ফিলিস্তিনের গাজা নগরীতে স্থল অভিযান শুরু করেছে ইসরায়েল। গতকাল ভোরে ইসরায়েলি দুই কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেন। গাজায় ইসরায়েল জাতিগত নিধন চালাচ্ছে বলে জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়ার পরই এ অভিযান শুরু হয়। খবর সিএনএন ও রয়টার্স।
এদিকে গতকাল জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে সংস্থাটি এই প্রথম বলেছে, গাজাবাসীর ওপর গণহত্যা চালিয়েছে ইসরায়েল।
গাজা নগরী দখল ও এর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নেয়ার বিষয়ে একটি পরিকল্পনা গত মাসে ইসরায়েলের মন্ত্রিসভায় অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু মন্ত্রিসভায় ওই পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছিলেন। গাজা নগরীকে হামাসের সর্বশেষ ঘাঁটি বলে বিবেচনা করে ইসরায়েল। তাদের পরাজিত করে গাজা নগরীর সম্পূর্ণ দখল নিতে এবার শহরের উপকণ্ঠে স্থল অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। এর আগে গত সপ্তাহ থেকেই ইসরায়েলি বাহিনী সেখানে নির্বিচারে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়ে চালাচ্ছিল। তাদের হামলার প্রধান নিশানা গাজা নগরীর সুউচ্চ ভবনগুলো। দেশটির এক কর্মকর্তা বলেন, শুরুতে ধাপে ধাপে এবং পর্যায়ক্রমে স্থল অভিযান চলবে।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ গতকাল দম্ভোক্তি করে বলেন, ‘গাজা জ্বলছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) সন্ত্রাসী অবকাঠামোয় হামলা চালাচ্ছে এবং জিম্মিদের মুক্তি নিশ্চিত ও হামাসকে পরাজিত করতে কাজ করছে।’
যদিও শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলো খালি করে ফেলার পর গাজা নগরীতে ইসরায়েলি বাহিনীর স্থল অভিযান শুরু করার কথা ছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত শহরের খুব কম এলাকা খালি করা সম্ভব হয়েছে। গত মাসে জাতিসংঘ সতর্ক করে দিয়ে বলেছিল, গাজা নগরীতে স্থল অভিযানের যে পরিকল্পনা ইসরায়েল করছে, তাতে সেখানে বসবাস করা ১০ লাখ ফিলিস্তিনির বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সোমবার একজন ইসরায়েলি সেনা কর্মকর্তা দাবি করেছিলেন, এখন পর্যন্ত ৩ লাখ ২০ হাজার ফিলিস্তিনি গাজা নগরী থেকে পালিয়ে গেছেন।
এদিকে সোমবার দিবাগত রাতে ইসরায়েলের হামলায় গাজায় অন্তত ৩৮ জন নিহত হয়েছেন। নগরীর আল-শিফা হাসপাতাল ও ব্যাপ্টিস্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যথাক্রমে তাদের হাসপাতালে ২৩ জন ও ১২ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। বাকি তিনজন মারা গেছেন গাজার মধ্যাঞ্চলের আল-আসকা হাসপাতালে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদন: এদিকে গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা চালিয়েছে এবং এ কাজে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহুসহ শীর্ষ নেতৃত্ব সরাসরি উসকানি দিয়েছেন—এমন অভিযোগ তুলেছে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিশন। গতকাল প্রকাশিত কমিশনের ৭২ পাতার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই বছর ধরে পরিকল্পিতভাবে ফিলিস্তিনিদের ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ গণহত্যার অভিযানে নেমেছে।
কমিশনের প্রধান ও প্রাক্তন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারক নাভি পিল্লাই বলেন, ‘গাজায় গণহত্যা ঘটছে। এ ধরনের অপরাধের দায়ভার ইসরায়েলের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্বের।’ তিনি রুয়ান্ডা গণহত্যার সঙ্গে পরিস্থিতির তুলনা টেনে বলেন, ফিলিস্তিনিদের ‘অমানুষ’ হিসেবে দেখিয়ে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আপনি আপনার শিকারকে অমানবিক করে তুলেছেন। তাদের পশু হিসেবে গণ্য করা হয় এবং তাই কোনো বিবেকবোধ ছাড়াই আপনি তাদের হত্যা করতে পারেন।’ এ রিপোর্ট বিভিন্ন রাষ্ট্রের মনকে উন্মুক্ত করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জাতিসংঘ কমিশন জানিয়েছে, গণহত্যার সংজ্ঞায় উল্লিখিত পাঁচটি কাজের মধ্যে অন্তত চারটি ইসরায়েল করেছে—হত্যা, গুরুতর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি, জীবনযাত্রার এমন অবস্থা চাপিয়ে দেয়া যাতে জনগোষ্ঠী ধ্বংস হয় এবং জন্ম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ। এতে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে ভুক্তভোগী ও চিকিৎসকদের সাক্ষাৎকার, স্যাটেলাইট চিত্র ও যাচাই করা তথ্য।
প্রতিবেদনে নেতানিয়াহু ছাড়াও ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োয়াভ গ্যালান্টের বক্তব্যকে গণহত্যামূলক উদ্দেশ্যের সরাসরি প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে জেনেভায় জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল মেরন প্রতিবেদনটিকে ‘কলঙ্কজনক’ ও ‘ভুয়া’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘হামাসের পক্ষপাতীরা’ এ প্রতিবেদন রচনা করেছে। ইসরায়েল শুরু থেকেই এ কমিশনের সঙ্গে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে।
ইসরায়েল বর্তমানে হেগের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গণহত্যার অভিযোগে লড়ছে। দেশটি দাবি করছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত ও ২৫১ জন অপহৃত হওয়ার ঘটনার পর আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করেছে তারা। তবে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, পরবর্তী সময়ে গাজায় ইসরায়েলের হত্যাযজ্ঞে ৬৪ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং বহু এলাকায় এখন দুর্ভিক্ষ চলছে।










