খাদ্য, চিকিৎসা ও বাস্তু সংকটে জর্জরিত ফিলিস্তিন এখন শোচনীয় মানবিক বিপর্যয়ের প্রতীক। গাজার দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি বিমান হামলার ফলে প্রতিদিনই বাড়ছে প্রাণহানির সংখ্যা। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, গতকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় কমপক্ষে ৫৭ জন নিহত হয়েছেন। গত মার্চের পর থেকে এ ধরনের অভিযানে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৫৮১। উত্তর গাজায় পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। জাতিসংঘ জানিয়েছে, এককালের জনবহুল এলাকাগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। লাখো মানুষ অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রের সামনে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়। এর মধ্যে অনেকেই গুলি ও পদদলিত হয়ে মারা যাচ্ছে। জাতিসংঘ বলছে, এখন পর্যন্ত শুধু ত্রাণ সংগ্রহের চেষ্টায় প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ১ হাজার ১২১ জন। শরণার্থী সংস্থা ইউএনআরডব্লিউর প্রধান ফিলিপ লাজারিনি গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘বিমান থেকে ত্রাণ ফেলা ব্যয়বহুল, বিপজ্জনক ও খুব একটা কার্যকর নয়। এটি মানুষের ক্ষুধা মেটায় না, বরং বিভ্রান্তি তৈরি করে এবং মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায়।’
চিকিৎসাবিষয়ক সহায়তা সংস্থা মেডসঁ সঁ ফ্রঁতিয়েরের (এমএসএফ) তথ্যানুযায়ী, গাজা সিটির একটি ক্লিনিকে দুই সপ্তাহে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে তীব্র অপুষ্টির হার তিন গুণ বেড়েছে। অপুষ্টিতে ভুগছেন গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারীরাও। এক চিকিৎসকের ভাষায়, ‘এটি এখন আর নিছক সংকট নয়, একটি প্রজন্মের বিলুপ্তির সংকেত।’
হেলথকেয়ার ওয়ার্কার্স ওয়াচ নামের একটি সংগঠন জানিয়েছে, গাজার অন্তত ২৮ জন চিকিৎসক বর্তমানে ইসরায়েলি কারাগারে বন্দি। এদের মধ্যে আটজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, যারা সার্জারি, শিশুস্বাস্থ্য, হৃদরোগ ও ইনটেনসিভ কেয়ার বিষয়ে প্রশিক্ষিত। এদের মধ্যে বেশির ভাগই অভিযোগ ছাড়া ৪০০ দিনের বেশি সময় ধরে আটক রয়েছেন। সংস্থাটির মন্তব্য, গাজায় চিকিৎসা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড ভেঙে ফেলার একটি উদ্দেশ্যমূলক প্রয়াস চলছে।
এরই মধ্যে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, হামাস গাজার জন্য পাঠানো ত্রাণসামগ্রী চুরি করে নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করছে। তবে হামাস নেতা ইজ্জাত আল-রিশক একে ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ বলে দাবি করেছেন। এমনকি মার্কিন গণমাধ্যমগুলোও বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের নিজস্ব তদন্তে এ ধরনের অভিযোগের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মেলেনি।
বৃহস্পতিবার রাতে গাজার দক্ষিণে জিকিম ক্রসিং এলাকায় ত্রাণের জন্য অপেক্ষমাণ মানুষের ওপর চালানো বিমান হামলায় ২৫ জন নিহত হয়েছে। শিফা হাসপাতালের কর্মকর্তারা জানান, তারা গুলিবিদ্ধ ও আহতদের চিকিৎসা দিয়েছেন। মানুষ ত্রাণ নিতে গিয়ে মারা পড়ছে, এ বাস্তবতা বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করেছে।
ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা এ সংঘাত গাজাবাসীর জীবনে রক্তপাত ও অনাহারের এক দীর্ঘ ছায়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে ইউরোপজুড়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়ার উপযুক্ত সময় কি এখনই? ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ ঘোষণা দিয়েছেন, আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ অধিবেশনে তার দেশ ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে। এটি বাস্তবায়ন হলে ফ্রান্স হবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রথম পশ্চিমা স্থায়ী সদস্য দেশ, যারা ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে।
ফরাসি কূটনৈতিক সূত্র বলছে, এ মুহূর্তটাই ইতিহাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ—গাজায় মানবিক বিপর্যয় ও ইসরায়েলি আগ্রাসন বিশ্বের ওপর নৈতিক চাপ তৈরি করেছে। তবে ইউরোপ এখনো দ্বিধাগ্রস্ত। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি বলেছেন, তিনি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে থাকলেও স্বীকৃতি দেয়ার সময় এখনো আসেনি। জার্মানির অবস্থানও একই। এদিকে যুক্তরাজ্যে কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বাধীন লেবার সরকার অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে পড়েছে। পার্টির এক-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্য চান অবিলম্বে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়া হোক। তবে স্টারমার সতর্ক অবস্থানে থেকে বলেছেন, ‘ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের অংশ হিসেবে আসা উচিত, একতরফাভাবে নয়।’










