১৯৮১ সালে কলোরাডো ও ওয়াইওমিংয়ের কয়েকটি বন্য হরিণের মধ্যে প্রথম এই সংক্রমণ শনাক্ত হয়। কিন্তু এখন এটি যুক্তরাষ্ট্রের ৩৬টি রাজ্যের পাশাপাশি কানাডার কিছু অংশ, স্ক্যান্ডিনেভিয়ার বন্য ও গৃহপালিত রেইনডিয়ার এবং দক্ষিণ কোরিয়ার খামারের হরিণ ও এল্কের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।

গণমাধ্যমে রোগটিকে প্রায়ই জম্বি হরিণ রোগ বলা হয়। কারণ এটি আক্রান্ত প্রাণীর লালা ঝরানো, ক্রমাগত ওজন কমে যাওয়া, দিকভ্রান্ত আচরণ, শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা এবং মানুষের প্রতি প্রতিক্রিয়াহীনতার মতো লক্ষণ সৃষ্টি করে। তবে এই নামকরণ অনেক বিজ্ঞানীর বিরক্তির কারণ হয়ে উঠেছে। মহামারীবিদ মাইকেল অস্টারহোম বলেন, ‘এটি পরিস্থিতিকে হালকা করে ফেলে। এতে পাঠকরা ভুল ধারণা পেতে পারেন যে এটি কেবলমাত্র কোনো বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির প্লটের মতো এক অদ্ভুত হুমকি। কিন্তু বাস্তবে, সিডব্লিউডি সংক্রমিত প্রাণীগুলো সাধারণত মারা যায়। এটি এক মারাত্মক জনস্বাস্থ্য এবং বন্যপ্রাণী বিষয়ক সংকট।’

পাঁচ বছর আগে মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংক্রামক রোগ গবেষণা ও নীতিনির্ধারণ কেন্দ্রের পরিচালক অস্টারহোম এক মারাত্মক সতর্কবার্তা দেন। তিনি বলেন, ‘শিকার করা হরিণের মাংস খাওয়ার মাধ্যমে এটি মানুষের দেহেও সংক্রমিত হতে পারে।’ তবে তখন অনেকেই তাকে অযথা আতঙ্ক ছড়ানোর অভিযোগে অভিযুক্ত করেছিলেন। কিন্তু এখন যখন রোগটি বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে পড়ছে এবং প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ সংক্রমিত পশুর মাংস খাচ্ছে, তখন আরো অনেক বিজ্ঞানী অস্টারহোমের উদ্বেগের সঙ্গে একমত হচ্ছেন।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, যদি রোগটি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তবে এটি খাদ্য সরবরাহ, অর্থনীতি, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং কৃষি খাতকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে এবং পাশাপাশি এটি মানবস্বাস্থ্যের জন্যও বিপর্যয়কর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র এই সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলার জন্য সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত, এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই রোগ প্রতিরোধে কোনো সমন্বিত কৌশল নেই।

সিডব্লিউডি কোনো ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসঘটিত রোগ নয়। এটি প্রিয়ন নামে পরিচিত এক অস্বাভাবিক সংক্রমণশীল প্রোটিনের কারণে হয়, যা প্রতিকার করা অত্যন্ত কঠিন। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রিয়ন সংক্রমিত মৃত প্রাণীর দেহাবশেষ মাটিতে বছরের পর বছর সক্রিয় থাকতে পারে এবং অন্য প্রাণীদের সংক্রমিত করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, শিকারের পর বহু সংক্রমিত প্রাণীর মৃতদেহ বিভিন্ন রাজ্যে পরিবহন করা হচ্ছে, যা রোগ ছড়িয়ে দেয়ার গতি বাড়িয়ে তুলছে।

প্রতি বছর হাজার হাজার হরিণ ও এল্কের মৃতদেহ যেসব এলাকায় ফেলা হচ্ছে, বিশেষ করে যেগুলো ল্যান্ডফিলে ফেলা হয়, সেখানে সম্ভাব্য বিষাক্ত প্রিয়ন বর্জ্যের কেন্দ্র তৈরি হতে পারে বলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা।

যেসব রাজ্যে হরিণ ও এল্ক শিকার করা হয়, সেসব অঞ্চলে সিডব্লিউডির বিস্তার বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০ শতাংশ মার্কিনি হরিণ বা এল্ক শিকার করেছেন, এবং ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ হরিণ বা এল্কের মাংস খেয়েছেন।

চিকিৎসকরা শিকারিদের পরামর্শ দিয়েছেন, যদি কোনো প্রাণীর মধ্যে তারা তারা সিডব্লিউডি সংক্রমণের আশঙ্কা করেন, তবে তারা যেন সেটি পরীক্ষা করিয়ে নেন। তবে বাস্তবে অনেকেই এই পরামর্শ মানছেন না।

সিডব্লিউডি বিস্তারের ঝুঁকি মোকাবিলায় অনেক বিজ্ঞানী ও সংরক্ষণবাদী কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কিছু রাজ্য বিজ্ঞানীদের পরামর্শ উপেক্ষা করে হরিণ ও এল্কের জন্য কৃত্রিম খাদ্য সরবরাহ চালিয়ে যাচ্ছে, যা রোগের বিস্তারকে ত্বরান্বিত করছে। সাবেক ইউএস ফিশ অ্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফ সার্ভিসের প্রধান টম রোফ বলেন, ‘এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি মহামারী, যা এখন তীব্রতর পরিণতির দিকে যাচ্ছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমরা এখন সেই সিদ্ধান্তগুলোর ফল ভোগ করছি, যেগুলো বাস্তবতাকে অস্বীকার করে নেয়া হয়েছিল।’

অন্যদিকে, ন্যাশনাল এল্ক রিফিউজের মতো জায়গাগুলোতে হাজার হাজার এল্ক একত্রিত হয়, এবং এরই মধ্যে সিডব্লিউডি সেখানেও শনাক্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি এই অঞ্চলগুলোতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা না হয়, তবে এর নেতিবাচক প্রভাব সমগ্র অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে।

গবেষকরা বলছেন, একমাত্র কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা হলো স্বাস্থ্যকর প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ, যেখানে বন্যপ্রাণীদের কৃত্রিম খাদ্য সরবরাহের প্রয়োজন হবে না এবং শিকারি প্রাণীরা তাদের স্বাভাবিক ভূমিকা পালন করতে পারবে।