এখনো বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে আটকে আছেন শত শত শ্রমিক। নদী ও ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হওয়া বেওয়ারিশ মরদেহ নিয়েও চরম সংকটে পড়েছে নেপাল। বৈরী আবহাওয়া, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, বাড়তে থাকা নদীর পানি ও নতুন ভূমিধসের আশঙ্কায় বারবার ব্যাহত হচ্ছে উদ্ধার অভিযান। এ দুর্যোগে দুই দেশে প্রায় ৮০০ জনের মৃত্যু এবং ৩ হাজারের বেশি মানুষের নিখোঁজ হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। খবর রয়টার্স।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ৭৮১ জনের মৃত্যু হয়েছে, নিখোঁজ রয়েছেন ২ হাজার ৫০২ জন। চীনের তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে ১৬ জনের মৃত্যু ও ৫৪৬ জন নিখোঁজ হয়েছেন। তিব্বতের নেপাল সীমান্তবর্তী এলাকায় ২৩ দেশের ২৬১ বিদেশী নাগরিকের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক রেডক্রসের হিসাবে, দুর্যোগে ৯০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
বুধবার পাহাড়ি উপত্যকা দিয়ে নেমে আসা বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোতে সড়ক, অবকাঠামো ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নেপালের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ১০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েকটি নির্মাণাধীন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও প্লাবিত হয়েছে।
উদ্ধার অভিযানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে এসব জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে আটকে থাকা শ্রমিকদের নিয়ে। দেশটির পাঁচটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে উদ্ধার অভিযান চলছে। এর মধ্যে আপার ত্রিশূলি কমপ্লেক্সের একটি টানেলে প্রায় ৩৫০ জন আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা এখনো নিশ্চিত নয়।
তাদের উদ্ধারে হেলিকপ্টারে করে দুর্গম এলাকায় ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে গেছে নেপালের সেনাবাহিনী। উদ্ধারকারীরা একটি টানেলের প্রবেশমুখে পৌঁছে জমে থাকা ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ শুরু করেছেন। তবে বৃষ্টি ও বাড়তে থাকা নদীর পানি উদ্ধারকাজ ব্যাহত করছে। প্রবেশপথ পরিষ্কার করা সম্ভব হলে অক্সিজেন ও ক্যামেরা নিয়ে ভেতরে প্রবেশের পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে টানেলের মুখ থেকে দুজনকে উদ্ধারও করেছে সেনাবাহিনী।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রধান ধরম রাজ উপ্রেতি বলেন, ‘টানেলের ভেতরে পৌঁছানো অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ জমে থাকায় বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পথ পরিষ্কারের সুযোগ নেই। উদ্ধার অভিযানে সহায়তার জন্য বিশেষায়িত টানেল উদ্ধারকারী দল পাঠিয়েছে ভারত ও চীন।’
জীবিতদের উদ্ধারের পাশাপাশি মরদেহ ব্যবস্থাপনাও নেপালে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়া মরদেহ পৌঁছেছে চিতওয়ান পর্যন্ত। দীর্ঘ সময় পানিতে ও ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকার কারণে অনেক মরদেহে পচন ধরেছে। ফলে স্বাভাবিক উপায়ে পরিচয় শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। এরই মধ্যে চিতওয়ানের দেবঘাটের একটি বনাঞ্চলে বেওয়ারিশ মরদেহের গণকবর দেয়া শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ। জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মরদেহ দ্রুত পচে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় দাফনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
তবে দাফনের পরও পরিচয় শনাক্তের সুযোগ রাখা হচ্ছে। প্রতিটি মরদেহের ছবি তোলা, ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ এবং পরিচয়-সংক্রান্ত তথ্য নথিভুক্ত করা হচ্ছে। কবরের অবস্থান ও শনাক্তকরণ চিহ্ন সংরক্ষণ করা হচ্ছে, যাতে প্রয়োজনে ভবিষ্যতে মরদেহ উত্তোলন করা যায়। ডিএনএ বিশ্লেষণে নেপালকে সহায়তা করছে ভারতের ফরেনসিক দল। চীনের একটি দলের সঙ্গেও সমন্বয় করছে দেশটি।
চিতওয়ানের অস্থায়ী মর্গগুলোয় মরদেহের চাপ বেড়েছে। একটি মর্গে প্রায় ৫০টি মরদেহ রাখার সক্ষমতা থাকলেও একপর্যায়ে সেখানে ১২৫টির মতো মরদেহ রাখা হয়। নিখোঁজ স্বজনদের পরিচয় নিশ্চিত করতে এক্সপো সেন্টারের বাইরে অপেক্ষা করছে দুই শতাধিক মানুষ। উদ্ধার হওয়া মরদেহের ছবি দেখে প্রিয়জনকে শনাক্তের চেষ্টা করছে তারা।
এদিকে উদ্ধারকাজের মধ্যেই নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ত্রিশূলী নদীর পানি বাড়ায় স্থানীয় বাসিন্দা ও উদ্ধারকর্মীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় ভূমিধসে তৈরি একটি হ্রদের পানি উপচে পড়ার আশঙ্কায় কয়েক দফা উদ্ধারকাজ স্থগিত করা হয়। পরে হ্রদটির বেশির ভাগ পানি বের হয়ে গেলেও ভাটিতে নতুন ভূমিধস শনাক্ত হয়েছে। এতে নদীর প্রবাহে নতুন বাঁধ তৈরি হয়ে আরেকটি জলাধার সৃষ্টি হয়েছে।










