আগের দিন যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার মিশ্র অবস্থায় লেনদেন শেষ করার পর বিনিয়োগকারীরা এদিন এশিয়া ও ইউরোপের বাজারে কিছুটা সক্রিয় ছিলেন। অন্যদিকে ইরানের ওপর নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমেছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগে রাখছে। খবর এপি।

ইউরোপের বাজারে গতকাল জার্মানির ডিএএক্স সূচক বেড়েছে দশমিক ৫ শতাংশ। সূচকটি দাঁড়িয়েছে ২৬ হাজার ২৪০ দশমিক ৭৬ পয়েন্টে। ফ্রান্সের প্যারিসভিত্তিক সিএসি ৪০ বেড়েছে দশমিক ৩ শতাংশ। সূচকটির অবস্থান ছিল ৮ হাজার ৪৮০ দশমিক ৫২ পয়েন্টে। যুক্তরাজ্যের এফটিএসই ১০০ সূচকও দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ১০ হাজার ৮৬৯ দশমিক ৯৩ পয়েন্টে উঠেছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০-এর ফিউচার বেড়েছে দশমিক ৩ শতাংশ। ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজের ফিউচারও বেড়েছে দশমিক ২ শতাংশ।

এর আগে সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে মিশ্র প্রবণতা দেখা যায়। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ কমে দশমিক ৩ শতাংশ। তবে ডাও জোন্স বাড়ে দশমিক ৩ শতাংশ। প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাক কমে দশমিক ৮ শতাংশ।

প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারে সোমবার বেশি চাপ ছিল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিকে ঘিরে অতিরিক্ত বিনিয়োগ ও শেয়ারের মূল্যায়ন নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিনিয়োগকারীদের একাংশের আশঙ্কা, এআই প্রযুক্তিতে বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে পর্যাপ্ত মুনাফা না এলে চিপের চাহিদাও কমে যেতে পারে। এতে এআই খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ারে চাপ তৈরি হতে পারে।

এ কারণে এআই খাতের অন্যতম বড় সুবিধাভোগী চিপ নির্মাতা এনভিডিয়ার শেয়ারদর সোমবার ২ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে। একই দিনে মাইক্রন টেকনোলজির শেয়ারদর কমেছে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। ব্রডকমের শেয়ারও কমেছে ২ দশমিক ৬ শতাংশ।

পাশাপাশি বন্ডবাজারেও কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড কমে ৪ দশমিক ৬৯ শতাংশে নেমেছে। গত শুক্রবার দিনের শেষ লেনদেনে এটি ছিল ৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ। অর্থাৎ বন্ডের ইল্ড কিছুটা কমে আগের সপ্তাহের পর্যায়ে ফিরেছে।

দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড কয়েক মাস ধরে ঊর্ধ্বমুখী ছিল। এর পেছনে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সরকারের বড় ঋণ ও অন্যান্য অর্থনৈতিক উদ্বেগ কাজ করছে। বন্ডের ইল্ড বাড়লে সরকার ছাড়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের ঋণ নেয়ার খরচ বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়তে পারে আবাসন খাতেও। কারণ সুদহার বাড়লে সাধারণত বন্ধকী ঋণের খরচ বাড়ে এবং বাড়ি কেনাবেচার বাজারে চাপ তৈরি হয়।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ দীর্ঘমেয়াদি ট্রেজারি বন্ড পুনঃক্রয়ের পরিকল্পনা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। এর উদ্দেশ্য দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের বাজারে চাপ কমানো। এ নিয়ে বাজারে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

এসপিআই অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের স্টিফেন ইনেস জানান, দীর্ঘমেয়াদি বন্ড কেনার অর্থায়নে ট্রেজারি জেনারেল অ্যাকাউন্টের অর্থ ব্যবহারের আলোচনা সোমবার বাজারে প্রভাব ফেলেছে। এতে দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের ইল্ড কমেছে এবং বিভিন্ন মেয়াদের বন্ডের ইল্ডের ব্যবধানও কিছুটা সংকুচিত হয়েছে।

