দুই দেশে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৭৬ এবং নিখোঁজ প্রায় তিন হাজার। নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ গতকাল জানায়, দেশটিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬৬৯-এ দাঁড়িয়েছে। নিখোঁজ রয়েছে ২ হাজার ৪২৬ জন। অন্যদিকে চীনের তিব্বত অঞ্চলে সাতজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে, নিখোঁজ ৫৫০ জনের বেশি। নেপালে এ পর্যন্ত উদ্ধার করা হয়েছে ৩ হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষকে।
প্রায় তিন কোটি মানুষের দরিদ্র হিমালয় রাষ্ট্র নেপাল এ বিপর্যয় সামাল দিতে বিশেষায়িত আন্তর্জাতিক সহায়তা চেয়েছে। দেশটির অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন, দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্গঠনে প্রাথমিক হিসাবে ৪০০-৫০০ কোটি ডলার প্রয়োজন হতে পারে।
বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত নেপালের নুয়াকোট জেলায় হেলিকপ্টারে করে ত্রাণ ও উদ্ধার তৎপরতা চালানো হচ্ছে। কাপড়, চাল, ইনস্ট্যান্ট নুডলস ও শুকনো খাবার নিয়ে হেলিকপ্টারগুলো দুর্গত এলাকায় যাচ্ছে। ফেরার পথে নিয়ে আসছে বেঁচে যাওয়া মানুষকে। অনেকেই শুধু পরনের কাপড় নিয়ে উদ্ধার কেন্দ্রে পৌঁছেছে। তবে দুর্গত ত্রিশূলী থেকে মানুষ সরে গেলেও কেউ কেউ ফিরছে ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়া বাড়ি থেকে কিছু উদ্ধার করা যায় কিনা দেখতে।
রাজধানী কাঠমান্ডুর প্রধান সরকারি হাসপাতালের বাইরে ভিড় করছে নিখোঁজদের স্বজনরা। কারো হাতে প্রিয়জনের ছবি, কেউ হেল্প ডেস্ক ও হাসপাতালের নোটিস বোর্ডের মধ্যে ছোটাছুটি করছে। আহতদের তালিকায় পরিচিত কোনো নাম আছে কিনা সেটিই তাদের একমাত্র ভরসা।
রাসুয়া জেলার একটি জলবিদ্যুৎ কোম্পানির চালক ২৬ বছর বয়সী ভাইকে খুঁজতে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরের রামেছাপ থেকে এসেছেন দিল মায়া লামা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘চারদিন পেরিয়ে গেলেও ভাইয়ের কোনো খোঁজ নেই।’ একইভাবে নিখোঁজ ভাইয়ের সন্ধানে আসা নেলজা মোকতান বলেন, ‘সময় যত যাচ্ছে ততই আশা ফুরিয়ে আসছে।’
নুয়াকোটের একটি ত্রাণ কেন্দ্রে দেয়ালে নিখোঁজ ও মৃতদের নামের তালিকা টাঙিয়েছে সেনাবাহিনী। তা ঘিরে দেখা গেছে স্বজনদের ভিড়; অনেকে তালিকার ছবি তুলছেন, কেউ চোখের পানি মুছছেন। রাজেশ কুমার রাম বারবার তালিকায় ছেলের নাম খুঁজছেন। তার আশা, ছেলে হয়তো কোথাও আটকে আছে এবং তাকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হবে।
মরদেহ শনাক্ত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিকাংশ মরদেহের অবস্থা এমন যে ছবি দেখে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। স্বজনরা হাতে মোবাইল ফোন নিয়ে ছবিগুলোর সঙ্গে নিখোঁজ পরিবারের সদস্যদের চেহারা মেলানোর চেষ্টা করছেন। অনেকেই নিশ্চিত হতে পারছেন না। একদিকে উদ্ধার হওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে ধ্বংসস্তূপ, কাদা ও নদীর স্রোত থেকে নতুন নতুন মরদেহ উদ্ধারের সঙ্গে হতাহতের সংখ্যাও বাড়ছে।
দুর্গত এলাকার খাড়া পাহাড় ও সরু গিরিখাত উদ্ধারকাজকে কঠিন করে তুলেছে বলে জানিয়েছেন নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল। গতকাল এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, নিখোঁজদের সন্ধানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সহায়তায় সরকারের সব সক্ষমতা মোতায়েন করা হয়েছে। উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রমও একসঙ্গে চলবে। টানেল থেকে মানুষ উদ্ধার, জীবিত মানুষ শনাক্তের প্রযুক্তি, দ্রুত ফরেনসিক ও ডিএনএ বিশ্লেষণ এবং মরদেহ সংরক্ষণের রেফ্রিজারেটরের জন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর বিশেষায়িত সহায়তা চেয়েছে নেপাল।
ভারতের ১১ সদস্যের একটি দল এরই মধ্যে মোতায়েন হয়েছে। চীন থেকেও একই ধরনের একটি উদ্ধারকারী দল শিগগিরই পৌঁছার কথা। ভারতের কাছ থেকে ৫৭ টনের বেশি ত্রাণসামগ্রী পেয়েছে নেপাল। চীন, জাপান, অস্ট্রেলিয়াসহ অন্য দেশগুলো থেকেও সহায়তা আসছে। ক্ষয়ক্ষতির প্রয়োজনীয়তা নিরূপণ চলার সঙ্গে সঙ্গে আরো আন্তর্জাতিক সহায়তা চাওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন শিশির খানাল।










