৯ বছর বয়সী রোসেলার নাক থেকে একটি প্লাস্টিকের টিউব বিশাল অক্সিজেন ট্যাঙ্ক পর্যন্ত গিয়ে যুক্ত হয়েছে। চুপচাপ নিজের স্কেচবুক উল্টে যাচ্ছে রোসেলা—একটি ফুল, একটি বাড়ি, একটি মুরগি…

জন্ম থেকেই গুরুতর হাড়ের রোগে আক্রান্ত রোসেলার পাঁজরের হাড় এতটাই চেপে গেছে যে তার ফুসফুসের একটি পাশ অকার্যকর হয়ে গেছে। নিঃশ্বাস নেয়ার জন্য তার একমাত্র ভরসা অক্সিজেন সিলিন্ডার।

রোসেলার পাশেই বসে ছিলেন তার মা- ২৭ বছর বয়সী রেবেকা। তার সন্তান আর কতদিন শ্বাস নিতে পারবে পৃথিবীতে?— এই দুশ্চিন্তায়ই এখন দিন কাটছে তার।

মিয়ানমারের সঙ্গে থাইল্যান্ডের পাহাড়ি সীমান্তের কাছে এক শরণার্থী শিবিরে বসবাস তাদের। কয়েক দশকের সংঘর্ষ থেকে বাঁচতে রেবেকা, রোসেলার মতোই হাজার হাজার মানুষ এখানে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের এই অনিশ্চিত জীবন এখন আরো বেশি অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। কারণ, তাদের স্বাস্থ্যসেবার মূল ভিত্তি মার্কিন অর্থায়ন হঠাৎ করেই স্থগিত করা হয়েছে।

মিয়ানমারের সংখ্যালঘু নিকারেন জনগোষ্ঠীর ৩৭ হাজারেরও বেশি মানুষের বাস থাইল্যান্ডের বৃহত্তম শরণার্থী শিবির মাই লা-তে। তাদের একমাত্র স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত হাসপাতালটি। তবে এক রাতের মধ্যে সেটি বন্ধ হয়ে গেছে।

ট্রাম্প প্রশাসন যখন হঠাৎ করেই আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রায় সম্পূর্ণভাবে স্থগিত করে, তখন হাসপাতালটির দরজাও বন্ধ হয়ে যায়। চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ে হাজার হাজার শরণার্থী। সামাজিক মাধ্যমে শরণার্থীদের শেয়ার করা ভিডিওতে দেখা যায়, রোগীদের হাসপাতালের বিছানা থেকে তুলে কম্বলে মোড়ানো দোলনায় করে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। যাদের দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতা রয়েছে, তাদের অন্য একটি অস্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়েছে। তবে সেখানে নেই কোনো ডাক্তার।

হুট করেই যখন ট্রাম্প প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্ত আসে, গোটা শিবির জুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরিবারগুলো তাদের প্রিয়জনের জন্য চিকিৎসার বিকল্প খুঁজতে মরিয়া হয়ে ওঠে। কেউ কেউ কিডনি ডায়ালাইসিসের মতো ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ বহন করতে বাধ্য হচ্ছে—যা অনেকের জন্য একেবারেই অসম্ভব। সেই সঙ্গে তাদের মাথায় জেঁকে বসেছে মৃত্যুভয়। মার্কিন অর্থায়ন স্থগিত করার পরপর যখন হাসপাতালগুলোর দরজা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তখন এখানকার উম্পিয়েম শিবিরে এক বয়স্কা মহিলা শ্বাসকষ্টে মারা গেছেন, কারণ সময়মতো তাকে অক্সিজেন দেয়া সম্ভব হয়নি।

কারেন শরণার্থী কমিটির সচিব সাও ব্যুয়ে সে বলেন, এর আগে তারা কখনো এমন সমস্যার সম্মুখীন হননি।

