সুদানের দারফুর অঞ্চলের এল-ফাশের শহরে দেশটির আধাসামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) তিনদিনের ভয়াবহ সহিংসতায় ছয় হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ নৃশংসতাকে ‘নজিরবিহীন ও চরম বর্বর’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। খবর এপি।

গত শুক্রবার প্রকাশিত ২৯ পৃষ্ঠার এ প্রতিবেদনে গত ২৫-২৭ অক্টোবরের মধ্যে এল-ফাশের শহরজুড়ে এ হত্যাকাণ্ড চালানো হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। শহরের ভেতর ৪ হাজার ৪০০ জনকে হত্যার পাশাপাশি পালিয়ে যাওয়ার সময় আরো ১ হাজার ৬০০ জনকে গুলি করে হত্যা করে আরএসএফ ও তাদের মিত্র আরব মিলিশিয়ারা। নিহতদের মধ্যে বড় একটি অংশই ছিল নিরস্ত্র সাধারণ মানুষ। দীর্ঘ ১৮ মাস অবরুদ্ধ রাখার পর গত ২৬ অক্টোবর সুদানি সেনাবাহিনীর শেষ শক্তিশালী এ ঘাঁটি দখলে নেয় আরএসএফ।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক এক বিবৃতিতে এ ঘটনাকে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি জানান, এল-ফাশের অভিযানে যে ভয়াবহ অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তা বিচারহীনতার এক সংস্কৃতি তৈরি করেছে। ফলে ওই অঞ্চলে ক্রমাগত সহিংসতার নতুন নতুন চক্র তৈরি হচ্ছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আরএসএফ যোদ্ধারা বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে ভারী অস্ত্র দিয়ে নির্বিচারে হামলা চালায়। এল-ফাশের বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ডরমিটরিতে আশ্রয় নেয়া এক হাজার মানুষের ওপর গুলিবর্ষণ করা হলে সেখানে প্রায় ৫০০ জন নিহত হয়। একজন প্রত্যক্ষদর্শী এ দৃশ্যকে ‘ভয়াবহ কোনো সিনেমার দৃশ্যের’ সঙ্গে তুলনা করেছেন।

প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি সেখানে ব্যাপক হারে যৌন সহিংসতা, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রে জাতিগত পরিচয়ের কারণে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে শিশুসহ অন্তত ৬০০ জনকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এমনকি শহরের শিশু হাসপাতাল ও স্থানীয় অন্যান্য চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোকে আরএসএফ তাদের বন্দিশালায় রূপান্তর করেছে। সেখানে হাজার হাজার মানুষকে আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতন চালিয়েছে। অ-আরব জাতিগোষ্ঠী, বিশেষ করে জঘওয়া সম্প্রদায়ের নারী ও শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন ও গণধর্ষণ চালানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

জাতিসংঘ এসব তথ্য প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের সাক্ষাৎকার, স্যাটেলাইট ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সংগ্রহ করেছে বলে জানিয়েছে। তবে প্রকৃত নিহতের সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, গত ২৮ অক্টোবর শহরের একটি মাতৃসদনে হামলা চালিয়ে আরো ৪৬০ জনকে হত্যা করা হয়, যা এ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ২০২৩ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়া এ ক্ষমতা দখলের লড়াই সুদানকে বিশ্বের বৃহত্তম মানবিক সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এ যুদ্ধের ফলে দেশটিতে বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম মানবিক সংকট এবং চরম দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) এ ঘটনাগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে।

যদিও আরএসএফ প্রধান মোহাম্মদ হামদান দাগালো এর আগে কিছু অনিয়মের কথা স্বীকার করলেও এত বড় মাত্রার হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সর্বশেষ জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি আরএসএফ।

সুদানের এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং অপরাধীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে বিশ্ব সম্প্রদায়কে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। ভলকার তুর্ক এ নৃশংসতার জন্য দায়ী কমান্ডারদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।