিষয়গুলো দেখভাল করে। ভিয়েতনাম প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিটি অভিবাসনপ্রত্যাশীর বিষয়গুলো ট্র্যাক করে থাকে। আমাদের এখানেও এমন উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর প্রচুরসংখ্যক শ্রমিক বিদেশে যাচ্ছে, কিন্তু তৃণমূলে অভিবাসী সেবাদানকারী নির্ভরযোগ্য কোনো প্রতিষ্ঠান না থাকায় সঠিক তথ্য ও সহযোগিতা পেতে বিদেশগামীদের প্রায়ই মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে। অপর্যাপ্ত বা ভুল তথ্য ও দালালের মিথ্যা আশ্বাসে পড়ে মানুষ যেমন বিভ্রান্ত হয়, তেমনি আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়। সুতরাং নিরাপদ শ্রম অভিবাসন নিশ্চিতকরণে মানুষের দোরগোড়ায় সেবা নিশ্চিত করতে হলে তৃণমূল পর্যায়ে সঠিক সেবাদানকারীর উপস্থিতি নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু সদিচ্ছা থাকলেও সরকারের পর্যাপ্ত সক্ষমতা না থাকায় সেবার মান মাঠপর্যায়ে বিস্তৃত করাও সহজে সম্ভব হয় না। ফলে পাচারকারীরা মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগে ক্ষতি করতে দ্বিধাবোধ করে না। বিগত পাঁচ বছরের সংবাদপত্রের চিত্র থেকে জানা যায়, অভিবাসনপ্রত্যাশী মানুষকে প্রলোভন দিয়ে একশ্রেণীর অসাধু মানব পাচারকারী সাগরপথে মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে নিয়ে যাচ্ছে। আবার অভিবাসনপ্রত্যাশীদের কেউবা ভূমধ্যসাগর বা অনুমোদিত নয় এমন ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইউরোপে পাড়ি দিতে গিয়ে অর্থ ও জীবন দুটিই হারাচ্ছে। এটি বন্ধে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তায় বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের মাধ্যমে বিষয়টি বিশ্লেষণপূর্বক পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে।
বাংলাদেশ সরকার অনিয়মিত অভিবাসন বন্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারেনি। যার কারণে আমরা ভূমধ্যসাগরে দেখছি যত নৌকাডুবির ঘটনা আছে, সেখানে অর্ধেকের বেশি বাংলাদেশী। বঙ্গোপসাগর ব্যবহার করে রোহিঙ্গা থেকে শুরু করে বাংলাদেশীরাও মালয়েশিয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশের অভিবাসন-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এসব বিষয়ে পদক্ষেপ না নেয়ায় বোঝা যায় তারা এটিকে উৎসাহিত করছে। আমাদের একটি শক্তিশালী মানব পাচার প্রতিরোধ আইন আছে। কিন্তু সেই আইনের কোনো প্রয়োগ নেই। মানব পাচার আইনেও একটি ট্রাইব্যুনাল করার কথা আছে। সেই ট্রাইব্যুনাল আজও হয়নি। অবৈধ অভিবাসন রোধে কর্মসংস্থানের নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি, প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম-দুর্নীতি দূর করা, মেধা ও দক্ষতার যথাযথ মূল্যায়নের ওপর জোর দিতে হবে। অবৈধ উপায়ে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা বন্ধে সবার আগে জনসচেতনতার ওপর জোর দিয়ে অভিবাসী আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন, দালাল চক্রকে আইনের আওতায় আনা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিবাসনবান্ধব পদক্ষেপ নিতে হবে। বিগত সময়ের যে ঘটনাগুলো ঘটেছে তা থেকে নির্দিষ্ট করে রিক্রুটিং এজেন্সি এবং দালালদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করা দরকার। কিন্তু সরকার এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায় একের পর এক ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে। অবৈধ অভিবাসন বন্ধে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ এবং বৈধ অভিবাসনের পথও উন্মোচন করতে হবে।










