নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থাকতে পারে। বৈশ্বিক উষ্ণতা হিমালয়ের উঁচু পর্বতাঞ্চলের বরফ ও শিলাস্তরকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। এর ফলে বড় ধরনের ধস এবং একের পর এক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়ছে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তবে সর্বশেষ দুর্যোগের একমাত্র ও তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে এখনই জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন তারা। খবর রয়টার্স।
বুধবার নেপাল-তিব্বত সীমান্তের একটি হিমালয় নদীতে বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর ও বরফ আছড়ে পড়ে। এতে সৃষ্ট প্রবল ঢল আশপাশের শহর ও উপত্যকাগুলো প্লাবিত করে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এ দুর্যোগে অন্তত ১৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৫০০ জন, যাদের মধ্যে অন্তত ৮০০ জন বিদেশী নাগরিক।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, নেপালের লাংটাং লিরুং পর্বতশৃঙ্গের উত্তর ঢালে বড় ধরনের বরফ ও পাথরের ধস থেকে বিপর্যয়ের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। ধসে পড়া বরফ ও পাথর তিব্বতের লেন্দে খোলা নদীতে গিয়ে পড়ে। সেখান থেকে সৃষ্ট প্রবল স্রোত সীমান্ত পেরিয়ে বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত করে।
ধস থেকে শুরু হওয়া বহুমাত্রিক এ বিপর্যয়ে অন্তত ছয়টি বড় জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র গিরং বন্দরের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদীর গতিপথেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। প্রাথমিক ধসের স্থান থেকে ভারত সীমান্তের দিকে ১০০ কিলোমিটারের বেশি এলাকাজুড়ে নদীর প্রবাহপথ পরিবর্তিত হয়েছে।
নিউজিল্যান্ডের আর্থ সায়েন্সেস বিভাগের ‘মাউন্টেনস টু সি’ কর্মসূচির প্রধান বিজ্ঞানী সাইমন কক্স বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন এমন পরিস্থিতি তৈরি করছে, যা উঁচু পর্বতের শিলা ও বরফকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।’ এর ফলে এবারের মতো ধস এবং তা থেকে ধারাবাহিক বিপর্যয় আরো ঘন ঘন ঘটতে পারে বলে জানান তিনি।
সাইমন কক্সের ভাষ্য অনুযায়ী, তাপমাত্রা বেড়ে গেলে খাড়া পর্বতঢালে শিলাস্তর ধরে রাখা বরফের সক্ষমতা কমে যায়। একই সঙ্গে বরফগলা পানির পরিমাণ বৃদ্ধি এবং জমাট বাঁধা ও গলে যাওয়ার ধরনে পরিবর্তন আসে। বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাওয়ায় পাহাড়ের ঢালও দুর্বল হয়ে পড়ে। এসব পরিস্থিতি কোনো কোনো স্থানে বড় ধরনের ধসের আশঙ্কা বাড়ায়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় হিমালয় অঞ্চলে একই ধরনের কয়েকটি বিপর্যয় ঘটেছে, যদিও সেগুলোর মাত্রা ছিল তুলনামূলক কম। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৫ সালে তিব্বত-নেপাল সীমান্তের গিরংয়ে বন্যা, ২০২৪ সালে নেপালের শেরপা অধ্যুষিত থামে গ্রামে হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণ এবং ২০২৩ সালে ভারতের সিকিমে একই ধরনের বিপর্যয়।
হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে বন্যা, ভূমিধস, তুষারধস ও খরার ঘটনা ক্রমে আরো ঘনঘন ও তীব্র হয়ে উঠছে। নেপালভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (আইসিমড) জানিয়েছে, পানি, ভূমি ও বায়ুতে দ্রুত পরিবর্তন এ অঞ্চলের মানুষের জন্য বড় হুমকি তৈরি করছে।
আইসিমডের জ্যেষ্ঠ হিমমণ্ডল বিশেষজ্ঞ ফারুক আজমের ধারণা, ব্যাপক তুষার গলনের সঙ্গে ভূকম্পনজনিত তৎপরতা যুক্ত হয়ে প্রাথমিক বরফ-পাথরের ধসের সূচনা করতে পারে। পরে সেটিই ভাটির দিকে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় রূপ নেয়।
জাতিসংঘের ২০২৩ সালের তথ্যানুযায়ী, বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে তিন দশকের কিছু বেশি সময়ে নেপালের তুষারাবৃত পর্বতগুলোর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়ে গেছে। আগের দশকের তুলনায় পরবর্তী দশকে দেশটির হিমবাহ গলার গতি ৬৫ শতাংশ বেড়েছে।
হংকংয়ের সিটি ইউনিভার্সিটির স্কুল অব এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের ডিন বেঞ্জামিন হর্টন বলেন, বুধবারের দুর্যোগটি একটি ‘যৌগিক ঘটনার’ উৎকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে। ভূকম্পনজনিত তৎপরতার সঙ্গে হিমবাহ হ্রাস, চিরহিমায়িত ভূমি গলে যাওয়া ও পাহাড়ি ঢালের অস্থিতিশীলতার মতো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব যুক্ত হলে যেকোনো একটি কারণের তুলনায় অনেক বেশি জটিল ও বিধ্বংসী বিপর্যয় ঘটতে পারে। তাঁর মতে, উঁচু পার্বত্য অঞ্চলের দুর্যোগ মোকাবেলার সক্ষমতা বাড়াতে এ ধরনের ধারাবাহিক ঝুঁকি বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।









