প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকটকে নতুন সরকার গঠনের দায়িত্ব দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে কোনো পক্ষই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় ইসরায়েলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে গতকাল নতুন সরকার গঠনের দায়িত্ব পেলেন আইজেনকট। খবর রয়টার্স।
ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা নেতা নেতানিয়াহু এখনো ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। গত ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে তার ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও পার্লামেন্টে এখনো একক বৃহত্তম জোট।
সাবেক সেনাপ্রধান আইজেনকট অবশ্য আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গড়তে রাজি নন। অথচ এসব দলের সমর্থন পেলে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবেন তিনি। তবে নেতানিয়াহু ও তার কট্টর ডানপন্থী মিত্রদের বর্ণবাদী নীতির বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ আরব নেতারা প্রথমে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেয়ার জন্য আইজেনকটের নাম প্রস্তাব করেন। ফলে অন্য প্রার্থীদের তুলনায় তার প্রতি বেশি সমর্থন জানিয়েছেন পার্লামেন্ট সদস্যরা।
প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের মুখপাত্র বলেন, ‘গাদি আইজেনকটকে প্রেসিডেন্টের বাসভবনে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট হারজগ। আগামীকাল তাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেয়া হবে।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া পোস্টে আইজেনকট লিখেছেন, ‘এখন জাতীয় জরুরি সরকার গঠনের সময়। আমরা যেন সেই দায়িত্ব পালনের যোগ্য হই, তা নিশ্চিত করতে আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব।’
আইজেনকটের জন্য সরকার গঠন হবে কঠিন চ্যালেঞ্জ
আইজেনকটকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেয়ার পর কয়েক সপ্তাহ ধরে দীর্ঘ আলোচনা ও দর-কষাকষি চলতে পারে। সরকার গঠনের জন্য তিনি ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজনে আরো ১৪ দিন সময় বাড়ানো যেতে পারে।
সরকার গঠনের জন্য তার সামনে কয়েকটি পথ খোলা রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আরব দলগুলোর ভোটের সমর্থন নিয়ে সংখ্যালঘু সরকার গঠন করতে পারেন তিনি। অতীতে যেসব অতি-ধর্মীয় ইহুদি দলের সঙ্গে জোট গড়তে তিনি ও তার মিত্ররা অনাগ্রহ দেখিয়েছেন, তাদের সঙ্গে সমঝোতায়ও যেতে পারেন। অথবা নেতানিয়াহুর সঙ্গে মিলে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের চেষ্টা করতে পারেন।
তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, এই তিনটি পথের কোনোটিই বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি নয়।
আইজেনকট ব্যর্থ হলে অন্য কোনো প্রার্থীকে সরকার গঠনের সুযোগ দেয়া হবে। সেই প্রার্থীও ব্যর্থ হলে পার্লামেন্ট অন্য কাউকে মনোনীত করতে পারবে। পুরো প্রক্রিয়া শেষ করার জন্য প্রায় ১০০ দিনের সময়সীমা রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে কেউ সরকার গঠনে সফল না হলে আবার নির্বাচন হবে।
১২০ আসনের ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে একক দল হিসেবে সবচেয়ে বেশি ২৭টি আসন পেয়েছে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি। তবে তার ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী জোট সব মিলিয়ে পেয়েছে ৫৩টি, যা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের চেয়ে যা আটটি কম।
অন্যদিকে, আইজেনকটের ইয়াশার পার্টি ২১টি আসন পেয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। মধ্য-বাম থেকে ডানপন্থী অবস্থানের চারটি ইহুদি-নেতৃত্বাধীন দল নিয়ে গঠিত তার জোট পেয়েছে মোট ৪৮টি আসন। আর ইসরায়েলের আরব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী দুটি দল পেয়েছে রেকর্ড ১৯টি আসন।
ফিলিস্তিনিদের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার সমালোচক আইজেনকট
মরক্কো থেকে ইসরায়েলে আসা অভিবাসীদের পরিবারে জন্ম নেওয়া ৬৬ বছর বয়সী আইজেনকট দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন, যিনি ইসরায়েলের মিজরাহি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় শিকড় থাকা ইহুদিদের মিজরাহি বলা হয়।
কিছুটা অন্তর্মুখী ও সংবাদমাধ্যম থেকে দূরে থাকা আইজেনকট ২০২২ সালে রাজনীতিতে যোগ দেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় অল্প সময়ের জন্য দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরে আবার বিরোধী দলে ফিরে যান।
বিরোধী দলে থাকাকালে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের প্রকাশ্য সমালোচনা করেছেন আইজেনকট। বিশেষ করে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান পরিচালনার বিষয়ে নেতানিয়াহুর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কোনো সরকারে আর দায়িত্ব পালন করবেন না বলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
২০২৩ সালের পর থেকে আইজেনকটের পরিবারকেও বড় মূল্য দিতে হয়েছে। গাজায় যুদ্ধ করতে গিয়ে তার এক ছেলে ও দুই ভাতিজা নিহত হয়েছেন। ব্যক্তিগত জীবনের এই ক্ষতিও জনপরিসরে তার অবস্থানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
নির্বাচনী প্রচারে নিজের সামরিক অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন আইজেনকট। এ সময় তিনি ‘দাহিয়েহ ডকট্রিন’-এর কথা উল্লেখ করেন। এই নীতি অনুযায়ী, কোনো হামলার জবাবে অসমানুপাতিক মাত্রায় শক্তি প্রয়োগ করা হয়। ২০০৬ সালে লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধে সামরিক কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি এই নীতি প্রয়োগ করেছিলেন।
২০২৩ সালের পর থেকে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বেড়েছে। এ ধরনের সহিংসতার সমালোচনা করেছেন আইজেনকট। এতে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কেও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী জোটসঙ্গী ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোট্রিচেরও বিরোধিতা করেন তিনি। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দেয়ার অভিযোগে পশ্চিমা কয়েকটি দেশ তাদের দুজনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।















