ভারতের মেট্রোপলিটন শহরে নয়ডার ব্যস্ত ইন্টারসেকশন। চারদিকে গাড়ির হর্ন আর ধোঁয়ার রাজত্ব। এর মধ্যেই ঘাম ভেজা কপালে ফোনের স্ক্রিনে বারবার চোখ বুলাচ্ছিলেন ২১ বছর বয়সী হিমাংশু পাল। পাশে দাঁড়িয়ে তার বন্ধু অঙ্কুশ, বয়স মাত্র ১৮। বিহারের গ্রাম থেকে এক হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আসা অঙ্কুশের সেটি ছিল মেট্রোপলিটন শহরে কাজের প্রথম দিন। হাতে ধরা প্রথম ডেলিভারি অর্ডার। মোবাইল স্ক্রিনে কাউন্টডাউন চলছে।

ফোনের ম্যাপ দেখে সামনের জ্যাম সামলাতে ব্যস্ত অঙ্কুশকে পিষে দিয়ে চলে যায় একটি দ্রুতগামী গাড়ি। মুহূর্তেই একটি তরতাজা প্রাণ পরিণত হয় মরদেহে। নয়ডার ব্যস্ত রাস্তায় এ কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; এটি ভারতের ক্রমবর্ধমান 'কুইক কমার্স' বা দ্রুততম সময়ে পণ্য পৌঁছানোর নিষ্ঠুর বাস্তবতার একটি প্রতিচ্ছবি।

বর্তমানে ভারতের ৪৩ কোটি মধ্যবিত্তের দোরগোড়ায় মুদিপণ্য থেকে শুরু করে আইফোন পর্যন্ত পৌঁছে দিচ্ছে বড় বড় সব ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান। জোম্যাটো, সুইগি, জেপটো কিংবা অ্যামাজন—সবার লক্ষ্য একটাই: কত দ্রুত পৌঁছানো যায়। ১০ মিনিটে পণ্য হাতে পাওয়ার এ প্রতিশ্রুতি গ্রাহকের কাছে ‘জাদুর মতো’ মনে হলেও ডেলিভারি কর্মীদের জন্য এটি এক অদৃশ্য শেকল।

2021-07-13T111814Z_853912162_RC2KJO944EB1_RTRMADP_3_ZOMATO-IPO-1768732554

অঙ্কুশের মতো হাজারো তরুণ যখন রাস্তায় নামেন, তাদের মাথায় থাকে ‘অ্যালগরিদমের’ পাহাড়সমান চাপ। অ্যাপের ঘড়ি যখন সেকেন্ডের হিসেব গুনে পিছিয়ে যেতে থাকে, তখন রাইডারদের কাছে ট্রাফিক আইন কিংবা নিজের প্রাণের চেয়েও গ্রাহকের হাতে প্যাকেট তুলে দেয়াটা জরুরি হয়ে পড়ে।

পাহাড়প্রমাণ চাপের মুখে রাইডারদের জীবন যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। পঙ্কজ কুমার নামের এক ডেলিভারি কর্মী বলছিলেন, ‘আমাদের জন্য গণিতটা খুব সহজ। যত বেশি অর্ডার, তত বেশি আয়। ইনসেনটিভ পেতে হলে আমাদের উল্টো পথে চলতে হয়, সিগন্যাল ভাঙতে হয়।’

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, এ বিশাল কর্মযজ্ঞে রাইডারদের কোনো সামাজিক নিরাপত্তা নেই। হিমাংশু জানান, অঙ্কুশের মৃত্যুর পর কোম্পানি থেকে কোনো সহায়তা মেলেনি; সহকর্মীরা চাঁদা তুলে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে তার মৃতদেহ গ্রামে পাঠিয়েছেন। পঙ্কজ নিজেও একবার দুর্ঘটনায় হাত ভেঙেছিলেন, কিন্তু তিন দিন পরেই প্লাস্টার করা হাতে বাইক নিয়ে ফিরতে হয়েছে কাজে। কারণ, এক দিন কাজ বন্ধ মানেই ইনসেনটিভের তালিকা থেকে ছিটকে পড়া।

2024-10-14T134136Z_862568660_RC2BKAAJMEI3_RTRMADP_3_INDIA-RETAIL-QUICK-COMMERCE-1768732602

ভারতের এই টেক-মডেল নিয়ে সমাজ বিশ্লেষক বন্দনা বাসুদেবন একটি কঠিন সত্য তুলে ধরেছেন। তার মতে, ‘ভারতীয় মধ্যবিত্তরা আসলে গরিবদের পিঠে চড়ে বিলাসিতা করছে।’ একদিকে শহরগুলোতে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে আকাশচুম্বী অট্টালিকা ও ধনাঢ্য এলাকা, আর তার ঠিক পাশেই সস্তায় ভাড়া করা ‘ডার্ক স্টোর’। অন্ধকার এ গুদামগুলোয় হাজার হাজার তরুণ অপেক্ষা করেন পরের অর্ডারের জন্য। এ অর্থনৈতিক বৈষম্যই কোম্পানিগুলোকে সস্তায় শ্রমিক পাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।

বিরামহীন শোষণ আর নিরাপত্তাহীনতার বিরুদ্ধে এখন সরব হতে শুরু করেছেন এই গিগ কর্মীরা। গত নিউ ইয়ারের রাতে দেশজুড়ে কয়েক হাজার রাইডার লগ-আউট করে ধর্মঘট পালন করেছেন। তাদের দাবি—অ্যালগরিদমকে স্বচ্ছ হতে হবে এবং তাদের মানুষের মর্যাদা দিতে হবে।

সরকার সম্প্রতি ১০ মিনিটের বিজ্ঞাপন বন্ধের নির্দেশ দিলেও মাঠপর্যায়ে এর প্রভাব সামান্যই। ডেলিভারি টাইমলাইন এখনো ১০-১৫ মিনিটের ভেতরেই ঘোরাঘুরি করছে। ১০ মিনিটের এ প্রতিযোগিতায় একজন কাস্টমার হয়তো দ্রুত ঠান্ডা পানীয় পাচ্ছেন, কিন্তু সেই দ্রুততার মূল্য চুকাতে হচ্ছে অঙ্কুশদের মতো শত শত তরুণের জীবন দিয়ে।

আল জাজিরা অবলম্বনে