দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার ৮০ বছর পূর্তি উপলক্ষে যখন বিভিন্ন দেশ স্মরণ অনুষ্ঠান করছে, তখন অনেক বিশেষজ্ঞ ও কূটনীতিক আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, আরেকটি বড় যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্ব। কেউ কেউ বলছেন, যুদ্ধ হয়ত এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে, শুধু আমরা তা এখনো বুঝে উঠতে পারিনি।

যুক্তরাজ্য সরকারের উপদেষ্টা ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ফিওনা হিলের মতে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইঙ্গিত এখন আরো স্পষ্ট। বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় সহিংসতা বাড়ছে, আন্তর্জাতিক আইন কার্যকারিতা হারাচ্ছে, আর বিশ্বনেতৃত্ব আগের মতো শক্তিশালী নেই।

গাজা, কাশ্মীর, ইউক্রেন, সুদানসহ বহু অঞ্চলে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। আগে যেসব সংকট কূটনীতির মাধ্যমে সামলানো যেত, এখন সেগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রায় নেই বললেই চলে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) মতো সংস্থাগুলো এখন অনেকটাই নিষ্ক্রিয়।

গাজায় কয়েক মাস ধরে আইসিজের আদেশ উপেক্ষা করে খাদ্য, ওষুধ ও মানবিক সাহায্য আটকে রাখা হয়েছে। শুধু গাজা নয়, সিরিয়া, লেবানন ও ইয়েমেনেও বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এখন তারা ইরানে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি চাচ্ছে। ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ সম্প্রতি বলেছেন, গাজার বেশির ভাগ এলাকা ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ করে ফেলা হবে।

কাশ্মীরে দুই পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তান পরস্পরের বিমান লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। অথচ এ সংকট নিরসনে প্রথম দিকে যুক্তরাষ্ট্রের তেমন কোনো সক্রিয় ভূমিকা দেখা যায়নি। তবে শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় উভয় দেশ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে।

সুদানে আরএসএফ ড্রোন হামলা চালিয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধ্বংস করছে। ইয়েমেনে সহায়তা পৌঁছানোর পথেও হামলা হচ্ছে। আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ আনার পরও মামলা খারিজ করে দিয়ে আইসিজে জানিয়েছে, এ বিষয়ে তাদের এখতিয়ার নেই।

ইউক্রেন যুদ্ধের পরিস্থিতিও ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। যুক্তরাজ্যের সেনাবাহিনীর তথ্যানুযায়ী, রাশিয়ার হতাহত সংখ্যা নয় লাখ ছাড়িয়েছে। চীন, ইরান ও উত্তর কোরিয়া রাশিয়াকে নানাভাবে সাহায্য করছে। আর ভারতসহ কয়েকটি দেশ রাশিয়া থেকে তেল ও অস্ত্র কিনে যাচ্ছে, ফলে তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

যুক্তরাজ্যের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড মিলিব্যান্ড বলেছেন, বিশ্ব এখন এমন একসময় পার করছে, যা স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার সময়কার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর বিশ্বব্যবস্থার অবসান ঘটছে, কিন্তু সামনে কী আসছে তা এখনো অস্পষ্ট।

সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যে কূটনৈতিক আস্থা ৮০ বছর ধরে গড়ে তুলেছিল, তা ভেঙে পড়ছে। অনেক দেশই এখন যুক্তরাষ্ট্রকে এড়িয়ে চলার উপায় খুঁজছে।

বিষয়টি খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন ইউরোপীয় নেতারা। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বলেছেন, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের মতো গাজায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ করতে হবে। জার্মান প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্ক-ভাল্টার স্টাইনমায়ার বলেছেন, এটি দুই দিক থেকে বড় ধাক্কা—একদিকে রাশিয়ার যুদ্ধ, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব মূল্যবোধ থেকে সরে যাওয়া।

এ পরিস্থিতিতে এখন সামরিকভাবে আরো স্বাধীনভাবে কাজ করার চিন্তা করছে ইউরোপ। ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও পোল্যান্ড মিলে ইউক্রেনকে সহায়তা এবং ভবিষ্যতে রাশিয়ার হুমকি মোকাবেলায় একটি যৌথ সামরিক উদ্যোগের পরিকল্পনা করছে।

বিশ্বব্যাপী চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি হয়ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো বড় নয়, কিন্তু বিশ্বজুড়ে চলমান সংঘর্ষ, জোট বদল ও কূটনীতির ব্যর্থতা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি দিনদিন অস্থির হয়ে উঠছে। অনেকেই মনে করছেন, আমরা হয়তো এমন এক যুদ্ধে পড়ে গেছি, যার নাম এখনো কেউ স্পষ্ট করে বলতে পারছে না।