বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৭০০ পণ্যে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে কানাডা। মঙ্গলবার ঘোষিত এ শুল্ক আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হবে। এর মধ্য দিয়ে দুদেশের চলমান বাণিজ্যযুদ্ধ আরো তীব্র হলো। খবর দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।

কানাডা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক, উৎপাদক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষা দেয়াই পাল্টা শুল্ক আরোপের মূল উদ্দেশ্য। নতুন তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রয়েছে। একই পরিমাণ মূল্যের কানাডীয় পণ্যে নতুন করে শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

কানাডার নতুন শুল্কের হার হবে ৫০, ২৫ ও ১৫ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ হলো যুক্তরাষ্ট্রের ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর শুল্ক দ্বিগুণ করে ৫০ শতাংশ করা। নতুন তালিকায় অ্যালুমিনিয়ামের ফয়েল, রেলওয়ের লোকোমোটিভ ও ইস্পাতের সেতুর মতো পণ্যও রয়েছে।

কানাডার নতুন শুল্ক তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের এমন অনেক পণ্য রয়েছে, যেসব পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রও শুল্ক আরোপ করেছে। এর মধ্যে পোশাক, বনজ পণ্য ও বিভিন্ন সরঞ্জাম রয়েছে। পাশাপাশি ডিশওয়াশার, ওয়াশিং মেশিন ও চুলার মতো ভোগ্যপণ্যের ওপরও শুল্ক বসিয়েছে কানাডা। তাজা ও হিমায়িত বিভিন্ন ধরনের মাছও রয়েছে এ তালিকায়।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায় বড় ধরনের উত্তেজনার একটি কারণ ছিল গাড়িতে ২৫ শতাংশ শুল্ক। কানাডার গুরুত্বপূর্ণ রফতানি পণ্য গাড়ির ওপর প্রায় ১৮ মাস আগে এ শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। মঙ্গলবার কানাডা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি গাড়ির ওপর পাল্টা শুল্ক ২৫ শতাংশই রাখা হবে। পাশাপাশি কানাডায় গাড়ি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানি করতে পারবে—এ ব্যবস্থাও বহাল থাকবে। কানাডার নাগরিকরা যুক্তরাষ্ট্রে যত গাড়ি বিক্রি করে, তার চেয়ে বেশি গাড়ি যুক্তরাষ্ট্র থেকে কিনে থাকে।

সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গাড়িতে শুল্ক দ্বিগুণ করে ৫০ শতাংশ করার হুমকি দেন। এ হার কার্যকর হলে কানাডার গাড়ি শিল্প বড় সংকটে পড়তে পারে। দেশটির গাড়ি কারখানাগুলো উৎপাদিত গাড়ির ৯০ শতাংশের বেশি রফতানি করে। কানাডা থেকে আমদানি করা গাড়ির যন্ত্রাংশেও ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। বর্তমানে উত্তর আমেরিকায় তৈরি হিসেবে নির্ধারিত শর্ত পূরণকারী কানাডীয় গাড়ির যন্ত্রাংশ যুক্তরাষ্ট্রে শুল্কমুক্তভাবে বিক্রি করা যায়। তবে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যকার মুক্তবাণিজ্য চুক্তি ভেঙে পড়ায় এ সুবিধাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

ওয়াশিংটনে বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের সমপরিমাণ ‘ডলার-ফর-ডলার’ পাল্টা শুল্ক আরোপ করবে কানাডা। তবে তিনি স্বীকার করেন, এর ফলে ‘কানাডীয়দের ব্যয় বাড়বে এবং পণ্যের পছন্দ কমে যাবে’। মঙ্গলবার শুল্ক ঘোষণার দায়িত্ব কয়েকজন মন্ত্রীর ওপর ছেড়ে দেন কার্নি। ওই দিন তার কোনো প্রকাশ্য কর্মসূচি ছিল না।

প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ২৭২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে কানাডা। কানাডীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পাল্টা শুল্ক থেকে যে রাজস্ব আসবে, তার চেয়ে কানাডীয় রফতানিকারকদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে সরকারকে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে। ফলে শুল্ক আরোপের লক্ষ্য রাজস্ব আয় নয়; বরং কানাডীয় উৎপাদকদের সুরক্ষা দেয়া।

অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির আকার কানাডার প্রায় ১২ গুণ হওয়ায় কানাডার পাল্টা শুল্কের প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত হবে। তবে একই সঙ্গে তারা সতর্ক করেছেন, পাল্টা শুল্কের কারণে পণ্যের দাম বাড়লে শেষ পর্যন্ত কানাডীয় প্রতিষ্ঠানগুলোরই ক্ষতি হতে পারে।

ট্রাম্পের নতুন ৫০ শতাংশ শুল্ক শনিবার কার্যকর হওয়ার আগে পরিচালিত জনমত জরিপগুলোতে দেখা গেছে, অর্থনৈতিক পাল্টা ব্যবস্থা নেয়ার পক্ষে কানাডীয়দের ব্যাপক সমর্থন রয়েছে। তবে প্রাদেশিক নেতাদের মধ্যে এ বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। কানাডার সবচেয়ে জনবহুল প্রদেশ অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড পাল্টা শুল্ক আরোপের জোরালো সমর্থক। দেশটির উৎপাদনশিল্পের বড় অংশ এ প্রদেশে অবস্থিত। অন্যদিকে কানাডার তেল রফতানির প্রধান কেন্দ্র আলবার্টার প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথ সংযমের আহ্বান জানিয়েছেন।

এদিকে ট্রাম্পের শুল্কের আওতার বাইরে রয়েছে কানাডার তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, সার উৎপাদনে ব্যবহৃত পটাশ এবং বেশ কিছু খনিজ পণ্য।