এ পরিস্থিতিতে আগামীকাল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে বৈঠকে বসছে উভয় পক্ষ। মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ কোনদিকে গড়াবে এ শান্তি আলোচনাকে তার একটি ‘লিটমাস টেস্ট’ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, এ শান্তি আলোচনা এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান অনেক বেশি। উভয় পক্ষই পরস্পরবিরোধী ‘রেড লাইন’ থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে না। ওয়াশিংটন যেখানে সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখে যুদ্ধবিরতি চুক্তি না করলে আরো ভয়াবহ হামলার হুমকির ওপর নির্ভরশীল, তেহরান সেখানে ভূরাজনৈতিক সুবিধাজনক কৌশলের ওপর ভর করে এগোচ্ছে। উভয় পক্ষের অবস্থান এতটাই দূরে যে দ্রুত কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো কঠিন।
স্থায়ী যুদ্ধবিরতির জন্য ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যেসব প্রস্তাব দিয়েছে, তার বেশির ভাগই পরস্পরের বিপরীতমুখী। ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার স্পষ্টভাবে দাবি করা হয়েছে, যা ওয়াশিংটন ‘গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে প্রত্যাখ্যান করছে। একইভাবে ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়েও কোনো ছাড় দিতে রাজি নয় তেহরান। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফা প্রস্তাব মূলত ইরানের সামরিক সক্ষমতা খর্ব করা, উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ এবং আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতি সমর্থন কমানোর ওপর জোর দেয়। ফলে আলোচনার সূচনাতেই দেখা যাচ্ছে দুই পক্ষের মধ্যে কোনো ‘কমন গ্রাউন্ড’ নেই।
এছাড়া আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুও দ্রুত বদলে গেছে। আগে যেখানে পারমাণবিক কর্মসূচি ছিল মূল ইস্যু, এখন সেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। তেহরান এখন স্থায়ী চুক্তির অংশ হিসেবে প্রণালিতে তাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ও চলাচলকারী জাহাজ থেকে টোল আদায়ের শর্ত দিয়েছে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলো স্পষ্ট জানিয়েছে তারা মুক্ত নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে চায়।
একই সঙ্গে আলোচনার পরিসর শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা এ আলোচনাকে আরো জটিল করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বলছে, লেবাননের সংঘাত এ চুক্তির বাইরে থাকবে। কিন্তু ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্পষ্ট করেছেন লেবাননে যুদ্ধ বন্ধ না হলে কোনো চুক্তিই সম্ভব নয়। ফলে যুদ্ধবিরতির কাঠামো নিয়েই তৈরি হয়েছে বড় ধরনের অচলাবস্থা। যদিও গতকাল রাতেই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু ‘যত তাড়াতাড়ি সম্ভব’ লেবাননের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা শুরু করার নির্দেশ দিয়েছেন। লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনও জানিয়েছেন, ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি এবং সরাসরি আলোচনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ক্ষমতার ভারসাম্যও এ আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে শক্তিশালী হলেও ইরানের হাতে রয়েছে হরমুজ প্রণালির কৌশলগত কর্তৃত্ব। এ অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা তেহরানকে সময় নেয়ার সুযোগ দিচ্ছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের শুরুতে যে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস, পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ এবং রেজিম চেঞ্জের যে লক্ষ্যের কথা বলেছিল তার কোনোটিই পূর্ণভাবে অর্জিত হয়নি। ফলে ওয়াশিংটনের দরকষাকষির অবস্থানও আগের মতো শক্তিশালী নয়।
