বন্যার স্রোতে নেপালের একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; বন্ধ হয়ে গেছে দেশটির প্রায় ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা। কাদা ও ধ্বংসাবশেষে চাপা পড়া প্রকল্পের টানেলে শত শত শ্রমিক আটকা পড়ে আছেন। উদ্ধার অভিযান চললেও প্রতিকূল আবহাওয়া ও দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি কাজকে কঠিন করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা হিমালয়ে হিমবাহ গলন, অস্থিতিশীল পাহাড়ি ঢাল ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত জলবিদ্যুৎ অবকাঠামোর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, গতকাল পর্যন্ত দেশটিতে ৯৩৯ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। নিখোঁজ ৪ হাজার ২৯৫ জন, যার মধ্যে ৫৯২ জন বিদেশী। চীনের পক্ষ থেকে সর্বশেষ ১৬ জনের মৃত্যু ও ৫৪৬ জন নিখোঁজ থাকার কথা জানানো হয়েছে। চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে নিখোঁজদের মধ্যে ২৬১ জন বিদেশী; তাদের মধ্যে শতাধিক নেপালি নাগরিক। খবর বিবিসি ও রয়টার্স।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্যোগের তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতি সামাল দেয়ার পর নেপালের সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সড়ক, সেতু, স্কুল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্র কীভাবে পুনর্নির্মাণ করা হবে, যাতে সেগুলো আবার একই ধরনের ঝুঁকিতে না পড়ে। তাদের মতে, আগের জায়গায় ও আগের নকশায় স্থাপনা ফিরিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না; পরিবর্তিত হিমালয়ের বাস্তবতায় অবকাঠামো পরিকল্পনাও বদলাতে হবে।

অস্ট্রিয়ার ইউনিভার্সিটি অব গ্রাজের ভূবিজ্ঞানী ইয়াকব স্টাইনার বলেন, ‘এ ঘটনার পর কর্তৃপক্ষকে নির্মাণ পরিকল্পনা নিয়ে কঠিনভাবে আত্মসমালোচনা করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো কোথায় ও কীভাবে পুনর্গঠন করা হবে, তার সঙ্গে এখনো নির্মাণ না হওয়া অন্য প্রকল্পগুলোর অনুমোদনের বিষয়টিও নতুন করে খতিয়ে দেখতে হবে।’

নেপালের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর মধ্যে রাসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিংয়ে চালু এবং নির্মাণাধীন বহু জলবিদ্যুৎ প্রকল্প পুরোপুরি বা আংশিক ধ্বংস হয়েছে। নেপালের বিদ্যুৎ উৎপাদকদের সংগঠন ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশনের (আইপিপিএএন) তথ্য অনুযায়ী, এক ডজন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের শত শত শ্রমিকের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। কর্মকর্তারা বলছেন, বন্যার সময় অনেক শ্রমিক নিরাপত্তার জন্য প্রকল্পের টানেলে আশ্রয় নিয়েছিলেন; এখন তারা সেখানেই আটকা পড়েছেন এবং উদ্ধারের অপেক্ষায় আছেন। বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে একাধিক দিক থেকে উদ্ধার অভিযান চলছে। আপার ত্রিশূলী-১ প্রকল্পের হাক্কু টানেলে উদ্ধারকারীরা প্রায় ৩০০ মিটার এবং মাইলুং টানেলে ২০০ মিটার পর্যন্ত অনুসন্ধান চালিয়েছেন। রাসুয়াগাধী প্রকল্পের টানেলে ২৫০ মিটার এগিয়ে একটি অংশ ধ্বংসাবশেষে বন্ধ পাওয়া গেছে। চিলিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলেও যৌথ উদ্ধারকারী দল ৩৫ মিটার ভেতরে গিয়ে কাদা-পাথর সরানোর কাজ করছে।

স্টাইনার বলেন, ‘এসব টানেল জলবিদ্যুৎ অবকাঠামোয় যাতায়াত এবং নদীর পানি সরিয়ে নেয়ার কাজে নির্মাণ করা হয়। কোনো কোনো টানেল এত বড় যে এর মধ্যে ট্রাক চলাচল করতে পারে। কিন্তু বন্যার কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষে প্রবেশপথ বন্ধ হয়ে গেলে এসব টানেলই শ্রমিকদের জন্য মারাত্মক ফাঁদে পরিণত হতে পারে।’

জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের পাশাপাশি বন্যায় কয়েকশ কিলোমিটার সড়ক, একাধিক সেতু এবং স্কুল ও হাসপাতালের মতো জরুরি স্থাপনাও ধ্বংস হয়েছে। ফলে শুধু ভেঙে পড়া স্থাপনা মেরামত নয়, দুর্গত এলাকায় যোগাযোগ, চিকিৎসা ও বিদ্যুৎসেবা অব্যাহত রাখার সক্ষমতাও পুনর্গঠনের মূল বিবেচনা হওয়া উচিত বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

দুর্যোগসহনশীল অবকাঠামোবিষয়ক আন্তর্জাতিক জোট কোয়ালিশন ফর ডিজাস্টার রেজিলিয়েন্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচারের (সিডিআরআই) জ্যেষ্ঠ পরিচালক রামরাজ নরসিমহান বলেন, ‘সব স্থাপনাকে এমনভাবে নির্মাণ করা সবসময় সম্ভব নয় যাতে কোনো দুর্যোগে ক্ষতি না হয়। বরং ক্ষতি হলেও কীভাবে সেবা দ্রুত চালু রাখা যায়, সেই সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।’

জলবায়ুবিজ্ঞানীরা বলছেন, মানবসৃষ্ট উষ্ণায়নের কারণে হিমালয় অঞ্চল বিশ্বের অনেক জায়গার চেয়ে দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে। হিন্দুকুশ হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত বরফ হারাচ্ছে। অস্থিতিশীল পাহাড়ি ঢাল, হিমবাহ হ্রদ এবং ক্রমেই অনিয়মিত হয়ে ওঠা বৃষ্টিপাত বন্যা, ভূমিধস ও ধ্বংসাবশেষের স্রোতের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

নেপালের জন্য ঝুঁকিটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জলবিদ্যুৎ দেশটির বিদ্যুৎ গ্রিডের ভিত্তি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বিদ্যুৎ রফতানি আয়ের বড় উৎস। দেশটির বড় অংশের সম্ভাবনা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহনির্ভর জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে। এসব প্রকল্প খাড়া নদী উপত্যকার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত, যেখানে জমি সীমিত এবং একটি দুর্যোগের প্রভাব দ্রুত পরস্পর সংযুক্ত অবকাঠামোয় ছড়িয়ে পড়তে পারে।

স্টাইনারের মতে, ছোট বন্যার সময় পানি ও ধ্বংসাবশেষ ব্যয়বহুল স্থাপনা ও টানেল থেকে দূরে সরিয়ে রাখার ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে। কিন্তু সাম্প্রতিক বন্যার মতো বড় ঘটনায় ভৌত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও ভেঙে পড়তে পারে। তখন মানুষের জীবন রক্ষায় আগাম সতর্কতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা। তিনি বলেন, ‘বন্যাটি উৎসস্থল থেকে দ্রুত নেমে চীন-নেপাল সীমান্তে শনাক্ত হয়েছিল, ফলে উজানে সতর্কতার সময় খুব কম ছিল। তবে পানি ভাটির দিকে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর দিকে যাওয়ার সময় শ্রমিকদের কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছানো যেত কিনা সে প্রশ্ন এখন উঠছে।’

দক্ষিণ এশিয়া নেটওয়ার্ক অন ড্যামস, রিভার্স অ্যান্ড পিপলের সমন্বয়ক হিমাংশু ঠাক্কার বলেন, ‘ভবিষ্যৎ প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রতিটি উপত্যকার ভৌগোলিক বাস্তবতা ও অতীত দুর্যোগের ইতিহাস বিবেচনায় নিয়ে পরিবেশগত, সামাজিক ও দুর্যোগঝুঁকি মূল্যায়ন করতে হবে। বৃহৎ স্থাপনা, জমে থাকা ধ্বংসাবশেষ ও নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও ভাটির ক্ষয়ক্ষতি বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই বিকেন্দ্রীভূত সৌরবিদ্যুৎসহ বহুমুখী জ্বালানি ব্যবস্থার কথাও ভাবা প্রয়োজন।’ ঠাক্কারের ভাষায়, প্রশ্ন শুধু নেপাল কত দ্রুত পুনর্গঠন করতে পারবে তা নয়; বরং পরবর্তী বন্যার ঝুঁকি মাথায় রেখে তারা কীভাবে পুনর্গঠনের পথে হাঁটবে।