বাজারের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সামনে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের নতুন চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ গত শুক্রবার ওয়াইওমিংয়ের জ্যাকসন হোলে অনুষ্ঠিত বার্ষিক অর্থনৈতিক সম্মেলনে বক্তব্য দেবেন। অতীতে ফেডের গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ঘোষণা এ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে এসেছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের নজর এখন ওয়ার্শের বক্তব্যের দিকে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, তিনি মূল্যস্ফীতি ও তা নিয়ন্ত্রণে ফেডের পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতে পারেন। তার বক্তব্য থেকে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সুদহার কোন পথে যেতে পারে, সে বিষয়ে বাজার কিছুটা ধারণা পেতে পারে।

এর মধ্যেই জ্বালানি বাজারে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার পর গতকাল জ্বালানি তেলের দাম কমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৮৮ ডলার ৭৪ সেন্টে নেমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ব্যবহৃত বেঞ্চমার্ক অপরিশোধিত তেলের দাম কমেছে ২ দশমিক ২ শতাংশ। প্রতি ব্যারেলের দাম দাঁড়িয়েছে ৮৩ ডলার ১৪ সেন্টে।

তেলের দাম এখনো ইরান যুদ্ধ শুরুর আগের পর্যায়ের তুলনায় অনেক বেশি। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ শুরুর আগে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৭২ ডলারের কিছু বেশি।

গত মাসে তেলের বাজারে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা যায়। ব্রেন্টের দাম একপর্যায়ে ৭২ ডলার থেকে বেড়ে ১০২ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। এর পেছনে অন্যতম কারণ ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশার পরিবর্তন। ইরানের ওপর থেকে চাপ কমলে পারস্য উপসাগর থেকে তেলবাহী জাহাজগুলো আবার নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারবে, এমন প্রত্যাশায় তেলের দাম কমে। আবার সংঘাত বাড়ার আশঙ্কায় দাম বেড়েছে।

এদিকে গতকাল ইরানের বাণিজ্য অংশীদারদের ডলারভিত্তিক লেনদেন থেকে বিচ্ছিন্ন করার হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া দেশগুলোকে সতর্ক করে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ডলারভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে এসব দেশ। একই সঙ্গে নতুন নিষেধাজ্ঞার পাল্টা জবাব দেয়ার হুমকি দিয়েছে তেহরান।’

ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়লেও এশিয়ার বেশির ভাগ শেয়ারবাজারে গত মঙ্গলবার ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক বেড়েছে দশমিক ৫ শতাংশ। সূচকটি দাঁড়িয়েছে ৬৫ হাজার ৮৫৬ দশমিক ৪৩ পয়েন্টে। প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগকারী সফটব্যাংক গ্রুপের শেয়ারদর বেড়েছে ২ দশমিক ৩ শতাংশ।

দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচকও আগের দরপতন কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সূচকটি বেড়েছে দশমিক ৭ শতাংশ। বিনিয়োগকারীরা প্রযুক্তি কোম্পানির তুলনামূলক কম দামের শেয়ার কিনেছেন। ফলে কসপি ৬ হাজার ৭৪২ দশমিক ৭৪ পয়েন্টে উঠে এসেছে।

হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচক প্রায় অপরিবর্তিত ছিল। সূচকটির অবস্থান ছিল ২৫ হাজার ৫১১ দশমিক ১০ পয়েন্টে। চীনের সাংহাই কম্পোজিট সূচক বেড়েছে দশমিক ২ শতাংশ। অস্ট্রেলিয়ার এসঅ্যান্ডপি/এএসএক্স ২০০ সূচক বেড়েছে দশমিক ৭ শতাংশ। তাইওয়ানের তাইএক্স সূচক বেড়েছে দশমিক ৯ শতাংশ। তবে ভারতের সেনসেক্স কমেছে দশমিক ২ শতাংশ।

মুদ্রাবাজারেও গতকাল কিছুটা পরিবর্তন দেখা গেছে। মার্কিন ডলারের বিপরীতে জাপানি ইয়েনের দাম কমেছে। এক ডলারের বিপরীতে ইয়েনের দর বেড়ে ১৫৯ দশমিক ৩০-এ উঠেছে। আগের দিন ছিল ১৫৯ দশমিক ১০ ইয়েন। অন্যদিকে ইউরোর দাম সামান্য বেড়েছে। এক ইউরোর বিপরীতে ডলারের দর ছিল ১ দশমিক ১৬৭০ ডলার। আগের দিন ছিল ১ দশমিক ১৬৬৭ ডলার।