যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে আবারো বড় ধরনের যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। আগের সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক স্থাপনা পুনর্নির্মাণ, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা পুনরুদ্ধার এবং নতুন লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে জোর দিচ্ছে দেশটি। পাশাপাশি পরিবর্তন আনা হচ্ছে সামরিক কৌশলেও। পরবর্তী সংঘাতে শুধু মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি কিংবা ইসরায়েলের সামরিক স্থাপনায় হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না তেহরান। উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি কেন্দ্র, সমুদ্রের তলদেশের ইন্টারনেট কেবল এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের মার্কিন সামরিক স্থাপনাও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় রয়েছে। ইরানের সামরিক কর্মকর্তাদের হুঁশিয়ারি, নতুন করে আক্রান্ত হলে এবারের পাল্টা হামলা হবে আগের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত ও বিধ্বংসী।

ইরানের সামরিক প্রস্তুতির বিষয়টি সামনে এসেছে সাম্প্রতিক উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণেও। বিবিসি ভেরিফাইয়ের গত শুক্রবার প্রকাশিত অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তেহরানের কাছে কারাজের গার্মদারেহ এবং উত্তরাঞ্চলের শাহরুদ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে ব্যাপক নির্মাণকাজ চলছে। ব্রিটিশ গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান এমএআইএআরের বিশেষজ্ঞরা উপগ্রহচিত্রে নতুন স্থাপনা নির্মাণ ও ভূগর্ভস্থ অবকাঠামো সম্প্রসারণের প্রমাণ পেয়েছেন। অন্তত আরো ১২টি সামরিক স্থাপনায় মেরামত ও পুনর্নির্মাণের কাজ শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পশ্চিমাঞ্চলের কেরমানশাহ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং তেহরানের পূর্বাঞ্চলের পারচিন সামরিক কমপ্লেক্স।

বিশ্লেষকদের ধারণা, নতুন নির্মাণকাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ব্যবস্থা আরো গভীরে সরিয়ে নেয়া। শাহরুদ ঘাঁটিতে চলমান খননকাজ ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। কারাজেও ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় প্রবেশের নতুন পথ শনাক্ত হয়েছে। এসব স্থাপনা ভবিষ্যতে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলা থেকে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সক্ষমতা রক্ষায় ব্যবহার করা হতে পারে।

গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও পারমাণবিক অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের দাবি ছিল, হামলায় ইরানের ড্রোন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও নৌবাহিনীর শিল্পভিত্তির প্রায় ৯০ শতাংশ ধ্বংস হয়েছে। তবে পরবর্তী গোয়েন্দা মূল্যায়নে দেশটির উল্লেখযোগ্য সামরিক সক্ষমতা টিকে থাকার তথ্য পাওয়া যায়। মার্কিন ও মধ্যপ্রাচ্যের কর্মকর্তাদের বরাতে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছিল, ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় মজুদ যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে আবারো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সংযোজন শুরু করেছে ইরান। যদিও উৎপাদন এখনো যুদ্ধ-পূর্ববর্তী পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

সামরিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের পাশাপাশি প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়াতে সাধারণ নাগরিকদেরও প্রশিক্ষণ দিচ্ছে তেহরান। রাজধানীর উত্তরাঞ্চলে সম্প্রতি জানফাদা নামে স্বেচ্ছাসেবী যোদ্ধা সংগ্রহ কর্মসূচির নতুন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র উদ্বোধন করা হয়েছে। সেখানে মেশিনগান চালানো, উঁচু স্থাপনা অতিক্রম এবং দড়ি ব্যবহার করে নিচে নামার প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। সম্ভাব্য স্থল আক্রমণ মোকাবেলায় সেনাবাহিনীর সহায়ক শক্তি গড়ে তোলাই এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য।

ইরানের সামরিক নেতৃত্বও প্রকাশ্যে বড় ধরনের পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। দেশটির সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া গতকাল জানান, মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের অভিজ্ঞতায় ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এখন যুদ্ধের শুরুর তুলনায় বেশি শক্তিশালী ও প্রস্তুত। সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশ অনুযায়ী ভবিষ্যতে যেকোনো আক্রমণের জবাব হবে তাৎক্ষণিক, কার্যকর এবং ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতামুক্ত। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও মার্কিন সামরিক স্থাপনা হামলার লক্ষ্য হতে পারে।

সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনিও সামরিক বাহিনীকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকা হালনাগাদের নির্দেশ দিয়েছেন। তেহরানের নতুন কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে সর্বোচ্চ প্রতিরোধ সক্ষমতা প্রতিষ্ঠা। এর উদ্দেশ্য হলো পরবর্তী যুদ্ধকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এতটাই ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিত করে তোলা, যাতে ওয়াশিংটন নতুন হামলার সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে বারবার চিন্তা করে।

আন্তর্জাতিক থিংকট্যাংক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলি ওয়ায়েজের মতে, আগের সংঘাতে প্রকাশ পাওয়া দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে কাজ করছে ইরান। একই সঙ্গে দেশটি ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুনর্গঠন ও আরো বিস্তৃত সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে। পরবর্তী যুদ্ধের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি এবং তা নিয়ন্ত্রণের অনিশ্চয়তাকে প্রতিরোধক শক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে চায় তেহরান।

ইরানের নতুন সামরিক পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো। দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কমান্ডার ইয়াদোল্লাহ জাভানি সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিতে সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে যাওয়া ইন্টারনেট কেবলকে সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলের তথ্যকেন্দ্র, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংশ্লিষ্ট অবকাঠামো এবং জ্বালানি স্থাপনায় হামলার হুমকিও এসেছে।

ক্যালিফোর্নিয়ার নেভাল পোস্টগ্র্যাজুয়েট স্কুলের ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আফশোন ওস্তোভারের মতে, ইরান এখন সামরিক স্থাপনার বাইরেও অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামোকে হামলার আওতায় আনার সক্ষমতা প্রদর্শন করতে চাইছে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কাছে সম্ভাব্য যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্য বাড়িয়ে তোলার বার্তা দেয়া হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও সংঘাত সম্প্রসারণের আলোচনা শুরু হয়েছে ইরানে। দেশটির হামশাহরি পত্রিকা সম্প্রতি ইউরোপের মানচিত্র প্রকাশ করে জানিয়েছে, সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তু হালনাগাদ করছে সশস্ত্র বাহিনী। ইউরোপে অবস্থিত মার্কিন বিমান ও নৌঘাঁটি এবং সামরিক সরবরাহ অবকাঠামো এ আলোচনায় এসেছে। তবে এসব স্থাপনায় হামলা চালানোর সক্ষমতা ইরানের বর্তমানে কতটা রয়েছে, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

নতুন যুদ্ধের প্রস্তুতির মধ্যেই ইরানের পারমাণবিক নীতি পরিবর্তনের দাবিও জোরালো হচ্ছে। দেশটির কয়েকজন কট্টরপন্থী আইনপ্রণেতা ও ধর্মীয় নেতা ভবিষ্যৎ আক্রমণ ঠেকাতে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পক্ষে মত দিয়েছেন। যদিও জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাই জানিয়েছেন, পারমাণবিক নীতি পরিবর্তনের বিষয়ে এখনো কোনো নতুন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি।

এদিকে যুদ্ধ বিস্তারের আশঙ্কা বাড়িয়েছে হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপে সাম্প্রতিক মার্কিন হামলা। গত শুক্রবার দ্বীপটিতে নতুন হামলার কথা নিশ্চিত করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সময়ে তিনি ইরানের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতির দাবিও করেন। অন্যদিকে তেহরান জানিয়েছে, নিজেদের শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা হবে না।

যুদ্ধ এড়াতে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় কূটনৈতিক তৎপরতাও অব্যাহত রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ সম্পদ ছাড় এবং ভবিষ্যতে হামলা বন্ধের নিশ্চয়তাসহ গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলোয় দুই পক্ষের মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, নতুন সংঘাত শুরু হলে ইরানের মিত্র হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাকের শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও এতে জড়িয়ে পড়তে পারে। পাল্টা হামলায় সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোর সরাসরি অংশগ্রহণের ঝুঁকিও রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের পরবর্তী বড় সংঘাত শুধু সামরিক যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহ, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে।