গাজা উপত্যকা থেকে হামাসকে নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। কিন্তু এর আগে ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্স যে হামাসের মুখোমুখি হয়েছিল —এবার পরিস্থিতি অনেকটাই ভিন্ন।  এবার তাদের এমন হামাসের মুখোমুখি হতে হচ্ছে যারা কিনা আগের চেয়ে আরো সংগঠিত এবং অস্ত্র ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে শক্তিশালী।  অনেকেই মনে করেন, তাদের এই শক্তির উৎস গাজার ছোট সুড়ঙ্গ দিয়ে আসা ইরান ও অন্য আরব মিত্রদের সহায়তা।

২০০৭ সালে গাজার  নিয়ন্ত্রণ নেয় হামাস।  শক্তিমত্তায় তখন হামাস যে অবস্থায় ছিল সে তুলনায় এবারের হামলায় এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে তারা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কয়েক গুণ বেশি শক্তি সঞ্চয় করেছে।  হামাস এখন সামরিক সরঞ্জাম ও দক্ষতার দিক থেকেও আগের চেয়ে অনেক বেশি সক্ষমতা অর্জন করেছে।

তবে প্রশ্ন উঠেছে সার্বক্ষণিক ইসরায়েল তথা মোসাদের নাকের ডগায় থাকা হামাস কিভাবে সামরিক সক্ষমতা অর্জন করল?

সশস্ত্র এই সংগঠনের শীর্ষ কর্মকর্তা আল বারাকার মতে, প্রয়োজনীয়তাই উদ্ভাবনের জনক। তিনি জানান, ইরান এবং হিজবুল্লার মত মিত্রদের কাছ থেকে অর্থ ও প্রশক্ষণ পেয়েছে হামাস।  তিনি আরো বলেন, গত ৯ বছরে গাজায় অস্ত্র আনা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে।  ফলে হামাস স্থানীয়ভাবে অস্ত্র উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়িয়েছে।

২০০৮ সালের গাজায় ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় হামাস যে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল সেটি সর্বোচ্চ ৪০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুকে আঘাত হানতে সক্ষম ছিল।  কিন্তু ২০২১ সালে দেখা যায় হামাসের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ২৩০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা অর্জন করেছে।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩৬ বছর আগে লিফলেট বিলি করে আত্মপ্রকাশ করা হামাসকে এখন একটি মিনি আর্মিও বলা যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক হামাস যোদ্ধা রয়টার্সের সাংবাদিককে বলেছেন, হামাস এখন ৪০ হাজার সদস্যের একটি দল। যাদের সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, নৌ কমান্ডোসহ আরো বিশেষ বিশেষ প্রশিক্ষণ রয়েছে।  অথচ গ্লোবাল সিকিরিউটির ওয়েবসাইটের তথ্যমতে, নব্বইয়ের দশকে হামাসের সৈন্য সংখ্যা ছিল দশ হাজারের মতো।

২০০০ সালের দিকে হামাস গাজা উপত্যকা জুড়ে সুড়ঙ্গ তৈরি করেছিল। মিত্রদের থেকে যুদ্ধাস্ত্র সংগ্রহে ব্যবহৃত হচ্ছে এই সুড়ঙ্গ। এছাড়াও এই সুড়ঙ্গগুলো হামাসের যুদ্ধ সরঞ্জাম মজুতের ঘাঁটি হসেবেও ব্যবহার হয়।   উপত্যকাজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এই সুড়ঙ্গগুলো ইসরায়েলি বাহিনীকে ধাঁধায় ফেলতে বাধ্য।  সুড়ঙ্গের কোনো সঠিক তথ্যও নেই ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের কাছে।

ইসরায়েলের সৈন্য নিহতের সংখ্যা থেকেও হামাসের আকার আঁচ করা যায়।  ২০০৮ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে হামাস-ইসরায়েল দ্বন্দে প্রাণ হারিয়েছিল ৯ ইসরায়েলি সেনা।  অথচ গত ছয় দিনে এই হামাস যোদ্ধাদের হাতে প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ৬৬ জন ইসরায়েলি সেনা।

গত ৭ অক্টোবরের ওই হামলায় কিছুক্ষণের মধ্যে কমপক্ষে আড়াই থেকে ৫ হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে হামাস।  এমনকি তাদের প্যারাগ্লাইডাররা ইসরায়েলি ডিফেন্সকে ফাঁকি দিয়ে গ্লাইডিং করে ইসরায়েলে প্রবেশ করেছে।  মোটরবাইক ও চার চাকার যান নিয়ে হামাসের সদস্যরা ইসরায়েলি ডিফেন্স ভেঙে ফেলেছে।

হামাসের এই উত্থানের পেছনে পশ্চিমারা মূলত ইরানকেই দায়ী করছেন।   গত বছর আলজারিরাকে হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়া বলেছিলেন,  বছরে হামাস ইরান কাছ থেকে ৭০ মিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা পায়।  তিনি আরো জানিয়েছিলেন, স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামাস নিজেরাই তৈরি করে তবে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইরান ও সিরিয়া অঞ্চল থেকে আসে মিসর হয়ে।

তবে এই হামলার পেছনে ইরানের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল বলে মনে করেন না নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।  হামাসকে অর্থ সাহায্যের বিষয়টি স্বীকার করলেও হামলায় সম্পৃক্ততার বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছে তেহরানও। যদিও তেহরান এই হামলার প্রশংসা করেছে। 

তবে হামাসের এই হামলার পর ইসরারয়েলের জন্য বড় আশঙ্কার বিষয় তাদের গোয়েন্দা ব্যর্থতা।  অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, এই হামলার বিষয়ে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের কাছে কোনো তথ্যই ছিল না।  ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেত ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দুর্ধর্ষ গোয়েন্দা হিসেবে পরিচিত মোসাদের শক্তি ও নজরদারি সরঞ্জামকে ফাঁকি দিয়ে হামাস কিভাবে এত বড় হামলা চালাল তার জবাব খুঁজতেই ঘাম ছুটছে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের।