এমন একটি স্টেডিয়ামের কথা ভাবুন, সেখানে ৬০ হাজার আসন রয়েছে। সাম্প্রতিক ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি রিপোর্ট অনুসারে, ওই স্টেডিয়ামে যে পরিমাণ মানুষ বসতে পারে তাদের হাতেই রয়েছে বিশ্বের সিংহভাগ সম্পদ। প্রতিবেদনটি বৈশ্বিক আয় ও সম্পদ বন্টনে চরম ব্যবধান তুলে ধরেছে। যেখানে বলা হচ্ছে, রাজনৈতিক ক্ষমতা বন্টনেও প্রতিফলিত হয় এ বৈষম্য। যার প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক ঋণ, বিদেশী বিনিয়োগ ও পরিবেশ দূষণসহ বিভিন্ন খাতে। খবর ইউরো নিউজ।
বিভিন্ন দেশের ২০০-এর বেশি গবেষক নিয়ে গঠিত নেটওয়ার্ক ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি ল্যাব প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। ফ্রান্সভিত্তিক সংস্থাটির সংকলিত তথ্য বলছে, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার মাত্র দশমিক শূন্য শূন্য ১ শতাংশ নিয়ে গঠিত এলিট গোষ্ঠীটি। বৈশ্বিক সম্পদশ্রেণীর নিচের ৫০ শতাংশ মানুষের তুলনায় তারা তিন গুণ সম্পদশালী।
বিপুল সম্পদ ও ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জনস্বার্থে অভিজাত শ্রেণীটির অবদন খুবই কম। সমাজের নিম্ন থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ক্ষেত্রে কার্যকর করহার আয়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে। অন্যদিকে বিলিয়নেয়ার ও সেন্টি মিলিয়নেয়ারদের ক্ষেত্রে তা এক পর্যায়ে কমতে থাকে। চিকিৎসক, শিক্ষক বা প্রকৌশলীদের মতো মধ্যবিত্ত শ্রেণী আয়ের তুলনায় যে পরিমাণ কর দেন, সম্পদ যদি অফশোর কাঠামো বা ক্যাপিটাল গেইনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে, তার চেয়ে কম কর দেন একজন বিলিয়নেয়ার।
প্রতিবেদনের ভাষ্যে, এ বৈষম্য শুধু কর ন্যায্যতাকে ক্ষুণ্ণ করে এমন নয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও জলবায়ু কার্যক্রম পরিচালনায় প্রয়োজনীয় সম্পদ থেকেও সমাজকে বঞ্চিত করে।
সম্পদ বণ্টনে লৈঙ্গিক বৈষম্যও তুলে ধরেছে ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি ল্যাব। বিশ্বব্যাপী কাজের সময় কমলেও এর সুবিধা সবচেয়ে বেশি পাচ্ছেন পুরুষ কর্মীরা। অন্যদিকে নারীদের মোট কাজের চাপ এখনো খুব বেশি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে কর্মক্ষেত্রে অগ্রগতি সত্ত্বেও নারীরা এখনো সমতায় পৌঁছতে পারেনি। তারা বৈশ্বিক মোট শ্রম-আয়ের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ পান। কোনো অঞ্চলেই শ্রম-আয়ের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের ৫০-৫০ ভারসাম্য অর্জিত হয়নি। দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে এ ব্যবধান গড়ের তুলনায় বেশি। এসব অঞ্চলে নারীরা মোট শ্রম-আয়ের এক-চতুর্থাংশেরও কম পান।
জলবায়ু-দূষণের হিসাবেও বৈষম্য তৈরি করছে ধনী দেশগুলো। যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ আয়ের শীর্ষ ১০ শতাংশ মানুষের গড় কার্বন ফুটপ্রিন্ট নাইজেরিয়ার একই শ্রেণীর তুলনায় প্রায় ৪০ গুণ বেশি। বিশ্বের শীর্ষ ১ শতাংশ আয়কারী বছরে গড়ে সম্পদশ্রেণীর নিচের ৫০ শতাংশ তুলনায় প্রায় ৭৫ গুণ বেশি কার্বন নিঃসরণ করে।
এখন পর্যন্ত বেশির ভাগ হিসাব পদ্ধতিতে কার্বন নিঃসরণকে পণ্যের বা সেবার চূড়ান্ত ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেয়। কিন্তু ভোক্তাভিত্তিক হিসাব জীবনযাপন ও ভোগের ধরন বোঝাতে সাহায্য করলেও মূলধনের মালিকানা কার হাতে, তা উপেক্ষিত থেকে যায়।
সাধারণ মানুষের পক্ষে তাদের কেনাকাটার ধরন পরিবর্তন করা সহজ নয়। তাদের সক্ষমতার মধ্যে পরিবেশবান্ধব বিকল্পও সবসময় মেলে না। কিন্তু অর্থ কোথায় বিনিয়োগ হবে. তা ঠিক করেন কারখানা, জ্বালানি কোম্পানি বা সম্পদের মালিকরা। উচ্চ দূষণকারী শিল্পের মুনাফার বেশির ভাগ হিস্যাও পান তারা। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত নিঃসরণ মূলধনের মালিকদের নামে হিসাব করা উচিত। কারো হাতে যদি সরাসরি বা বিনিয়োগ তহবিলের মাধ্যমে কোনো প্রতিষ্ঠানের ৫০ শতাংশ মালিকানা থাকে, তাহলে ওই প্রতিষ্ঠানের ৫০ শতাংশ নিঃসরণ তিনি করছেন বলে ধরা উচিত।
কার্বন ফুটপ্রিন্টকে মালিকানাভিত্তিক হিসাব ধরলে অনেক পরিসংখ্যান পাল্টে যাবে। প্রতিবেদন অনুসারে, ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রের ধনী ১০ শতাংশের অবদান তিন-পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেড়ে যাবে। প্রচলিত হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রে শীর্ষ ১০ শতাংশ মানুষরা ভোক্তাভিত্তিক হিসেবে ২৪ শতাংশ নিঃসরণের জন্য দায়ী। কিন্তু মালিকানাভিত্তিক হিসাবে তারা ৭২ শতাংশ নিঃসরণের জন্য দায়ী। এছাড়া শীর্ষ ১ শতাংশ ধনী মালিকানাভিত্তিক হিসাবে সব গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের ৪১ শতাংশের জন্য দায়ী। অথচ ভোক্তাভিত্তিক হিসাবে এটি মাত্র ১৫ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ধনী দেশগুলোকে সুবিধা দিয়ে পরিচালিত হয় বৈশ্বিক আর্থিক ও মুদ্রা ব্যবস্থা। এর বিপরীতে দরিদ্র দেশ থেকে সম্পদ চুষে নেয়া হয়। মাত্র কয়েকটি সুবিধাপ্রাপ্ত দেশ কম সুদে ঋণ নিতে পারে। তারা আবার তুলনামূলক বেশি লাভজনক সম্পদে বিনিয়োগ করতে পারে। ষাটের দশকে অর্থনীতিবিদরা বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র এক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা পায়। এর কারণ বৈশ্বিক ব্যবস্থায় ডলারের কেন্দ্রীয় ভূমিকা। এখন ইউরোপ ও জাপানসহ কিছু উন্নত অর্থনীতি একই সুবিধা ভোগ করে। এর বিপরীতে উদীয়মান ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে দিতে হয় ঋণ বাবদ অতিরিক্ত সুদ। দেশগুলোয় আয়ের বড় অংশ চলে যায় বিদেশে।
বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ দেশ তাদের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ থেকে নিয়মিতভাবে বাড়তি রিটার্ন পায়, যা তাদের জিডিপির প্রায় ১ শতাংশের সমতুল্য। বাকি ৮০ শতাংশের দেশের ওপর ঋণের বোঝা বেশি। তারা বিদেশে বিনিয়োগ থেকে অতিরিক্ত লাভ পায় না, উল্টো ক্ষতিই হয়। এসব দেশ থেকে বিদেশে চলে যাওয়া অর্থের পরিমাণ মোট জিডিপির ২ শতাংশের সমতুল্য। এমনকি কিছু দরিদ্র অঞ্চলে বিদেশে পাঠানো অর্থের আকার সরকারি স্বাস্থ্য বাজেটের তুলনায় বেশি।