ফলে নানামুখী বৈপরীত্য নিয়েই শনিবার সকালে ইসলামাবাদে আলোচনায় বসতে যাচ্ছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, সিনিয়র উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার ও সেন্টকম প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার। অন্যদিকে ইরানের প্রতিনিধিত্ব করবেন ইরানি পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মজিদ তাখত-রাভানচি। আয়োজক ও মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের পক্ষে বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, সেনাবাহিনী প্রধান আসিম মুনির, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এবং আইএসআই প্রধান আসিম মালিক।
যুদ্ধবিরতির প্রথম দিন বুধবার লেবাননে ইসরায়েলি হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ব্যাপক হামলা চালালেও গতকাল সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কুয়েত, কাতার এবং ওমানে কোনো হামলা চালায়নি ইরান। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, দেশটি গতকাল হামলামুক্ত ছিল। সৌদি আরব, কাতার এবং ওমানের সামরিক বাহিনী ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার কোনো খবর জানায়নি। বাহরাইনও ইরান থেকে কোনো হামলার ঘটনার কথা জানায়নি।
এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের করা যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন। এর ফলে আলোচনাগুলো অর্থহীন হয়ে যাবে। লেবানন যুদ্ধবিরতির ‘অবিচ্ছেদ্য অংশ’ বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের গালিবাফও। ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদেহ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আলোচনার জন্য ইরানের প্রতিনিধি দল পাকিস্তানে যাবে। যেকোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর আগে কিছু শর্ত থাকে। যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই লেবাননে ইসরায়েলের হামলা বন্ধ করতে হবে।
লেবাননে ইসরায়েলি হামলাকে কেন্দ্র করে ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি ভেস্তে দেয়া ‘বোকামি’ হবে বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। গতকাল তিনি হাঙ্গেরিতে সাংবাদিকদের বলেন, ইরানিরা হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আগামী সপ্তাহান্তে (শনিবার) আমাদের একটি আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। আমি মনে করি এটি একটি ভালো প্রাথমিক পদক্ষেপ। লেবানন ইস্যু নিয়ে একটি ‘যৌক্তিক ভুল বোঝাবুঝি’ হয়েছে উল্লেখ করে ভ্যান্স বলেন, ‘আমার মনে হয় ইরানিরা ভেবেছিল যুদ্ধবিরতির মধ্যে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত ছিল, কিন্তু আসলে তা নয়। আমরা কখনই এমন কোনো প্রতিশ্রুতি দিইনি।’ মঙ্গলবার লেবাননজুড়ে ইসরায়েলি হামলায় ২০০-এর বেশি মানুষ নিহতের বিষয়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, ইসরায়েল লেবাননে তাদের হামলা কিছুটা ‘নিয়ন্ত্রিত’ রাখার প্রস্তাব দিয়েছে, কারণ তারা চায় আমাদের আলোচনা যেন সফল হয়।
এদিকে যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে ঘিরে আবার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘যদি কোনো কারণে তা না হয় (চুক্তি মানা না হয়)—তেমনটা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম, তাহলে গোলাবর্ষণ শুরু হবে। আরো বড়, আরো ভয়াবহ এবং আরো শক্তিশালীভাবে তা হবে, যা আগে কেউ কখনো দেখেনি।’ একই সঙ্গে তিনি ঘোষণা দেন যুক্তরাষ্ট্রের সব জাহাজ, উড়োজাহাজ, সামরিক সদস্য, অতিরিক্ত গোলাবারুদ, অস্ত্রশস্ত্র ইরানের ভেতরে ও আশপাশে অবস্থান করবে, যতক্ষণ না পর্যন্ত চুক্তি পুরোপুরি মানা হচ্ছে।
এদিকে সমুদ্রতলে পেতে রাখা সম্ভাব্য মাইন এড়িয়ে জাহাজ চলাচলের সুবিধার্থে হরমুজ প্রণালিতে নতুন ও বিকল্প রুট ঘোষণা করেছে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) নৌ শাখা। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানা গেছে। আইআরজিসি জানিয়েছে, যেসব জাহাজ এ প্রণালি অতিক্রম করতে চায়, তাদের আইআরজিসি নৌবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে নির্দিষ্ট রুট অনুসরণ করতে হবে। মূলত সমুদ্রে মাইন বিস্ফোরণের ঝুঁকি এড়াতেই এ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছে আইআরজিসি।










