পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া এ যুদ্ধবিরতি শুরু থেকেই ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে মুখোমুখি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর যেকোনো সময় ফের পাল্টাপাল্টি হামলা শুরুর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। হরমুজ প্রণালিতেও জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে রয়েছে। ফলে আপাতত যুদ্ধবিরতি চললেও অর্থনৈতিক ধাক্কা অব্যাহত রয়েছে এবং দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা কাটছে না। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি।
এর মধ্যে সবচেয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে জ্বালানি রফতানি ও শিপিং খাতে। বাণিজ্যিক জাহাজে একের পর এক হামলার পর মার্চের শুরুতেই হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বিশাল অংশ আটকে পড়ে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের হিসাব বলছে, যুদ্ধের ফলে বিশ্বব্যাপী তেলের প্রবাহ প্রতিদিন প্রায় ৮০ লাখ ব্যারেল কমে গেছে। শুধু সৌদি আরবই পাইপলাইনে প্রতিদিন সাত লাখ ব্যারেল উৎপাদন হারাচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বীমা ও পরিবহন খরচের অবিশ্বাস্য উল্লম্ফন। যুদ্ধের আগে পারস্য উপসাগরে একটি জাহাজের বীমা প্রিমিয়াম ছিল জাহাজের মূল্যের দশমিক ২ থেকে দশমিক ২৫ শতাংশ। এখন সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৫ থেকে ১০ শতাংশে। অর্থাৎ বৃদ্ধির হার ১ হাজার শতাংশ পর্যন্ত। ১৫ কোটি ডলারের একটি ট্যাংকারের এক ট্রিপের বীমা খরচ এখন সাড়ে ৭ কোটি ডলার
পর্যন্ত উঠতে পারে, যেখানে আগে লাগত মাত্র কয়েক লাখ।
যুদ্ধের আরেকটি বড় প্রভাব পড়েছে জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর। কাতারের রাস লাফান শিল্প এলাকায় এলএনজি স্থাপনায় হামলা, সৌদি আরবের রাস তানুরা রিফাইনারিতে আগুন এবং পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনে আঘাত—সব মিলিয়ে অঞ্চলজুড়ে জ্বালানি উৎপাদন ও সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের গ্যাস প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র, বিভিন্ন বন্দর ও শিল্প এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সময়ে ইরানের দক্ষিণ পার্স গ্যাস ক্ষেত্রে হামলা চালিয়ে উৎপাদন বন্ধ করে দেয় ইসরায়েল। শুধু তেল-গ্যাস নয়, কাতার, বাহরাইন ও কুয়েতের মতো দেশে পানীয় জলের ৯০ শতাংশ সরবরাহ করে যে বিশালাকার ডিস্যালিনেশন প্লান্টগুলো, সেগুলোও আক্রমণের শিকার হয়েছে। দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, আবুধাবি বিমানবন্দর, কুয়েত ও বাহরাইনের বিমানবন্দরেও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
এ ধ্বংসযজ্ঞ সরাসরি প্রভাব ফেলছে উপসাগরীয় দেশগুলোর বিনিয়োগে। তেল রফতানি ব্যাহত হওয়া, পর্যটন খাত ভেঙে পড়া এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতায় অনেক দেশে বিনিয়োগ আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে, অনেক দেশ অর্থনৈতিক মন্দার মুখে পড়ছে। কুয়েত ও কাতারের মতো দেশগুলোতে মোট দেশজ উৎপাদন ১৪ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেও যথাক্রমে প্রায় ৫ ও ৩ শতাংশ জিডিপি কমতে পারে। শেয়ারবাজারেও ধস নেমেছে। দুবাইয়ের বাজার প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে, অন্য বাজারগুলোতেও ৫-১০ শতাংশ পতন দেখা গেছে। পর্যটন খাত প্রতিদিন শত শত মিলিয়ন ডলার ক্ষতির মুখে পড়ছে, আর সার্বিকভাবে উপসাগরীয় দেশগুলো বছরে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলার অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতিও ভয়াবহ আকার ধারণ করায় মানবিক বিপর্যয় নেমে আসছে। যুদ্ধের কয়েক সপ্তাহেই ইরানে তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত ও হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছে। লেবাননেও উল্লেখযোগ্য প্রাণহানি ঘটেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সেনারাও ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে। লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, যা মানবিক সংকটকে আরো তীব্র করেছে। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় চিকিৎসা ব্যবস্থাও ভেঙে পড়ছে। খাদ্য, জ্বালানি ও সার সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটায় বৃহত্তর খাদ্য সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এমনকি এ যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ক্ষতি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশগত ক্ষতি এ যুদ্ধের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি উত্তরাধিকার হয়ে থাকতে পারে। পারস্য উপসাগরে বিশাল তেল নিঃসরণ, পোড়া শোধনাগার থেকে বিষাক্ত ধোঁয়া এবং ধ্বংসস্তূপ থেকে ছড়িয়ে পড়া দূষণ পুরো অঞ্চলকে গ্রাস করছে। তেহরান শোধনাগারে হামলার ফলে সৃষ্ট কালো ধোঁয়া বায়ুমণ্ডলীয় আর্দ্রতার সঙ্গে মিশে অ্যাসিড বৃষ্টি হয়ে ঝরছে। নাতাঞ্জের মতো পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা থেকে ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লুরাইড বের হয়ে মাটিতে মিশছে, যা কৃষিজমিকে দশকের পর দশক চাষের অনুপযোগী করে ফেলতে পারে। মার্কিন সামরিক বাহিনী একা যুদ্ধের প্রথম কয়েক দিনে প্রায় ২০০ কোটি টন গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ করেছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইন থেকে বর্জ্যজল শহরে ছড়িয়ে পড়ছে, ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নানামুখী সংকট একসঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছে, যেখান থেকে ফেরার পথ দীর্ঘ এবং অনিশ্চিত। আর সেই অনিশ্চয়তার প্রভাব শুধু উপসাগরে সীমাবদ্ধ নেই। তেলের দাম, খাদ্যের দাম ও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর দিয়ে সেই ধাক্কা পৌঁছে যাচ্ছে পুরো বিশ্বে।










