যুক্তরাজ্য সফরে রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। লন্ডনে এটি তার দ্বিতীয় রাষ্ট্রীয় সফর, যা কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য নজিরবিহীন। তার সঙ্গে রয়েছেন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প। মঙ্গলবার স্থানীয় সময় রাতে লন্ডনের স্ট্যানস্টেড বিমানবন্দরে অবতরণ করেন তারা। এরপর হেলিকপ্টারে লন্ডনে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সরকারি বাসভবন উইনফিল্ড হাউসে যান।
বুধবার রাজকীয় জাঁকজমকের মধ্য দিয়ে যুক্তরাজ্যে শুরু হয় ট্রাম্পের এ সফর। উইন্ডসর ক্যাসেলে তাকে স্বাগত জানান রাজা চার্লস, রানি ক্যামিলা, যুবরাজ উইলিয়াম ও কেট।
এ সময় ট্রাম্প ও তার স্ত্রী মেলানিয়াকে রাজকীয় বাহনে প্রাসাদের প্রাঙ্গণ প্রদক্ষিণ করানো হয়। সামরিক কুচকাওয়াজ ও আকাশে যুদ্ধবিমানের প্রদর্শনীসহ সাম্প্রতিক ইতিহাসে কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে দেয়া সবচেয়ে বড় আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা হিসেবে বর্ণনা করছে লন্ডন।
এমন অভিজ্ঞতার পর ট্রাম্প বলেছেন, আমি ব্রিটেনকে ভালোবাসি। এটি এক বিশেষ স্থান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রেক্সিট-পরবর্তী বাস্তবতায় যুক্তরাজ্য চায় ‘বিশেষ সম্পর্ক’কে পুনরুজ্জীবিত করতে। আর তাই ট্রাম্পের জন্য এ বিশেষ ব্যবস্থা। এছাড়া বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রবল বিরোধী জনমতের চাপ সামলাতে হচ্ছে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে। অভিবাসন সংকট, আগে থেকে চলা অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থানের সংকট, ইউক্রেন ইস্যু এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ডানপন্থার উত্তরণের প্রেক্ষাপটে তাই ট্রাম্পের আগমন তার জন্য আরো অর্থবহ।
রয়টার্স, এপি, গার্ডিয়ান-সহ একাধিক মিডিয়ার প্রতিবেদন বলছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর যুক্তরাজ্য বাণিজ্যিক একাকীত্বে ভুগছে। এজন্য তারা ট্রাম্পের সঙ্গে বাণিজ্য ও ন্যাটোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করতে চাইছে। ট্রাম্পের এ সফরে বিষয়গুলো আলোচনায় এসেছে।
ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রতি ট্রাম্পের দুর্বলতা বহু পুরনো। এবার স্বয়ং রাজা তৃতীয় চার্লস ও হবু রাজা প্রিন্স উইলিয়াম ব্যক্তিগতভাবে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন ট্রাম্পকে।
দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টের খবরে বলা হচ্ছে, রাজপরিবারের এ আয়োজন নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি ট্রাম্পের মন গলানোর এক কৌশলগত অস্ত্র। এক কথায় যুক্তরাজ্য রাজপরিবারের ‘মহিমা ও ঐতিহ্য’ দেখিয়ে ট্রাম্পকে প্রভাবিত করতে চায়। উইন্ডসর ক্যাসেলে রাজকীয় আতিথেয়তা, গার্ড অফ অনার, ক্যারেজ রাইড, এবং স্টেট ব্যাংকোয়েট—সবই এ রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের অংশ।

এছাড়াও স্টেট ব্যাংকোয়েটে ১৬০ জন অতিথি, ফ্রেঞ্চ মেনু, রাজকীয় সংগ্রহের প্রদর্শনী—সবই যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্য ও মর্যাদারই প্রদর্শনী, যা বিশ্বমঞ্চে তাদের ‘সফট পাওয়ার’ পুনরুদ্ধারে সহায়তায় করবে।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় রাষ্ট্রীয় সফরের সময় ঘোষণা করা হয়েছে, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন ‘টেক প্রস্পারিটি ডিল’। রয়টার্সের রিপোর্ট অনুযায়ী, সফরের অংশ হিসেবে মাইক্রোসফট, গুগল, এনভিডিয়া, ওপেনএআই–এর মতো কোম্পানির মাধ্যমে ৩১ বিলিয়ন পাউন্ডেরও বেশি বিনিয়োগের ঘোষণা এসেছে। এটি দেশটির জন্য একটি টেকনোলজিক্যাল মাইলফলক। আর এ বিনিয়োগ যুক্তরাজ্যের প্রযুক্তি খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনছে। ধারণা করা হচ্ছে, ৫ হাজারেরও বেশি নতুন চাকরি সৃষ্টি হবে।
তবে গার্ডিয়ানসহ প্রভাবশালী পত্রিকাগুলোর বরাতে জানা গেছে, রাজকীয় ও কূটনৈতিকভাবে সাজানো এ সফরকে বিতর্কিত করে তুলছে জেফরি এপস্টেইনের ছায়া। অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের যৌন নিপীড়ন ও পাচারের অভিযোগে আন্তর্জাতিকভাবে কুখ্যাত এপস্টেইনের সঙ্গে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে ‘উইন্ডসর ক্যাসেলে’ ট্রাম্প ও জেফরি এপস্টেইন ছবি প্রজেক্ট করে প্রতিবাদ করা হয়েছে। এজন্য চারজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী স্টারমার, এপস্টেইনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি পিটার ম্যান্ডেলসনকে আমেরিকাতে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ ও বরখাস্ত করে নিজেও রাজনৈতিকভাবে চাপে আছেন। যা সফরের আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
এ সফর যতটা রাজকীয়, ততটাই রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। একদিকে, যুক্তরাজ্য চায় ট্রাম্পকে ‘বন্ধু’ বানিয়ে ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমাতে। আর অন্যদিকে, স্টারমার চায় ট্রাম্পের সাহায্যে নিজেকে আন্তর্জাতিক নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত করতে, কিন্তু সেটা নিজ দলের আদর্শের সঙ্গে সংঘর্ষ এড়িয়ে।