থাইল্যান্ড শরনার্থী শিবির

তবে কেবল স্বাস্থ্যসেবাই নয়, শরণার্থীদের আরেকটি বড় দুশ্চিন্তা এখন খাদ্য সংকট।

এই শিবিরগুলোর খাবার ও রান্নার জ্বালানি প্রায় সম্পূর্ণভাবে আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। দাতা সংস্থা দ্য বর্ডার কনসোর্টিয়াম জানিয়েছে, তাদের কাছে আর মাত্র দেড় মাসের জন্য পর্যাপ্ত তহবিল আছে।

এখন পর্যন্ত শরণার্থীরা বিশেষ ফুড কার্ড ব্যবহার করে শিবিরের দোকান থেকে খাবার কিনতে পারতেন, যা দাতাদের তহবিল থেকে প্রদান করা হতো। কিন্তু মার্কিন সহায়তা স্থগিতের কারণে এই প্রক্রিয়াটিও ধ্বংসের মুখে পড়েছে।

দ্য বর্ডার কনসোর্টিয়ামের নির্বাহী পরিচালক লিওন দে রিডমাটেন বলেন, আমাদের প্রধান উদ্বেগ হলো শরণার্থীদের খাদ্য ও রান্নার জ্বালানি সরবরাহ করার মতো কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নেই।

এদিকে শিবিরগুলোর চিকিৎসা সহায়তা বন্ধ হওয়ার পর থাই হাসপাতালগুলো চিকিৎসা সহায়তা দেয়ার চেষ্টা করছে। তবে এত রোগীর চাপ তারাও সামলাতে পারছে না।

মাই লা শিবির থেকে মাত্র ৩০ মিনিট দূরে থা সং ইয়াং হাসপাতালের পরিচালক তাওয়াচাই ইংতাওয়িসাক বলেন, শিবিরের হাসপাতালটি হঠাৎ বন্ধ করে দেয়াটা খুবই বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। তার হাসপাতাল এরইমধ্যে ২০ থেকে ৩০ জন শরণার্থী রোগীকে চিকিৎসা দিচ্ছে। তবে এটি যে দীর্ঘমেয়াদী কোনো সমাধান নয়, সেটি বুঝতে পারছেন তিনিও।

তাওয়াচাই ইংতাওয়িসাকের আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়ার মতো নয়। কারণ, বর্ষা মৌসুম এগিয়ে আসছে। আর তখন ম্যালেরিয়া, নিউমোনিয়ার মতো রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়াটাই স্বাভাবিক।

মার্কিন সহায়তা স্থগিতকরণের প্রভাব থাইল্যান্ডের শরণার্থী শিবিরের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। দাতব্য সংস্থাগুলো জানিয়েছে, ভ্যাকসিন কর্মসূচি, শিক্ষা ব্যবস্থা, মানবপাচারের শিকার হওয়া মানুষদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র—সবই বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এমনকি মিয়ানমারের ভেতরেও অভিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য পরিচালিত ক্লিনিকগুলো তহবিল হারিয়েছে, যার ফলে হাজার হাজার মানুষ হুট করেই বঞ্চিত হয়ে পড়েছেন চিকিৎসা সেবা থেকে।

তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দাবি করেছেন, জরুরি মানবিক সহায়তা এখনো চালু রয়েছে। কিন্তু থাইল্যান্ডের এনজিওগুলো বলছে, তারা কোনো তহবিল পায়নি বা তাদের আবেদনের অনুমোদন হয়নি।

থাইল্যান্ড ২

৩২ বছর বয়সী শরণার্থী নাও মেরি, হাই ব্লাড প্রেসারের কারণে জরুরি ভিত্তিতে থা সং ইয়াং হাসপাতালের ম্যাটার্নিটি ওয়ার্ডে ভর্তি আছেন। ডাক্তাররা তাকে জানিয়েছেন, ক্যাম্পে ডাক্তার বা সঠিক চিকিৎসা সরঞ্জাম ছাড়া প্রসব করাটা ঝুঁকিপূর্ণ।

শরণার্থী নাও মেরির এখন একটাই প্রশ্ন কেন তারা আমাদের সাহায্য বন্ধ করে দিল?

তথ্যসূত্র – সিএনএন