উত্তর মেরু তথা আর্কটিক অঞ্চলকে বলা হয় পৃথিবীর ফ্রিজ। তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে প্রতিনিয়তই অঞ্চলটির বরফ গলছে। এতে পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়লেও শক্তিধর দেশগুলোর সামনে খুলে গিয়েছে বিপুল সম্পদ ও কৌশলগত দখলের সম্ভাবনা। গলে যাওয়া বরফের কারণে আর্কটিক অঞ্চলের তেল, গ্যাস ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজে সহজ প্রবেশাধিকার তৈরি হচ্ছে। ধারণা করা হয়, বিশ্বে অবশিষ্ট প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ৩০ শতাংশ এখানেই মজুত। পাশাপাশি, এ অঞ্চল দিয়ে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে নতুন সামুদ্রিক পথ গড়ে উঠতে পারে। যা পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় উভয়ই কমাবে।

চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, নরওয়ে, কানাডা—সকলেই চায় বরফের নিচে লুকিয়ে থাকা সম্পদের ওপর দখল। এই দৌড়ে কেউ কেউ বন্দর বানাতে চায়, কেউ স্থায়ী ঘাঁটি বসাতে চায়, কেউ আবার গবেষণার নামে চালায় গুপ্তচরবৃত্তি।

এরইমধ্যে আর্কটিক অঞ্চলে নিজেদের উপস্থিতি জোরদারে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে চীন। নিজেকে ‘আর্কটিকের নিকটবর্তী রাষ্ট্র’ বলে পরিচয় দিচ্ছে। গত এক দশকে অঞ্চলটিতে নানা ধরনের প্রকল্পে বিনিয়োগ করার চেষ্টা করেছে বেইজিং। নরওয়ে ও সুইডেনের সমুদ্রবন্দর, গ্রিনল্যান্ডের বিমানবন্দর, আইসল্যান্ডে পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র—সবকিছুই তাদের আগ্রহের আওতায় ছিল। যদিও নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে এসব প্রকল্পে অনুমোদন দেয়নি ইউরোপের অনেক দেশ।

ফলে বিকল্প হিসেবে চীন এখন রাশিয়ার দিকেই ঝুঁকছে। মস্কোর সঙ্গে বেইজিংয়ের আর্কটিক-ভিত্তিক যৌথ সামরিক টহল, মহড়া ও বিনিয়োগ বাড়ছে। রাশিয়া এই অঞ্চলের প্রায় অর্ধেক উপকূল নিয়ন্ত্রণ করে, বিশেষ করে এলএনজি প্রকল্প, খনিজ সম্পদ ও উত্তর সামুদ্রিক রুট গড়ে তুলতে বিদেশি বিনিয়োগ চায় মস্কো। চীনও সেই বাজার। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুই দেশের মধ্যে এখনও পারস্পরিক সন্দেহ রয়ে গেছে— পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ার আশংকায় চীন রাশিয়ার খুব বেশি ঘনিষ্ঠ হতে চায় না । আর রাশিয়াও চীনের প্রভাব বাড়তে দিতে সতর্ক।

এই ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে কিরকেনেসসহ নরওয়ের উত্তরাঞ্চল। এখান থেকে রাশিয়ার সীমান্ত মাত্র ১০ মিনিট দূরত্বে। স্নায়ু যুদ্ধের সময় শহরটি ছিল একপ্রকার ‘গোয়েন্দা দুনিয়ার অঘোষিত ফ্রন্টলাইন’। সেই উত্তেজনা এখন আবার ফিরে আসছে।

নরওয়ের সামরিক বাহিনী নিয়মিত নজরদারি করছে রুশ জাহাজ, সাবমেরিন ও সীমান্ত সংলগ্ন তৎপরতার ওপর। রাশিয়ার যে কোনো নৌযান ইউরোপে ঢুকতে হলে নরওয়ের জলসীমা পার হতে হয়, এটিই পশ্চিমা গোয়েন্দা নজরদারির জন্য একটি বড় কৌশলগত সুবিধা। নরওয়ে বলছে, রাশিয়া কোলা উপদ্বীপে পারমাণবিক অস্ত্র মজুত ও সামরিক ঘাঁটি সম্প্রসারণ অব্যাহত রেখেছে। একই সঙ্গে, ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য রিক্রুট ও সামরিক সরঞ্জামও এখান থেকে পাঠানো হচ্ছে।

অন্যদিকে, জাতিসংঘ-স্বীকৃত স্বালবার্ড দ্বীপপুঞ্জের চীন ও রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের গবেষণা কেন্দ্র নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়েছে। বিশেষত চীনের স্টেশনটি গোপনে গোয়েন্দা কাজ করছে কি না, সে প্রশ্ন ঘুরে বেড়াচ্ছে স্থানীয়দের মধ্যে। আদিবাসী জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে গ্রিনল্যান্ডের ইনুগুইত কমিউনিটির প্রতিনিধিরা বলছেন, জলবায়ু সংকটকে ব্যবহার করে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো এখন ‘সবুজ ঔপনিবেশবাদে’ মেতেছে—একে তারা বলছেন ‘ডেভেলপমেন্টাল আগ্রেশন’। তাদের মতে, এই অঞ্চলের প্রকৃতি ও জীবনধারা রক্ষার বদলে বিশ্বশক্তিরা এখানে শুধু লোভ ও প্রতিযোগিতা নিয়ে এসেছে।

চীন এখনো সরাসরি সামরিক উপস্থিতি স্থাপন করেনি, বরং ‘শান্তিপূর্ণ গবেষণা ও সহযোগিতা’র নাম করে অঞ্চলটিতে প্রভাব বিস্তারে সচেষ্ট। তবে পশ্চিমা দেশগুলো এই ‘নরম কূটনীতি’কে দীর্ঘমেয়াদে একটি কৌশলগত হুমকি হিসেবেই বিবেচনা করছে।

এক সময় যেই আর্টিক অঞ্চলকে ‘শান্তির ব্যতিক্রম’ হিসেবে দেখা হতো, এখন সেটিই পরিণত হচ্ছে নতুন এক ভূ-রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্রে। যেখানে বরফের নিচে জমে উঠছে উত্তপ্ত কৌশলগত সংঘাতের আশঙ্কা।


বিবিসি অবলম্বনে