থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে সীমান্ত সংঘাত দ্বিতীয় দিনে গড়িয়েছে। এ সংঘাতে গতকাল বিকাল পর্যন্ত ১৬ জন নিহত হয়েছে। যাদের মধ্যে ১৫ জনই বেসামরিক নাগরিক। থাইল্যান্ডের ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী ফুমথাম ওয়েচায়াচাই হুঁশিয়ারির সুরে বলেছেন, ‘সংঘাত যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।’ তিনি অভিযোগ করেন কম্বোডিয়া ভারী অস্ত্র ব্যবহার করেছে। থাইল্যান্ড এরই মধ্যে কম্বোডিয়া সীমান্তবর্তী দুটো প্রদেশের আটটি জেলার সীমান্ত এলাকায় মার্শাল ল ঘোষণা করেছে। এ জরুরি অবস্থার আওতায় সামরিক বাহিনীকে পূর্ণ পর্যায়ের আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষা করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে এবং এটি অবিলম্বে কার্যকর করা হয়েছে। দুই দেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে এক লাখেরও বেশি বেসামরিক লোককে সরিয়ে নেয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে বিশ্লেষকরা দুই দেশের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের আশঙ্কার কথা বলছেন। থাইল্যান্ডের ইনস্টিটিউট ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের থিতিনান পংসুধিরাক বলেন, ‘বর্তমান উত্তেজনা হয়তো আরো খারাপ হবে, কারণ উভয় পক্ষই জাতীয়তাবাদী আবেগে অনড় এবং কেউই নমনীয়তা দেখাতে চায় না।’ বর্তমান পরিস্থিতিতে থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে কিনা, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে কূটনৈতিক সমঝোতা ব্যর্থ হলে এবং সামরিক উসকানি অব্যাহত থাকলে এ সংঘর্ষ যে বড় আকারে বিস্তার লাভ করতে পারে, তা এখন অনেকটাই স্পষ্ট। দুই দেশের রাজনীতি, সেনাবাহিনীর অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ—সবকিছুই এখন এ অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

চলমান লড়াই থেকে দুই দেশকে পৃথককারী সীমান্তের উভয় পাশে বসবাসকারী ১ লাখ ২০ হাজারেও বেশি মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। সেই সঙ্গে এখন পর্যন্ত থাইল্যান্ডের ১৫ জন এবং কম্বোডিয়ায় একজন নিহত হয়েছে। থাইল্যান্ডের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, কম্বোডিয়ার সীমান্তবর্তী চারটি থাই প্রদেশের প্রায় ১ লাখ ৬৭২ জনকে আশ্রয় কেন্দ্রে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। থাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সচিব আরসিত সাম্পানথারাতকে উদ্ধৃত করে দেশটির চ্যানেল ৩ টেলিভিশন চ্যানেল জানিয়েছে, সরিয়ে নেয়া অর্ধেকেরও বেশি সুরিন প্রদেশের, বাকিরা সিসাকেট, বুড়িরাম ও উবোন রাতচাথানি প্রদেশের। অন্যদিকে কম্বোডিয়ার প্রিয়াহ ভিহিয়ার প্রদেশের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে খেমার টাইমস সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, থাইল্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত উত্তর সীমান্ত থেকে প্রায় ২০ হাজার বাসিন্দাকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে।

এদিকে দুই দেশের সীমান্ত এলাকায় চলমান সংঘাত নিরসনে সংলাপের উদ্যোগ নিতে চেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও আসিয়ান আঞ্চলিক জোটের বর্তমান সভাপতিত্বকারী দেশ মালয়েশিয়া। তবে তাদের এ প্রস্তাবে সায় দেয়নি থাইল্যান্ড। তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা প্রত্যাখ্যান করে গতকাল দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ব্যাংকক জোর দিয়ে বলেছে, কম্বোডিয়া যেন হামলা বন্ধ করে এবং দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে যেন সংঘাতের সমাধান করা হয়।

দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র নিকোর্নদেজ বালানকুরা জানান, থাইল্যান্ড দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান করতে চায়। আমরা আমাদের অবস্থানে অটল রয়েছি। এটা দুই দেশের মধ্যকার সংঘাত। এখনই আমাদের তৃতীয় কোনো মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন নেই। তিনি আরো বলেন, ‘কম্বোডিয়াকে আগে সীমান্তে হামলা বন্ধ করতে হবে। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানে আমাদের দরজা এখনো খোলা রয়েছে। কম্বোডিয়ার সরকার এ বিষয়ে এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।’

থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে শত বছরের বেশি সময় ধরে বিরোধ চলছে। ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসকেরা দুই দেশের মধ্যে সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত ঘটে। ২০০৮ সালে দুই দেশের বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করে। কম্বোডিয়া বিরোধপূর্ণ সীমান্ত অঞ্চলে ১১ শতকে নির্মিত একটি মন্দিরকে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিলে এ পরিস্থিতি দেখা দেয়। থাইল্যান্ড এ পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করে। এরপর বিভিন্ন সময় সীমান্ত এলাকায় সংঘাতে দুই দেশের সেনা ও বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে।